মুখটা খুলতেই চোখে পড়ল খুদে খুদে লিপি-লকেটটা ছিনিয়ে নেবার আগে শিশুকে বিষ আর মধু দাও–ইতি হেরা। নিনিভের ভাস্কর হেরা–এ তারই পুত্র। সেই পরিচয় লিপিবদ্ধ রয়েছে।
–কী লেখা আছে সারগন?
সাদইদ খোপ বন্ধ করে শিশুর গলায় লকেটটা অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ঝুলিয়ে দেয়। কথা বলে না। ধীরে ধীরে ঘোড়ায় লাফিয়ে উঠে বসে। অশ্ব হাঁকিয়ে দেয়।
–বললে না কী লেখা আছে?
লকেটের ঢাকনা দু’টি প্রজাপতির পাখনার মত। অশ্ব থেকে সাদইদ সহসা নেমে পড়ে বলে–রিবিকা তুমি পিছনে বসে আমাকে দুহাতে ধরে থাকবে–পুত্রটিকে আমায় দাও–তুমি সামলাতে পারবে না।
সেইভাবে বিন্যস্ত হল দৃশ্য। অশ্ব ধাবিত হল। চোখের সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে জুম পাহাড়। চলতে চলতে সাদইদ রিবিকার প্রশ্নের জবাব দেয়। তারপর বলে–এই লকেটটা হেরার নিজের হাতের তৈরি। অথবা তারই নির্দেশে কোন মণিকার বানিয়ে দিয়েছে। ওই শব্যুপে এই শিশুর পিত্তা পড়ে রইল কিনা জানি নে। অথচ আমি এই শিশুকে মধু দিতে পারি, কিন্তু বিষ দিতে পারি না রিবিকা!
শিশুটিকে কোলে তুলে নেবার সময় সাদইদের বারবারই মনে হচ্ছিল আরো একটি শিশুর কথা। তার মা তাকে প্রসব করা মাত্র জিব্রিল মাকে হত্যা করে। সে ভেসে যেতে থাকে ঝুড়িতে। যে দ্বীপে তার জন্ম সেই দ্বীপ নাকি সমুদ্রের তলায় তারপর তলিয়ে যায়। কুফর দ্বীপে তার জন্ম–সে দ্বীপ আর নেই। তাকে তার ভিস্তি পিতা কাফেরের পুত্র বলে ডাকত। কুফর এক অভিশপ্ত দ্বীপ। এই শিশুটি তারই মত কাফের নিশ্চয়। কোন স্বপ্নদর্শী এই শিশুকে দেখলে হয়ত বলতে পারতেন, এ বেচারি ঈশ্বর বিশ্বাস করবে না, আকাশের দেবতাদের অবজ্ঞা করবে, নবীদের করবে উপহাস। কেননা এর জন্ম আর শৈশব মৃতদের তূপে এসে ঠেকেছে, এতদূর হতভাগ্য শিশু কোথাওই তার আস্থা এবং বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না–বরং সে নিজেকেই ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। সে তার নিজেরই মত করে একটি একটি আকাশ, সূর্য, চন্দ্র এবং অজস্র তারকাপুঞ্জ আর পাহাড় বন নদী সৃষ্টি করে আপন মনে। তার কেবলই মনে হয় এই আকাশ, বন, নদী, সমুদ্র কোন দেবতার সৃষ্টি নয়–এরা সূর্যের মত আপনাতে আপনি পূর্ণ–এদের কোন নির্মাতা নেই। মানুষও জন্মের পর নিজেকে বানায় নিজেকে সে খাদ্য দেয়, বস্ত্র দেয়, গৃহ দেয়–সে নিজেই তবে জীব-দেবতা।
জন্ম মৃত্যু অপরিজ্ঞাত, জীবনও রহস্যময়। চাঁদ, সূর্য, তারকার যেমন আকাশ রয়েছে, মানুষের রয়েছে জীবন। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সূর্য-চন্দ্র, তেমনি মানুষও ভাসছে জীবনভর। একটি ঝুড়িতে করে শিশুর ভেসে যাওয়া কি কম কথা!
একবার পাহাড়, একবার আকাশ দেখল সাদইদ। দূরে সমুদ্র গর্জন করছে। সাদইদ শিশুর মুখের দিকে চেয়ে থেকে ভাবল, শিশুটা এখনও ভেসেই রয়েছে, তার রয়েছে মনের আকাশ–তার রয়েছে চন্দ্র-সূর্য, সমুদ্র, অরণ্য, পাহাড়, নদী এবং পিরামিড আর জিগুরাত–তাছাড়া রয়েছে অজস্র অহিংস পশুপাখি। সে ভাসছে।
এই শিশু যতদিন জীবন না পায় ততদিন ভাসে। যতদিন ভাসে ততদিন জীবন পায় না। জীবন মানে শ্রম, নির্মাণ, প্রতিষ্ঠা। জীবন মানে সুরক্ষা। নিজেকে বাঁচানো, খাদ্য বস্ত্র গৃহ এইসব দেওয়া, নিজেকেই দেওয়া–মানুষ যখন দেবতাদের আক্রোশ থেকে, ফোঁসানি থেকে, চোখ রাঙানি থেকে, ক্রোধ এবং অভিশাপ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে–তখনই তার সার্থকতা। এই সার্থকতার নাম জীবন। জীব এবং বীজকে রক্ষা করার নাম জীবন। মহাপিতা নোহ ছিলেন জীবনের দেবতা। নবী ছিলেন। মানুষ আসলে জীব-দেবতা।
শিশুর মুখপানে চেয়ে থাকতে থাকতে সাদইদের মনে হচ্ছিল, জীবন-দেবতাই যেন তার কোলে হাত-পা নেড়ে খেলা করছে।
শিশুর সঙ্গে হঠাৎ সে কথা বলে উঠল–শোন সারগন, দুষ্টুমি করো না। আমায় কিছু বলতে দাও।
সহসা এমন উক্তি শুনে আশ্চর্য হয় রিবিকা। সে সাইদের মনের থই পায় না। একদা সে আবীরুদের সঙ্গে অশ্বারোহণ করেছিল। পাশে প্রবাহিত নীল নদী। আজ সম্মুখে পাহাড়, নীল আকাশের গায়ে হেলানো, দূরে সমুদ্রের সংগীত ভাসছে। এ তার জীবনের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা। সে সাদইদকে পিছন থেকে দু’হাতে আলিঙ্গন করে রয়েছে। পাশ দিয়ে মুখটা ঠেলে সে শিশুকে দেখবার চেষ্টা করছে। শিশু সাদইদের মুখে হাত বাড়িয়ে ঠোঁট আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করছে, কথা বলতে দিচ্ছে না।
বেলা পড়ে আসছে। পাহাড়-চূড়ায় আলো রাঙা হয়ে উঠছে। সাদইদ কথা বলে শিশুর সঙ্গে–। দ্যাখো ভাই, তোমার লকেটটা ভারী সুন্দর! প্রজাপতির দুটি ডানা যেভাবে পিঠের উপর খাড়া হয়ে জুড়ে যায়–এ ঠিক তাই। একটি প্রজাপতিকে বাঁচানো তেমন সহজ নয়, শিশুকে বাঁচানোও সমান শক্ত। পতঙ্গের। ডানায় যেমন ইন্দ্রধনু খেলে ওঠে, এটা সূর্যের বিষ–আর তোমার হাসিটাও তাই। নারীর বুকে চাঁদের বিম্ব, তোমার মুখে সূর্যের বিষ–তাহলে আকাশ থেকে। স্বর্গও নামতে পারে এখানে। দেবতাদের ক্ষুণ্ণ করব না শিশু-সারগন, তুমি বোঝে। সব কিছুর ছায়া থাকে হেরার পুত্র। তোমার দেহে নোহের ছায়া পড়বে, তুমি একটি জাহাজ বানাবে, তুমি পিরামিড গড়বে। তুমিই স্বৰ্গকে নামিয়ে আনবে মাটিতে।
বলতে বলতে সাদইদ শিশুকে আবেগে আহ্লাদে চুম্বন দিতে থাকে। শিশু হেসে ওঠে। সেই হাসির দোলায় যেন সাদইদ নিজেই আত্মহারা হয়ে আকুল হাসিতে স্ফূরিত হয়। রিবিকাও হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে ভাবে, এ কোন অশ্বারোহণ তার!
