আব্রাহম বললেন–না বন্ধু যবহ! আমার ঈশ্বর! আপনি একবার অন্তত পরীক্ষা করে দেখুন, সেখানে অন্তত ৫০ জন ভাল মানুষ পাওয়া যাবে। লোট আমার বন্ধু–সে অত্যন্ত ভাল লোক। আরো ভাল লোক আছে। আমি বিশ্বাস করি না সমস্ত মানুষ খারাপ হয়ে গিয়েছে।
জিব্রিল একদিন অতঃপর আব্রাহামকে সঙ্গে করে লোটের বাড়ি আতিথ্য গ্রহণ করলেন। তখন নগরীর লোকেরা লোটের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা জিব্রিল এবং আব্রাহামকে সমকামী সন্দেহ করে–ভাবে এরা দুজন অপূর্ব মানুষ! লোট নগরবাসীদের বোঝাতে পারে না এই দুজন সমকামী নয়–এরা আলাদা। জিব্রিল খেপে গিয়ে নগরের লোকেদের অন্ধ করে দেন। লোট পরিবারকে খিড়কি পথে নিষ্ক্রান্ত করেন জিব্রিল। আব্রাহাম অতঃপর লোট এবং লোটের বউকে সঙ্গে করে পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করেন।
জিব্রিল বলেন, তোমরা কেউ পিছনে ফিরে চাইবে না। শাপ লাগবে। পালাও। পালাও।
হঠাৎ তীব্র এক আওয়াজ হয় পিছনের দিকে। লোটের স্ত্রী ভুল করে পিছনে চেয়ে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নুনের অনড় মূর্তিতে পরিণত হন। সীনয় পাহাড়ের আগুন থেকে গন্ধক বৃষ্টি শুরু হয়। ঈশ্বর লোটের বউকে অবধি গ্রাস করেন। বউ পিছনে চেয়ে দেখে ভুল করেন–এত পাপগ্রস্ত নগরীর দিকে দৃকপাত করাও ভয়াবহ। ইহুদ বলেছেন, সমকামিতা কোন বিদ্যা নয়। কলাও নয়। পাপ। নগর নির্মাণ করা স্পর্ধা মাত্র।
রিবিকা ভাবল, ইহুদের প্রতিটি কথা সত্য। তিনি স্বয়ং সত্য। সমেরু তাকে দেখেছে।
–সমেরুর সঙ্গে আমার দেখা হবে বললে! ও নিশ্চয়ই মহাত্মার ঠিকানা জানে! জিজ্ঞাসা করে রিবিকা।
ঘোড়া থেমে পড়েছে। সামনের দিকে অদ্ভুত চোখে চেয়ে আছে সাদইদ। সদ্য হত্যাকাণ্ড হয়ে গেছে পথের উপর। একটি সুদীর্ঘ উদ্বাস্তু প্রবাহ উল্টো দিকে চলেছিল বলে মনে হচ্ছে। আসিরিয়ার দিক থেকে যাচ্ছিল সিদন টায়ার মাগিদ্য উপদ্বীপগুলির দিকে–সবই রাস্তায় খতম হয়ে গিয়েছে। এ প্রবাহ নতুনই শুরু হয়েছে। ক্রমশ নিনিভের পতন আসন্ন হয়ে উঠছে । নিনিভের উপর চারিদিকের আক্রমণ শুরু হয়েছে।
ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে সাদইদ। ঘোড়াটি রিবিকাকে পিঠে করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এমন দৃশ্য অশ্বটির কত চেনা। দেবদাসীকে যেভাবে মানুষ চারিদিক থেকে খোবলায়, রূপসী নগরীকেও সেই ধারা ঠুকরে চলে। যারা খতম হল, তারা সবাই ভাস্কর আর মিস্ত্রী। দুঃখ হয় এরাই নিনিভের নির্মাতা। যারা গড়ে তুলেছিল, তাদেরই আজ কোন আশ্রয় নেই। ওদের অস্ত্র হল নানা ধরনের চিকণ কাজের হাতিয়ার। থলেয় মুখ আঁটা অবস্থায় তাদেরই মৃতদেহের পাশে পড়ে রয়েছে।
সবাই মৃত। বোঝা যায় অসুররা মারেনি। সাদইদের মতই কোন ভাড়াটে দল মেরে গিয়েছে। এরা বেঁচে থাকলে আরো কত নগর নির্মাণ করতে পারত। হঠাৎ মৃত্যুস্তূপের ভিতর একটি শিশুর কান্না উচ্চকিত হয়।
.
০৪.
দুপুরে মরুভূমির উত্তাপ বেড়েছে। প্রকাশ্য দিনের বিপুল ক্ষমাহীন আলোয় মৃতদেহগুলি পড়ে আছে। খুব ভোরের দিকেই হয়ত খুন হয়ে গিয়েছে। ভাড়াটে সৈনিকরাই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। মরুযাত্রীরা ছিল সকলেই পায়ে হাঁটা মানুষ, সম্পূর্ণ নিরস্তু। অসুররা হত্যা করলে খুঁটায় টাঙিয়ে দিত মৃতদেহ। মুণ্ডু ছিন্ন করত । ঘাতকরা যখন তা করেনি, বুকে কেবল বশ বিদ্ধ করেছে, বোঝা যায় এরা কারা। মৃতদের সঙ্গে কোন গৃহপালিত পশুদল ছিল না, শস্যও ছিল না তেমন। মিস্ত্রী আর পাথরকাটিয়ে শ্রমিক এবং কিছু ভাস্কর পরিবার নিনিভে ছেড়ে চলে যাচ্ছিল প্রাণের ভয়ে। অত্যন্ত লোভী, ভয়ানক বোকা আর স্বার্থপর নির্দয় কোন সৈন্যদল এই-ধারা নিরীহ মানুষদের হত্যা করে ফেলে গেছে।
সামান্য দু’চার রত্তি কানের সোনা আর কাপড়ের পুঁটুলি বাঁধা যবের দু’চার কুনকে ছাতুর লোভেই মানুষ মানুষকে হত্যা করতে পারে–যুদ্ধ আর নগর-সভ্যতা মানুষের জন্য এমনই পরিণাম রচনা করেছে। মরবার আগে এরা ভয়ে চেঁচাতেও পারেনি। শিশুটি কিন্তু আশ্চর্যভাবে জীবিত। মৃতা মায়ের চন্দ্রোদিত নগ্ন বুকে মুখ ঠেকিয়ে স্তন্যপানের চেষ্টা করছে। হঠাৎ কেন যেন সাদইদের মনে হল, দুধের বদলে শিশুর মুখে রক্ত উঠে আসবে।
দ্রুত হাত বাড়ায় সাদইদ। শিশুটাকে বুকে তুলে নেয়। ভাড়াটে সৈনিক মানেই খুব দয়ালু এমন ভাববার তেমন যোগ্য কারণ নেই। বরং তারা খাদ্যাভাবে, বস্ত্রাভাবে এইভাবে দুস্যুবৃত্তি পোষণ করে। সাদইদ ভাবছিল, কোথাও মানুষ সম্পর্কে আশার আলো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এই শিশুটিকে নিয়ে এখন সে কী করবে? গলায় শিশুটির একটি ঝকঝকে রূপার লকেট ঝুলছে। মৃতদেহের ভিতর পা ফেলতে বরাবরই সাদইদের খারাপ লাগে।
সমস্ত দৃশ্যটি চেয়ে চেয়ে প্রায় নিষ্পলক দেখছিল দেবতাদের দেহের মত শুভ্র অশ্বটি। মৃতদেহের তূপ দেখলেই ঘোড়াটা এভাবে স্থির হয়ে দাঁড়ায়–পুরনো নক্ষত্রের মত চোখ মেলে চেয়ে থাকে।
পায়ে পায়ে ঘোড়ার কাছে এগিয়ে এল সাদইদ। শিশুটিকে রিবিকার দিকে তুলে ধরে বললনাও। যুদ্ধের পাওনা। আজ আমার ভাগ্যটা খুব প্রসন্ন দেখছি । বিনে যুদ্ধে একটা আশ্চর্য নারী এবং অত্যাশ্চর্য শিশু উপহার পেলাম। শিশুটি মেয়ে নাকি ছেলে–ওহো ছেলেই বটে–তা বেশ। ওর গলায় এই লকেটটা ঝুলছিল। দাঁড়াও দেখি লকেটের খোপে কী রয়েছে!
