সহসা সাদইদ বলে ফেলল–তোমার রূপের আড়ালে খুব উত্তেজক সুরা আছে আমনের বউ। সেটা ছেলেটাকে ধরাতে হবে। নইলে ছেলেটা ফের কোথাও ভেগে যেতে পারে।
শুনতে শুনতে সভয়ে শিউরে উঠল রিবিকা। সমেরু এক অদ্ভুত কিশোর নিশ্চয়। কণ্ঠস্বর পাখির মতন সুরেলা। তাকে সে দেখেনি। সারগন তাকে ঢেকে রেখেছিল। অবশ্যই তাকে নিয়ে এই অশ্বারোহী সৈনিকটির নানান মতলব মাথায় আসছে । পতঙ্গ-অধিকৃত নারী যদি সমেরুকে নষ্ট করবার জন্য ব্যবহৃত হয়–তবে এই সৈনিকটির কবিত্ব সর্বনাশা। এই লোকটি নিশ্চয়ই তার কবিত্বকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করে–একে বিশ্বাস করা পাপ। ভাবতে ভাবতে দম পায় না রিবিকা।
রিবিকা এইরূপ ভাবছিল বটে, কিন্তু যুদ্ধের কতকগুলি নিজস্ব নীতি আছে। মানুষের জমি দখলের দাঙ্গাগুলি একরোখা ঘটনা, সেখানে কোন উচ্চাশা থাকে না। এ অবধি মানুষের মনে পাপ জন্মায় না। বাঁচার জন্য মানুষ হয় হানাদার। কিন্তু যুদ্ধ অন্য জিনিস। মানুষ যখন থেকে নগর গড়তে শিখল, তখন থেকে। হানাহানি মাত্রই যুদ্ধ নয় বোঝা গেল। গ্রাম এবং অন্য নগরীগুলিকে শুষে শুষে এনে একটি উপত্যকাকে সাজিয়ে ভোলা, যেন একটি শোভিত স্বপ্ন, তার খিলান, গম্বুজ, সিঁড়ি ও প্রাচীর-দম্ভ আর ঔদ্ধত্যের ভাস্কর্য, তিনতলা সাঁজোয়া গাড়িটি মানুষের শস্ত্র আর ক্রীতদাসে পূর্ণ হয়ে মরুপথ যখন অতিক্রম করে তখনই বোঝা যায় যুদ্ধ হল মানুষের সর্বাত্মক বিভীষিকা।
সামান্য একজন দেবদাসী নীল নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে কতদিন একথা ভেবেছে। আজ সে জীবনের এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতার ভিতর প্রবেশ করছিল। জীবনে সে কখনও বা চকিতে অনুভব করার চেষ্টা করেছে যে নারীর বক্ষাকাশে এক নিবিড় চন্দ্রোদয় হয়, আবীরুদ তার কবিতায় একদা একথা বলেছিল, সে কথায় রোমাঞ্চ ছিল–কিন্তু প্রজাপতি যখন তাকে অধিকার করল, পৃথিবীর সকল মসীহ এবং আকাশের দেবতাদের সমূহ প্রার্থনা যেন তখন তারই জন্য। কেন্দ্রীভূত হয়েছে, এ বিস্ময় শেষ হতে না হতেই সাদইদ তাকে বলেছে, তার রূপের আড়ালে রয়েছে মদ। এ সৌন্দর্য যুদ্ধেরই উদ্দীপনা মাত্র। বহুদর্শী এ জীবন তার। অভিজ্ঞতাও নানা-বিভঙ্গিত। আক্কাদের হাতের আঙুল ছিল মোটা, মেটে সাপের মত। সাদইদের আঙুল পুষ্পকলিকার ন্যায়, কিন্তু সে আঙুল নখরে। শাণিত একথা বিস্মৃত হলে চলে না।
সাদইদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–একজন এহেন কিশোরকে সৈন্যরা উত্ত্যক্ত করে। কী বলব তোমায় রিবিকা। মেয়েছেলে সস্তা হলেও, যুদ্ধের নিয়ম হল, সৈনিকের কাছে তাদের একটু আক্ৰা করে রাখতে হয়। যত দেবদাসী দরকার আমার মন্দিরে,ততটা সরবরাহ নেই। হিতেন বলেন, একটু কম করেই রাখো। ফলে হয়েছে কি, একটা মন্দিরেই দশজন সৈনিকের লাইন পড়ে যায়। ফের প্রধান সৈন্যদের আলাদা ব্যবস্থা-জনপ্রতি একজন দেবদাসী দিতে হয়। ভেবে দ্যাখো, কী অবস্থা! একখানা মন্দির, একজন দেবদাসী আর একজনই সেনাপতি। সমস্ত ব্যাপারেই অভাব তৈরি হয়। মেয়েছেলে সস্তা কিন্তু দেবদাসী আক্রা–এই কৃত্রিম অভাব বজায় না থাকলে যুদ্ধ থেমে যাবে। এর একটা কুফল হচ্ছে, সমেরুর মত কিশোরদের সৈন্যরা খোবলাবে। পুরুষ যখন পুরুষকে প্রেম নিবেদন করছে, জানবে সেটা সমকামী শিবির।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে অশ্বের গতিবেগ আরো কিঞ্চিৎ বাড়িয়ে দিয়ে সাদইদ বলল–আমি সৈন্যদের শেখাই। না–কোন ধর্মপুরাণ পাঠ করতে শেখাই না। শেখাই শস্ত্র ক্ষেপণ করা। অশ্ব চালনা। অর্থের পিঠে চড়ে ছুটতে ছুটতে বশ ছুঁড়ে লক্ষ্য ভেদ করা। লক্ষ্য করেছি, সমেক দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকলে কোন কোন সেনা লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হয়। আমি আজ তিনদিন এই সবই করেছি। তোমাকে এসব কথা শোনাতে আমার ভালই লাগছে–কেননা তুমি মিশরী দেবদাসী।
.
আবার থামল সাদইদ। তারপর বলল–সমেরু সামনে থাকলে নষ্টমজ্জার সেপাই দৃষ্টি-বিভ্রান্ত হয়ে কাত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যায়। তখন অন্যরা হো হো করে হাসে। এটাও এক ধরনের উদ্দীপনা এবং শিক্ষাও বটে। সমেরু সামনে থাকলেও লক্ষ্যভেদ করতে হবে–যাতে চাঁদমারী বিদ্ধ হয়। ভয় হচ্ছে সমেরুকে না সৈন্যরা নিজেদের ভিতর লুফালুফি করে মেরে ফেলে!
ফের অশ্বের গতি সামান্য পড়ে এল। এমনকি হঠাৎ থেমেই পড়ল সাদইদ। সমেরুর দুর্ভাগ্যের কথা রিবিকা বিমূঢ় হয়ে শুনছিল। এই বিবরণ বিশ্বাস করতে তার বুক কেঁপে যাচ্ছিল। সমেরু তবে শিবির ছেড়ে পালাতে চাইবে না কেন? যুদ্ধের এই নির্লজ্জতা ক্ষমাহীন। একজন রূপবান নিদোষ কিশোর-রিবিকা তাকে কল্পনার চোখে দেখতে থাকে। সৈন্যরা তাকে কামনা করে পরস্পরের মধ্যে কামড়াকামড়ি বাধিয়েছে–এ দৃশ্য রিবিকার কল্পনায় আসতে চায় না। সমেরু সামনে আছে বলে সৈন্যের বর্শা লক্ষ্যবিন্দু বিদ্ধ করতে পারছে না। ছেলেটা তবে কী করে বাঁচবে! মনে হল, সমেরু তার চেয়েও হতভাগ্য, যে তার মা ছাড়া অন্য কারুকে জানে না। কোন কিশোরের মনের এমন সরল স্বপ্নকে নষ্ট করছে মানুষ, এই অশ্বচালক কবি হয়েও কী করে সইছে এইসব! এ বান্দার পতন অনিবার্য! মনে পড়ল ইহুদ কতদিন সদোম আর ঘোমরা শহর দুটির ধ্বংসের কথা বলেছেন! লোট, লোটের বউ, জিব্রিল আর আব্রাহামের কাহিনী।
উক্ত নগর দু’টি সমকামিতায় ভরে গিয়েছিল। যবহ জিব্রিলকে নগর দু’টিকে ধ্বংস করার জন্য পাঠালেন। পিতা আব্রাহামের সঙ্গে সীনয় পাহাড়ে তাঁর বন্ধু ঈশ্বর যবহের কথা হত। যবহ বললেন,–ওহে আব্রাহাম, শোন আমার বাতাবাহক (পয়গম্বর)! আমার গায়েবী আওয়াজ শোন! অদৃশ্য বার্তা শোন! আমি নগর দুটি ধ্বংস করব! ওখানে আর কোন ভাল মানুষ অবশিষ্ট নেই।
