অস্পষ্টভাবে লোটার আর্তচাপা গোঙানির ভাষা বোঝার চেষ্টা করে সাদইদ। তার কেবলই মনে হয়, লোটা বলছে, কে আছে তার–তার বউ, তার সন্তান?
যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার কি কোন আক্রোশ পুঞ্জীভূত হয়েছে হৃদয়ে? হঠাৎ সাদইদের মনে হল, লোটা যেন বলছে–যুদ্ধই যখন জীবন, তবে যুদ্ধই আমার। নিয়তি, তিনি আমায় গ্রহণ করুন! কতকাল আমি নারী-সঙ্গ করিনি। মানুষ কি এভাবে বাঁচতে পারে? দেবদাসীর এত দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এই যুদ্ধ? আর আমি, আমার ধর্ম এবং ভাষাকে দেবদাসীর পায়ে উৎসর্গ করব? আমি ভুলে যাব আমার সর্বস্ব? আমি আমার স্ত্রীপুত্রের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলেছি, যে ধর্ম পালন করেছি, সব ত্যাগ করব একটি গণিকার কাছে? এমন পতিত অবস্থা কেন হল আমার?
সাদইদের কাছে লোটা এক সুতীব্র সমস্যা। লোটা তার কোন কিছুই ছাড়তে চায় না। জুমপাহাড়ী ভাষা সে মুখে উচ্চারণ করবে না। বোধহয় এই ভাষার অক্ষরগুলি নিয়ে তার আপত্তি আছে। কারণ অক্ষরগুলি ফিনিশীয় বর্ণমালা ছাড়া কিছু নয়, দু’একটি এদিক-ওদিকের মিশেল রয়েছে মাত্র। কিছু ইস্তারী চিহ্ন আর নকশা আছে, আছে মিশরীয় দু’একটি অপভ্রংশ। সব মিলিয়ে এ তার কাছে উৎকট মনে হয়েছে হয়ত। সে মনে করে তার নিজের ভাষা নিদোষ আর পবিত্র। দেবভাষা তার। সে কেন সেই ভাষা ত্যাগ করবে?
অতএব সীমাহারা নিঃসঙ্গতাই তার সঙ্গী! সবচেয়ে বড় সমস্যা তার ধর্ম। সৈন্যশিবিরে দেবতা আমন বা সামাশই যথেষ্ট অথবা দেবী ইস্তার কিংবা বালদেব। কারো মনে উঁকি দেয় ঈশ্বর যবহ। তারা মেষের মূর্তি কাছে রাখে। কিন্তু তাদের কেউ তেমন ঘৃণা করে না। কেবল নোটার বেলা যত বিপত্তি। সে
উটের বিগ্রহ সামনে রেখে বসে থাকে।
লোটার ধর্ম পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাবে, এই ভয়ে লোটা তীব্র এক বিষাদে রক্তাক্ত হয়েছে। তার একাকিত্ব যেন পিরামিডের চূড়ার মত অলৌকিক। লোটার জন্য দেবদাসী রিবিকা কি সুলভ্য হতে পারে না? নাকি এই নারীকে রাজা হিতেনের হারেমে উৎসর্গ করবে সাদই? হিতেনের হারেম সুন্দরীদের এক বিপুল সমাবেশ মাত্র। সেখানকার প্রহরীরা খোঁজা সম্প্রদায়। শোনা যায়, সেই হারেম সমকামী নারীতে পরিপূর্ণ। সমকামী নারীদের রতিমোচনের প্রদর্শনী রাজা হিতেনের প্রসিদ্ধ বিলাস। রাজা হিতেন কাম ও রতির দেবতা হবার বাসনা করেন। তিনি নাকি আপন শরীরে রতি আর কামকে একত্র ধারণ করার কথা ভাবেন।
একদিকে লোটা, অন্যদিকে হিতেনকার জন্য রিবিকাকে সাদইদ নির্বাচন করবে?
বেদনাপূর্ণ দৃষ্টিতে সাদইদ রিবিকাকে দেখতে থাকে। সাদইদের এই দৃষ্টিপাত, চোখের ভাষাবিভঙ্গ, চাহনির কারুণ্য কোন প্রকারেই উপলব্ধি করতে পারে না রিবিকা।
সাদইদ সহসা রিবিকাকে অশ্বপৃষ্ঠে তুলে নিয়ে কেমন এক ক্ষিপ্ত আক্রোশে দুবার বেগে মরুভূমির বুকে অশ্ব ছুটিয়ে দেয়। হতচকিত বিহ্বল হয়ে পড়ে রিবিকা। সাদইদ আপন মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে–একটি প্রজাপতি জীবনের পক্ষে যথেষ্ট নয়। কিছুতেই নয়। মহাপিতা নোহ, তুমি আমাকে এভাবে বিভ্রান্ত করছ কেন? আমি কোন বীজ অথবা কোন জীবকাররা সুরক্ষা জানি না। আমি ত্রাতা নই। জীবনের অর্থ এই মরুভূমির বুকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। এখানে যুদ্ধ আর নারীর তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছু নেই। সুন্দরী নিনিভে, তার আলো, রক্তে তোলপাড় করে। কেন এভাবে ছুটছি আমি? কোথায় চলেছি? আমার ফুলের আর আতরের বাজার। অথচ পশম সংগ্রহের সামর্থ্য নেই। কেন আমি স্বপ্ন দেখি তবে? কেন দেখি? মেয়েটি আমাকে সারগন বলেছে, অথচ আমি তো সামান্য ভাড়াটে সৈনিক। মরুভূমির লুটের রসদ জোগাড় করা আমার কাজ। আমার দৃষ্টি কেন তুচ্ছ রঙিন দু’টি পতঙ্গের উপর নিবদ্ধ হয়? কী আছে হৃদয়ের ভিতর? পিরামিডের চেয়ে, বাবিলের জিগুরাতের চেয়ে হৃদয় কি বিস্ময়কর?
তার দিয়ে ঘেরা এবং ইট দিয়ে কোমর পর্যন্ত খাড়া করা প্রাচীরের আড়ালে শবির। তারগুলি তেমন মিহি নয়, ধাতু ঘষে ঘষে সরু করা। অসুররা অনেক সময় শিবির আক্রমণ করে তাবৎ সৈন্যবাহিনী মুহূর্তে নিঃশেষ করে দেয়। বশেষত ভাড়াটে সৈনিকদের উপর অসুরদের ক্রোধ সীমাহীন। তাই গাছপালা ঘেরা, ইটের প্রাচীর এবং প্রাচীরের উপর ধাতুর মোটা তারের বেড়া, বস্তুত শিক দিয়ে বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে বানানো বেড়া–সহসা আক্রান্ত হলে সৈন্যরা পালিয়ে যাওয়ার কিছুটা সময় পায়। হৃদয়ের কথা ভাবতে ভাবতে শিবিরের দিকে মুহূর্তে চোখ চলে যায় সাইদের। অশ্ব তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছিল, হঠাৎ শিবিরে ঢুকে পড়ল।
গাছপালার ভিতর কতকগুলি তাঁবুর ছাউনি ছাড়া অন্য কোন গৃহ নেই। অশ নিয়ে প্রাচীরের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল সাদইদ। অত্যন্ত ছোট একটি শিঙা, যা তার গলায় ঝোলে, সেটি ফুকে উঠল সে। সেই শব্দে একটি তাঁবু থেকে প্রথমে একজন, পরে অন্যান্য তাঁবু থেকে দু’একজন বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। শিঙার সুরের ভিতর কোন ব্যস্ততার সুর ছিল না, খুব শান্ত স্বরে ডাকা–তাই তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসা সৈনিকদের চোখে-মুখে তেমন কোন উদ্বেগের চিহ্নই দেখা যায় না।
সাদইদ রিবিকার সমস্ত মুখমণ্ডল এবং শরীর কাপড়খানির দ্বারা ঘোমটার মত করে তুলে ঢেকে দিয়ে বলল–তুমি চুপ করে থেকো, কথা বলবে না।
রিবিকা বুঝল, সাদইদ তাকে গোপন করতে চাইছে। তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দেবার পর কী মনে করে সাদইদ পথ থেকে এদিকেই ফের ছুটে এল । একটি তাঁবুর থেকে একজন মাত্র সৈনিকই তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। জুম পাহাড়ের দিকে অশ্ব ধেয়ে যেতে গিয়ে ফিরে এসেছে সাদইদ। এখানে রয়েছে আটাশজন নব্য সৈনিক–এরা পালিয়ে এসেছে বিভিন্ন নগরী থেকে, দু’একজন জুটেছে মরুপথ থেকে। প্রত্যেকেই ছিল পদাতিক। এদের অশ্ব চালনার কোনওই অভিজ্ঞতা নেই।
