ভাষার সমস্যা বিকট। একজন শ্বেতাঙ্গিনী মিশরী দেবদাসীর কাছে কনানী সেনা ভাষার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গোলমাল বাধায়। আমারনার মেয়ে উর নগরীর প্রায় লুপ্ত ভাষা যখন একজন বলে, বুঝতে পারে না। ঈশ্বরের ভাষা না কি লুপ্ত হয় না। কিন্তু দামাস্কাসের কোন এক মরুজাতির এমন এক ভাষায় লোটা নামে একজন দুর্ধর্ষ সৈনিক আপন মনে কথা বলে যে, সাদইদ স্বয়ং হতবাক হয়ে শোনে বুঝতে পারে না। লোটার ভাষা জুমাপ্রদেশে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ ভাষা। লোটা যদি কালই মরে যায়,জুমার চারপাশে সেই ভাষাটিও আর শোনা যাবে না। মরুভূমির জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত্রিতে চাঁদের দিকে চেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে দুবোধ্য ভাষায় সম্ভবত সে তার ভাগ্যকে অভিসম্পাত দেয়কী করুণ আর আদ্রব্যাকুল তার ভাষা! ভাষা দুর্বোধ্য, দুর্বোধ্যই নয়, অবোধ্য বলাই সঠিক, সে কাঁদে। মনে হয়, মানুষ নয়, অবলুপ্ত হওয়ার ভয়ে ভাষাটাই যেন কাঁদছে!
ভাষা দিয়ে ঈশ্বর মানুষকে বিচ্ছিন্ন করলেন। নোটাকে দেখলে মর্মান্তিক ঘটনাটির সেই যে একমাত্র বিষণ্ণ সাক্ষী, সেকথা গুরুতর আঘাত হয়ে হৃদয়ে বাজতে থাকে। লোটার ভাষাই শুধু আলাদা এবং একলা নয়। তার পূজাবিধিও আলাদা। জুমাতে একমাত্র উট-উপাসক সে। ভাষা এবং পূজা যদি এত স্বতন্ত্র হয়–তার ভাগ্যে অপার ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই বতায় না। অমিতসাহসী, বীর্যশালী এমন সৈনিক হয় না। সে মরে গেলে সাদইদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
সাদইদ সকরুণ চোখে রিবিকার দিকে চাইল। তারপর একটা ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোটাকে সবাই খাটো চোখে দেখে। কবে সেই বাবিলের জিগুরাত, দর্পিত স্বর্গ মাটিতে ভেঙে পড়ল, কোন সেই অতীতের কথা। কিন্তু ভাষার ভিতর রইল তার শাপলাগা স্মৃতি। ঈশ্বর যেখানে একবার নাক গলাবেন, যুগ যুগ ধরে তারই প্রহার চলতে থাকবে।
দেবদাসী নিশিমা খুব দাম্ভিক মেয়ে। দরজার বাইরে লোটাকে ঠেলে ফেলে দিলে, শালা উটমুখো, বেদে! ভাষার মা বাপ নেই। আমার ইয়ে-ধোয়া জল খাস রে সালেহর বাচ্চা! ওরে গামছাবালা সারগনের ছাঁ–লিয়ে যা, মড়াটাকে পিরামিডের খাঁচায় শুইয়ে দে আয়। ওরে গামছাবালা! ভাতারের শালীর পো, আয় দুদু খা আর গা মোছা আমার! পিদিম জ্বেলে দ্যাখ মড়াটা দুয়োর আগলে ভনভন করে যাচ্ছে রে! কী ভাষার ছিরি! উটের খুরো, উটন্যাজা! শালা আমায় চাট মেরেছে রে! ফেলে দে বালির উপর।
এই তীব্র অপমান কোন সৈনিকই হজম করতে পারে না! তার মজ্জা থেতলে গেছে যেন। শরীরে ভাষার বিষ ঢুকে গেছে। সে পলাতক সেনা। ঘর হারানো, শ্রীপুত্রকন্যাহারা এক দলিত ক্ৰী দাস। আরাবা মরুর কোন্ দিগন্তে তার ভাষাগোষ্ঠী হারিয়ে গেছে। সে এ। এবং এ কারণে এত গোঁড়া যে, সে তার ভাষা এবং উট-উপাসনা কোনটি ছাড়তে রাজি নয়। সে সেই রাতে গামছাবালাদের দ্বারা প্রহৃত হয়ে সাইদের কাছে ছুটে এল। ইচ্ছে করলে সমস্ত মন্দির সে একাই রক্তাক্ত করে পিষে দিতে পারত। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটত না। কামনাতাড়িত, নারীসঙ্গহারা, অপমানিত লোটা সাদইদের সামনে গুহার ভিতর নিজেকে একটি পাথরের উপর আছড়ে ফেলল।
নিকষ পাষাণের মত বলিষ্ঠ অন্ধকারসদৃশ ঘর্মাক্ত পিঠে আলো পড়েছে। এই ক্ষুদ্র পাহাড়টির অধীশ্বর সাদইদ। চর্বির মশালের আলো পাহাড়ের অভ্যন্তর উদ্ভাসিত করেছে আলো-ছায়ায়। পাহাড়টির একটি অংশ মন্দিরের মত করে কেটে কেটে বানানো হয়েছে সাদইদের গৃহ। পাহাড়ের চুড়োটা দূর থেকে দেখতে পিরামিডের মত স্পর্ধিত। পাহাড়কে ঘিরে তাঁবুর সংসার এবং কিছু কিছু ইটপাথরে তৈরি দেবদাসী মন্দির আর আছে দ্রাক্ষাকৃঞ্জ। এ অঞ্চল নগরও নয়, গ্রামও নয়।
তাঁবুতে পুরুষরা থাকে। মন্দিরে থাকে দেবদাসী। সৈনিকদের জন্য এ ছাড়া অন্য কোন ব্যবস্থা জরুরি নয়। রাজা হিতেন আসলে সৈন্যাবাস এবং দুর্গ। স্থাপনের জন্য সাদইদকে ওই পাহাড় এবং দ্রাক্ষাকুঞ্জ দান করেছেন। যে-কোন সময় কেড়ে নিতে পারেন। পলাতক সৈন্যরা তাঁবুর তলায় থাকে, মন্দিরে রাত্রিবাস করে। বস্তুত এদের কোন সংসার নেই। সাদইদ এদের জন্য কখনও কোন গ্রাম বা নগর নির্মাণ করতে পারবে না। এদের দিতে পারবে না সংসার করার সুখ। যদি কখনও নিনিভে নগরী ধ্বংস হয়, তখনই যুদ্ধ থামবে। সাদইদ মনে মনে অদ্ভুত একটি স্বপ্ন দেখে। সে এই সৈনিকদের আর দেবদাসীদের সঙ্গে করে কনান প্রদেশে একদিন ঢুকে যাবে।
তার প্রবর্তিত জুমপাহাড়ী ভাষা যুদ্ধকালীন ভাষা, ভয় হয় যুদ্ধ থামলে এই ভাষাটিরও মৃত্যু হবে। কিন্তু কানে ঢুকে যেতে পারলে ভাষাটি মরবে না। সৈনিদের মুখে এই ভাষা বাঁচবে, সৈনিকরা সংসার পেলে এবং দেবদাসীদের কৃষিক্ষেত্রে নিয়োগ করতে পারলে জুমপাহাড়ী মানুষের ঐক্যের ভাষা হিসেবে টিকে যাবে। দেবদাসীর সন্তানরা সংখ্যায় কম নয়।
আলো এসে পড়ল পিঠের উপর। পাথরের উপর মুখ রেখে কুঁজো হয়ে পড়ে থাকা লোটা ফুঁপিয়ে উঠল। তার শরীর অপমানে থরথর করে কাঁপতে থাকল গমকে গমকে। এই বিচ্ছিন্ন মানুষটিকে যে কোথায় রাখবে সাদইদ,ভেবে পেল না। ধর্মে একা, ভাষায় একক। এই বিচ্ছিন্নতা কেন? লোটার কী ভবিষ্যৎ? মানুষের হৃদয়ে এর কোন আশ্রয় নেই কেন?
নোটার পিঠের ঘর্মাক্ত-পিছল আলো চকচক করছে। লোটা বলছে–আমার। কে আছে? বউ নেই, সন্তান নেই।
