বলতে বলতে গাছের শেকড়ে বসে থাকা সাদইদ উঠে দাঁড়ায়। তারপর তার ফেনশুভ্র ঘোড়াটির কাছে সরে এসে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে লাগাম আঁকড়ে ধরে। পরম মমতায় ঘোড়ার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলে–তারিফ কখনওই করব না। এরা প্রত্যেকে সারগন হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কখনও ঐক্যবদ্ধ হয় না। লুঠের মাল নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে। একজন সুন্দরী দেবদাসীর উপর অধিকার বলবৎ করতে সহযোদ্ধার বুকে চাকু বসায়। মন্দিরে গিয়ে কে আগে কার কাছে কোন্ সুন্দরীর কাছে যাবে তার প্রতিযোগিতা করে। কী বলব, এদের ঐক্য নেই। এরা কখনও কোন একটা সুন্দর নগর নির্মাণের কথা ভাবতে পারে না। ক্রীতদাস ছিল, চোরাপথে পালিয়ে এসেছে, মন খুব ছোট। বিচিত্র মুখের ভাষা। কারো সঙ্গে কারো মিল নেই।
একটু থেমে সাদইদ বলল–আমি নিজে প্রচুর মেহনত করে ওদের জন্য একটা তাঁবুর মিশ্রভাষা তৈরি করেছি। তাঁবুতে থাকে, কথা চালাচালির একটা মাধ্যম তো লাগে। সেই ভাষা তো কতকগুলো নকশা হলেই চলে না। মুখে একটা নকশার বর্ণনা করতে অনেক সময় লাগে। লিপি তৈরি হয়েছে, ভাষাও সহজ হয়েছে। লিপি দরকার। আমি নকশা নয়, লিপিভিত্তিক একটা বর্ণমালা প্রস্তুত করেছি-বলতে পারো, এটা আমার কোন কৃতিত্বই নয়। ফিনিশীয়রা লিপির ভাষার উদগাতা। উগাতা বোঝো তো! এই ভাষা তৈরি একটা জাতির ক্ষমতা। কল্পনা করার ক্ষমতা। লিপি হল লিখিত রূপ। অঙ্কিত রূপ নয়। সেটি হওয়ার ফলে ভাষাগুলিকে মেশানো সহজ হয়েছে। সে কাজটা কঠিন নয়। তা, সেই কাজ করে আমি প্রমাণ করেছি, বাবিলের গল্পটা ঠিক নয়। মানুষ ভাষার। দূরত্ব ঘোচাতে পারে। তা সত্ত্বেও এরা সত্যকে চিনতে চায় না।
একনাগাড়ে কথা বলার পর দম নেবার জন্য দণ্ডভর থামে সাদইদ। ঘোড়ার কাছ থেকে দ্রুত সরে এসে জলের পাত্রটা রিবিকার হাত থেকে ছোঁ মেরে ঠোঁটে তুলে নিয়ে ঢকঢক করে জল গেলে। তারপর সেটি মাটিতে ফেলে দিয়ে বলে–চলল, ওঠা যাক। তুমি দেবদাসী, তোমার পক্ষে বোঝা কতটা সম্ভব আমি জানি না। ঈশ্বর যবহ বা ধরা যাক আকাশের দেবতারা মানুষের মধ্যে। ভাষাভেদ ঘটিয়েছেন। কারণ মানুষ জিগুরাত তৈরি করে। জিগুরাত বা স্বর্গ যাই বল, মানুষের হাতে গড়া। তাই না? তা আকাশের ঈশ্বর মনে করলেন, স্বর্গের সিঁড়ি বানিয়ে তুলে মানুষ তেনাদের আক্রমণ করতে চাইছে, কী স্পর্ধা! ব্যস হয়ে গেল! অমনি তেনারা জিগুরাত ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হলেন না, মানুষকে আলাদা করে দিলেন। কীভাবে? না, ভাষা আলাদা হল। এক এক গোষ্ঠীর এক এক ভাষা। গল্পটার ছিরি আছে বলতে হবে! সরদার ইহুদ নিশ্চয়ই তোমাকে এই গল্পটা হাজারবার বলেছেন!
–হ্যাঁ! সলজ্জ মুখ তুলে মাথা নাড়ল রিবিকা।
সঙ্গে সঙ্গে সজোরে উচ্চস্বরে হো-হো করে হেসে উঠল সাদইদ। পাগল ছাড়া এভাবে হাসে না। মনে হল, এই হাসি যেন আকাশের দেবতাদেরই বিদ্রূপ করছে।
ইসিতে তার স্বর ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল, হাসি না থামিয়েই সে কথা বলে যেতে লাগল আর কোন সোল্লাসে ঘোড়ার পিঠ চাপড়ে উঠতে থাকল, বলল–তুমি মিশরী মেয়ে, তুমি বুঝবে! রাজা ফেরাউন তো নিজেই তিনভাগ দেবতা, একভাগ, মাত্র মানুষ। দেবতা আর মানুষে এই ভাগাভাগিটা হাস্যকর। হয় তুমি পুরোপুরি দেবতা হও, নতুবা পুরোটাই মানুষ হও। এমনকি তুমি। লাঠিধারীদের মত জাদুকরও হবে না। দেবতাদের স্বভাব সব সময় কুপিত থাকে। তারা যদি সত্যিই কোথাও থাকে, তবে তাদের বোঝা উচিত, মানুষ প্রচণ্ড ক্ষমতাধর। মৃত্যুর পরও মানুষের একটা ছায়া থেকে যায়। যাক গে! আমার কথা তুমি বুঝবে না।
রিবিকা বলল–মানুষ ভাষা তৈরি করতে পারে একথা বিশ্বাস করা কঠিন সারগন! ভাষা ঈশ্বরের দান। মুখের ভিতর জিভ নেড়ে নেড়ে মানুষ শব্দ করতে পারে মাত্র, ভাষা তো অন্য জিনিস। ঈশ্বর না চাইলে মানুষ নতুন কোন ভাষা সৃষ্টি করতেই পারে না। তুমি ধ্বংস হবে সারগন! ঈশ্বরই ভাষাভেদ ঘটিয়েছেন। তুমি সৈনিকদের জন্য ভাষা তৈরি করলে কেন?
সাদইদ ম্লান হেসে বলল–জুমা পাহাড়ের ওদিকে আমরা এখন চলে যাব রিবিকা। পাহাড়ের নাম জুমা অথবা জুম । আমার ভাষার নাম জুমপাহাড়ী অরমিক ভাষা। এই ভাষা তোমাকেও শিখতে হবে। দেবদাসীরা, ওখানে গিয়ে দেখবে–জুমপাহাড়ীতে কথা বলছে। একটা অত্যন্ত নির্দোষ সহজ মিষ্টি ভাষা। ভয় নেই। আমি কোন দেবতাকে অপমান করার জন্য এই ভাষা তৈরি করিনি। বাস্তব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলে একটা মিশ্রভাষা গড়ে না নিয়ে উপায় ছিল না। চলো, যাওয়া যাক।
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে রিবিকা বলল–কোন অহংকার দেবতারা সহ্য করেন সারগন। নইলে সাত বছর মিশরে বৃষ্টিপাত নেই, জলোচ্ছ্বাস নেই–এমন কেন হবে! যারা ঘরে ঘরে নিস্তার-চিহ্ন, গুণচিহ্ন আঁকল, তারাই পুড়েছে। মহাত্মা ইহুদ, কোথায় রয়েছেন কেউ জানে না। আমি এই অরণ্যে বসে তাঁর জন্য অপেক্ষা করব। তোমার তৈরি ভাষায় কথা বলার আগে আমার যেন মৃত্যু হয়। হায় দেবী! মাগো!
বলতে বলতে দু’হাতে চোখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়ল রিবিকা। সাদইদ পরম আশ্চর্য হল। কোন সৈনিক অথবা দেবদাসী কখনও এমন করেনি। সাদইদের কৃত্রিম ভাষায় কথা বলাতে তাদের কোনওই আপত্তি নেই। বিভিন্ন স্থান থেকে তারা এসেছে। তাদের নিজেদের গোষ্ঠীভাষা ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু সংযোগের ভাষা জুমপাহাড়ী। তারা বাধ্য এই কৃত্রিম মনুষ্য-উদ্ভাবিত ভাষায় কথা বলতে। কেন না সেখানে এমনও দু একজন রয়েছে, যারা ভাষাগত কারণেই একা হয়ে পড়ে। একটা লোক শুধু তার নিজের ভাষাটিই জানে, সে কী করবে!
