ধন্যবাদ জানিয়ে সাদইদ বলল–এবার তাহলে তোমাকে নামতে হয়।
রিবিকা বলল–আমার নামবার ক্ষমতা নেই সারগন। আমি আর পারছি না।…বলতে বলতে রিবিকার চোখ দুটি খিদেয় আর ক্লান্তিতে মুদে এল।
দুটি হাত অখের দিকে প্রসারিত করে সাদইদ বলল-তোমার সঙ্গে অদ্ভুত দু’টি প্রজাপতির সংযোগ ঘটেছে। যাই হোক, এই দৃশ্যের খাতিরে আমি তোমাকে খাদ্য আর পানীয় দেব। এবং চাইব না যে তোমাকে ধর্ষণ করে মেরে অসুরদের খুটায় টাঙিয়ে দিক সৈন্যরা। অসুর কে নয় বল? যুদ্ধ যতদিন আছে একটা রঙিন প্রজাপতির পক্ষধ্বনি কারো কানে যাবে না। আমি নিশ্চিত, প্রকৃত নোহের সন্তান ছাড়া এই ধুন শুনতে পায় না। আমি ঠিক যোগ্য নই। চুটকিলা গেয়ে যুদ্ধ থামানো যায় না। দরকারই বা কী! যুদ্ধ থামলে আমার জায়গা কোথায়! এসো! নেমে পড়ো।
গাছের ছায়ায় নামিয়ে রেখে সাদইদ অশ্বারোহণ করল, রিবিকার চোখে অদ্ভুত আকুতি ফুটে উঠল। খিদে আর তেষ্টায় সে বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে লাগল। মুহূর্ত কতক চলে যায়। দ্রুতই ফিরে আসে সাদইদ। দ্রাক্ষাকুঞ্জ থেকে মধু আর রুটি সংগ্রহ করে ফিরেছে। হত্যা করা মেষটাকে সৈনিকদের ভিতর ছুঁড়ে দিয়ে এসেছে।
রিবিকা যখন গোগ্রাসে খেতে শুরু করল, সুন্দর মায়া এসে সাদইদের চোখ দু’টিকে ঘিরে ছায়া ফেলে দাঁড়াল।
সাদইদ বলল–তোমার জন্য জল, মধু আর রুটি। শীতে আর গ্রীষ্মে উপযুক্ত পোশাক। যদি পর্যাপ্ত এইসব পাও, কী করবে তুমি? মিশরীয় অভিজাত নারীদের মত তুমিও কামকলার চর্চা করবে। তখন আমার মত যাযাবরের কবিতা ভাল লাগবে না। আমার কতরকম ভাবনা, কোনটারই মাথামুড়ো নেই। কখনও বলি প্রজাপতি, কখনও বলি যুদ্ধ। দিশেহারা একটা ভাব। যার দেশ নেই, গ্রাম কিংবা নিজস্ব নগরী নেই। অশ্ব আর অস্ত্রবিদ্যা কী কাজে লাগল! রাজা হিতেনের অনুগৃহীত। তোমাকে যে খেতে দিলাম–মাগনা নয়। রাজাকে তুষ্ট করলে…যাক গে!
খেতে খেতে রিবিকা থেমে পড়ে দু’চোখ সামান্য কুঞ্চিত করে সাদইদের মুখের ভাষা পড়বার চেষ্টা করে। কেমন সন্দেহ হয়। মনে হয়, এই লোকটাও তাকে বিক্রি করে দেবে। পুরুষ মাত্রই বিক্রেতা এবং ক্রেতা। প্রত্যেকেই বণিক। তবে লোকটির ভাব খুব দুরূহ সন্দেহ নেই। নিজেকে সে দিশেহারা বলছে। নারীর শরীরে কাদা, বালি লাগে, তেমনি ফুলের পাপড়িও লেগে থাকে। সবই সমান। তুচ্ছ প্রজাপতি দেখে মুগ্ধ যে হয়, সে পাগল। লোকটা যখন প্রজাপতিকেও শিক্ষক বলে ঘোষণা করেছে, বোঝা যায়, পাগলামিটাও তবে আস্ত। আবীরুদ এইরকমই ছিল। প্রাসাদ ছেড়ে সে তাঁবুর তলে থাকতে চেয়েছিল।
ভাবতে ভাবতে আবার খেতে শুরু করল রিবিকা। খাওয়া শেষ হলে ঢকঢক করে জলপান করতে করতে থেমে পড়ল সে। বলল–হায় আমন! তোমাকে তো একবারও বললাম না! মাফ করো আমাকে। তোমারও তো খিদে পেয়েছিল!
ক্ষীণ হেসে সাদইদ বললবলেছিলাম না! খেতে পেলে আবার তোমার বাঁচতে ইচ্ছে করবে। ক্ষুধার্ত মেয়েকে বলাৎকার করা কাপুরুষতা। সমকামিতার চেয়ে নোংরা জিনিস। আমি যদি সারগন হতাম, আমার নাগরিক অনুশাসনে একথা লিখতাম। অবশ্য সারগনেরই মত আমার জন্মমুহূর্তেই মা আমাকে ত্যাগ করেছিলেন। হয় আমি জারজ ছিলাম। কোন সৈনিক আমার পিতা ছিলেন, যার কোন উদ্দেশ ছিল নানতুবা মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। আমার মাকে তোমাদের ঈশ্বর হত্যা করেছিলেন। নইলে নবজাতক সাদইদ কেন ঝুড়িতে করে জলে ভেসে যাবে।
একটু থেমে সাদইদ বলল–একজন ভিস্তি–ভিস্তি বোঝো তো! দ্রাক্ষাকুঞ্জের মালি। তিনি কে? তিনি এক ক্রীতদাস। বস্তুত তিনিই আমার পিতা-আসল বাপটি কে জানিনে। এইরকম দিশেহারা নিরাশ্রয় জন্ম আমার। সারগনেরই মত। কিন্তু আমি সারগন নই। বারংবার একটা মিথ্যা কথা বলছ। কেন?
বলতে বলতে সাদইদের নিঃশ্বাস ঘন হয়ে উঠল। আরো খানিক জল আশ্লেষে পান করে রিবিকা বলল–একজন দেবদাসীকে ক্ষমা কর! আমার কথার কি কোন দাম আছে!
সাদইদ রিবিকার স্বীকারোক্তি শুনে অবাক হয়। মুখে আর কোন কথা বলে না। ক্ষমা চেয়ে সুন্দরী রিবিকা ঘাড় নিচু করে অনেকক্ষণ বসে থাকল। তার অধোভঙ্গিমার মুখোনির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে কবিপ্রাণ সাদইদের মনে হল, মেয়েটিকে সে কুমারী ভেবেছিল। একটি দেবদাসীকে চিনতে না পারা তার অক্ষমতা। মেয়েটির মাথার নীল ফিতেটিকে দেখে তার আশ্চর্য লাগছিল।
সাদইদ বলল-দেবদাসী না থাকলে আমাদের যুদ্ধ থেমে যেত। তোমরা। আছো বলেই আমরা আছি প্রজাপতি!
–তোমার একথার প্রতিবাদ করার সাহস একজন দেবদাসীর নেই। তুমি সৈনিক। মুখে যা আসে বলতে পারো। তবে একথা একজন বুড়োর মুখে ভাল শোনায়। আমি প্রজাপতি নই। আমার নাম রিবিকা। আমার মত মেয়েকে প্রজাপতি বলে ঠাট্টা না করলেই পারতে সারগন!
রিবিকার ঈষৎ অভিমানভরা কণ্ঠস্বর শুনে সাদইদ হা-হা করে হেসে ফেলে বলল–আবার সারগন!
রিবিকা আবার লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। বলল–অন্য কোন সৈনিক হলে এমন করে সারগন বলে ডাকলে খুশি হত! তুমি তেমন নও। তোমার নাম ধরে তো ডাকতে পারি না।
সাদইদ বলল–শোন আমনের বউ! তোমাদের মুখে তারিফ শুনতে সৈনিকরা ভালবাসে, কারণ তাতেও এক ধরনের নেশা হয়। মদের চেয়ে সে নেশা খর। একজন সৈন্যকে গেজিয়ে দিতে তোমরা ওস্তাদ। বিশেষত একজন ভাড়াটে সেপাই দেবদাসীর মুখে ছাড়া প্রশংসা কোথায় পাবে! আমি অধিনায়ক, কিন্তু কখনও কোন সেপাইয়ের প্রশংসা করিনি। কেন করব?
