মেয়েটিকে বলতে হবে–সে যেন কোন সৈনিকের প্রেমে না পড়ে। তার নিজের দাম বোঝা উচিত। সৈনিক আজ আছে কাল নেই। আজ রাতে যে সৈনিক এই মেয়েটির পাশে শুয়ে রাত কাটালোকাল ভোরেই তার মৃত্যু হতে পারে। অসুররা যে কখন কার প্রাণ নেবে বলা তো যায় না। ভাড়াটে সৈনিকের দেশ নেই, রাষ্ট্র নেই, জীবনের স্থায়িত্ব নেই। তার চুক্তিরও কোন দাম নেই। আজ সে মিশরের পক্ষে, কালই সে অসুরদের তরফে। একটি ছোট পাহাড় দেখে একটি নগরীর কল্পনা করা কী বোকামি! সাদইদ তার পাহাড়টির দিকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে একবার চাইল। তারপর আবার রিবিকার জলসিক্ত মৃদু কম্পিত মুখের রেখার দিকে চাইল। এই মেয়েটি তাকে প্রজাপতির বন্ধু বলে ঠাট্টা করেছে। অত্যন্ত উর্বর-মস্তিষ্ক না হলে, অমন বাক্য মুখে আসত না। যার রূপ প্রখর আর মিন্ধ এবং বুদ্ধি প্রখরতর,তাকে দেবী ভাবলে অন্যায় হয় না । দেবী যে আকাশে থাকে না, সাদইদের এ হল গভীর বিশ্বাস!
একজন দেবী কখনও এত স্পষ্ট নয়, যা প্রত্যক্ষ তাই সত্য। যা বোঝা যায়, তাই সত্য এবং সুন্দর। প্রজাপতি এই সুন্দরীকে অধিকার অকারণ করেনি। সাদইদ দেখল, রিবিকার চোখের পাতা ঘন-ঘন নড়ে উঠছে। সে চেতনা ফিরে পাচ্ছে।
০৩-৪. সাদইদের দিকে চোখ মেলে
সাদইদের দিকে চোখ মেলে চাইল রিবিকা। তার বুকের কাপড় সরে গেছে। লোকটি তার দিকে গভীর আগ্রহে চেয়ে আছে। হঠাৎ কী খেয়াল হওয়াতে সাদইদ রিবিকার বুকের কাপড় সাবধানে তুলে রিবিকাকে ঢেকে দেয়। রিবিকা পুরুষের এই আচরণ ভাবতে পারে না। নারী যখন সংজ্ঞাহীন, পুরুষ তখনও নারীকে গমন করে। মিশরে সমকামী পুরুষের অভাব ছিল না। পুরুষ এমনকি মৃতাকেও গমন করে। নারীর এসব সুযোগ নেই। দেবতা আমন নারীকে এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছেন। ফলে সে সুন্দর হয়েছে।
সাদইদ বলে উঠল–ভয় পেও না প্রজাপতি!… খুব নরম করে বলল, তা আহ্বানের সুরে। কেন যে এমন করে বলল, হৃদয়ের এই চিন্তার ব্যাখ্যা সাদইদের জানা ছিল না। ঠিক তখনই হৃদয়াবেগের প্রবল চাপে রিবিকা সভ্যতার সেই নারী যে লজ্জায় দু’হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে ফেলল।
একটা কথা ভেবে রিবিকার কান্না থেমে যায়। অজ্ঞান অবস্থায়, দেবী ইস্তারের মত যখন সে পাতালে ভাসছিল, খুব একা, খুবই অসহায়, যখন সে তার পুরুষকে পাগলের মত অন্ধকার স্রোতে খুঁজছে, তখন এই সৈনিকটা তাকে গমন করেনি তো!
–কী হল? প্রশ্ন করল সাদইদ।
রিবিকা জবাব না দিয়ে উঠে বসে অন্ধকার স্রোতের কোন ক্ষীণ স্মৃতি শরীরে স্পষ্ট লেগে আছে কিনা মনে মনে বুঝে নিল। শরীর কাহিল, কিন্তু অজ্ঞানতার ক্রমাগত নিমজ্জন তাকে অসহায় করেছে, পীড়ন করেনি-বুঝতে পেরে ফের দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল । রিবিকা আপন বুকের দিকে কাপড়ের আড়ালে চক্ষু সঞ্চালিত করে টের পেল মৃত পতঙ্গ অক্ষত। তার কান্না আরো বেড়ে গেল।
সাদইদ বলল–নিনিভে নগরী তোমার চেয়ে সুন্দরী নিশ্চয়। মনে রেখো সেখানের সিংদুয়ারে বৃষমূর্তি আছে বৃষের মুখ মানুষের মত। স্কন্ধ বৃষ, চোখ মানুষের। সেই চোখে তোমার জন্য কোন কান্নার জল জমে নেই–তা আগুন জ্বালায়। বৃষবক্ষ যাকে বলি, তা নির্মম। ওঠো, আমার সঙ্গে তোমাকে যেতে হবে।
কথার শেষ অংশে গলা কঠোর করে তুলল সাদইদ।
গাছপালার ফাঁক দিয়ে জুমা পাহাড়ের দিকে আবার চাইল সাদইদ।
বলল–তোমাকে মধু আর রুটি দিতে পারি। দেখে মনে হচ্ছে তুমি অনেক দিন কিছু খাওনি। চলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তোমাকে শিবিরে নিয়ে যাই।
রিবিকা ঘোড়ার পিঠে ফের উঠে বসেছিল। অত্যন্ত ম্লান গলায় বলল–খিদেয় ধোঁকাচ্ছি, দেহে বল নাই। এই অবস্থায় যা খুশি করতে পারো। তবে দোহাই, আমাকে শিবিরে দিও না। তোমার সৈনিকরা আমাকে ছিঁড়ে খাবে। হায়েনার হাত থেকে মসীহ আমায় রক্ষা করেছেন, একটা মেষশিশুর কাছ থেকে তুমি একজন প্রজাপতির বন্ধু, কিছুই কি শিখবে না?
–অ। তুমি দেখছি ভারী চালাক। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীদের কাছে থেকে কতকিছুই শেখার আছে। হ্যাঁ, আমি একথা বিশ্বাস করি। আমার কাছে ব্যাপারগুলি খুবই স্পষ্ট। অবশ্য ক্ষুদ্র কেন, বৃহৎ প্রাণী যারা, তারাও আমাদের শেখায়। উট, অশ্ব, কুকুর। এরা কেউ ভগবান নয়। এরা লাঠিধারীদের মত ইশারাবাদীও নয়, ভণ্ডও নয়। কিছু মনে করো না। পিতা নোহ ছাড়া আমার কোন মসীহর উপর আস্থা নেই।
বলতে বলতে একটি দেবদারু গাছের ছায়ায় ফের দাঁড়িয়ে পড়ল সাদইদ।
বলল–এখানে একলা তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। তুমি নিচে নেমে এসো। আমার ভয় হচ্ছে, তোমাকে সৈনিকরা দেখলে কিছুতেই ছাড়তে চাইবে না।
–দোহাই!
আর্তনাদ করে উঠল রিবিকা। বলল–আমি তোমার কবিতার তারিফ করি সারগন। পিতা নোহের সন্তান তুমি–আমায় বাঁচাও।
–আমি সারগন নই প্রজাপতি। আমাকে এত সম্মান দেখানোর কিছু নেই। আমি শুধু প্রজাপতি দু’টির’আচরণে মুগ্ধ আর অবাক হয়েছি। জানি মধুর। লোভেই তারা তোমার কাছে এসেছিল। কিন্তু তারপর ঘটনাটা অন্যরকম। হয়েছে। ওরা বিভ্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সেটা খুব দুর্লভ ব্যাপার। ঠিক তোমাকে বোঝাতে পারব না। হৃদয় উর্বর হলে, আমি এ নিয়ে দু ছত্র লিখতাম। পাথরের গায়ে কুঁদে রাখলে সেটা বাবিলের অনুশাসনলিপির চেয়ে মূল্যবান হত। ধন্যবাদ! তুমি আমার কবিতার তারিফ করেছ!
