তারেক বসতে বসতে বলল, তোর ভাবি ঝোঁকের মাথায় ফট করে চলে গেল। এই নিয়ে কারো সঙ্গে কথাও বলা হয় নি।
কথা বলার কী আছে?
সেটাও ঠিক কথা বলার কী আছে? লজ্জাজনক ব্যাপার।
তোমার জন্যে লজ্জাজনক তো বটেই। যা ঘটেছে তোমার জন্যেই ঘটেছে।
তোর ভাবি কোথায় আছে কিছু জানিস?
শ্যামলীতে আছে। তার এক বান্ধবীর বাড়িতে।
ও আচ্ছা।
ঠিকানা চাও?
না ঠিকানা দিয়ে কী করব?
তুমি যদি মনে করা–ভাবির সঙ্গে কথা বলে তাকে ফিরিয়ে আনবে।
সেটা ঠিক না। ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা কোনো কাজের কথা না। আমি তাকে চলে যেতে বলি নি–সে চলে গেছে। আমি যদি তাকে চলে যেতে বলতাম তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার ছিল। যদি আসার হয় নিজেই আসবে।
হাসান হাই তুলতে তুলতে বলল, ভাবি কঠিন জিনিস। নিজ থেকে আসবে না।
না এলে কী আর করা। বাচ্চাদের খানিক সমস্যা হবে–এই আর কী? সমস্যা তো পৃথিবীতে থাকেই। সমস্যা নিয়েই আমাদের বাস করতে হয়।
তুমি কি তোমার অফিসের ওই মহিলাকে বিয়ে করবে?
বিয়ের কথা আসছে কেন?
বিয়ে হচ্ছে না?
তারেক সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সহজ গলায় বলল, টগরের কাছে শুনলাম–ওদের মার সঙ্গে দেখা হয়–এটা ভালো। আর্লি ষ্টেজে মার ভালোবাসা দরকার। মায়ের ভালবাসা ভিটামিনের মতো কাজ করে। যাক।—সময়ে-অসময়ে ভিটামিনটা পাচ্ছে।
হুঁ।
ও কি চাকরি-বাকরি কিছু করছে?
জানি না। হয়তো করছে।
চাকরির বাজার খুবই টাইট–তবে মেয়েদের স্কোপ বেশি। বলিস ভালোমতো যোগাযোগ করতে। পত্রিকা দেখে এপ্লিকেশন করলে হবে না। সরাসরি উপস্থিত হতে হবে।
ভাইয়া আমার মাথা ধরেছে। কথা বলতে ভালো লাগছে না।
দে একটা সিগারেট খাই। সিগারেটটা শেষ করে চলে যাব।
নিজের ঘরে গিয়ে খাও।
তোর এখানে খেয়ে যাই।
ভাইয়া তুমি কি ভাবিকে টেলিফোন করতে চাও? ভাবি যে বাড়িতে থাকে সেখানকার টেলিফোন নাম্বার আমার কাছে আছে।
টেলিফোন করে কী করব?
কী করবে তা জানি না। টেলিফোন নাম্বার আছে তুমি চাইলে দিতে পারি।
আচ্ছা দে রেখে দেই। তোর এই অবস্থা কেন? মনে হচ্ছে রোদে পুড়ে কাঠকয়লা হয়ে গেছিস। ব্যাপার কী?
কোনো ব্যাপার না।
রোদে বেশি ঘুরবি না। চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রে খুব খারাপ। ঙ্কিনক্যানসার হয়।
হুঁ। ভাইয়া এই নাও ভাবির টেলিফোন নাম্বার। এখন চলে যাও। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরা–কথা বলতে ভালো লাগছে না।
হালকা ধরনের কথাবার্তা বললে বরং মাথা ধরাটা কমে। লাইট ডিসকাশন ওষুধের মতো কাজ করে।
ভাইয়া আমার বেলায় করে না। তাছাড়া আমাদের ডিসকাশন মোটেই লাইট হচ্ছে न्म।
তারেক উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, তোর সঙ্গে আরেকটা জরুরি কথা ছিলএখন মনে পড়ছে না।
মনে পড়লে বলবে।
যখন মনে পড়বে তখন দেখা যাবে তুই পাশে নেই। আর তোর সঙ্গে যখন দেখা হবে তখন আর জরুরি কথাটা মনে পড়বে না। মানুষের জীবন মানেই এই জাতীয় জটিলতা।
হুঁ।
মানুষের মনে যে বয়সে নানান ধরনের শখ হয় সে বয়সে টাকা-পয়সা থাকে না। বুড়ো বয়সে যখন টাকা-পয়সা হয় তখন আর শখ থাকে না।
তোমার কী শখ?
ব্যাংককে গিয়ে একবার একটা ম্যাসেজ নেয়ার শখ ছিল। এই বিষয়ে অনেক কথা শুনেছি। আমার পরিচিত কয়েকজন ম্যাসেজ নিয়েছে। খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। বিরাট একটা কাচের ঘরের পেছনে কলেজ-ইউনিভার্সিটির ইয়াং মেয়েরা সেগোগুজে বসে থাকে। প্ৰত্যেকের আলাদা আলাদা নম্বর আছে। তোর একটা মেয়ে পছন্দ হলো–ধর তার নাম্বার তিন শ তের। তুই তিন শতের নাম্বারে একটা কার্ড…।
ভাইয়া চুপ কর। তোমার কাছ থেকে এ সব শুনতে খুবই অস্বস্তি লাগছে। এইসব তুমি কী বলছ?
কী বলছি মানে? খারাপ কী বলছি?
কী বলছি বুঝতে পারছি না? তোমার জীবনের সবচে’ বড় শখ একটা বেশ্যা মেয়ে তোমার গা দলাই মলাই করবে।
বেশ্যা মেয়ে বলছিস কেন? ওরা সব কলেজ-ইউনিভার্সিটির মেয়ে। স্ট্যান্ডার্ড ফ্যামিলির মেয়ে। তাছাড়া এটাই যে আমার জীবনের সবচে’ বড় শখ তাও না। অনেকগুলো শখের মধ্যে একটা…।
ভাইয়া আমার খুব মাথা ধরেছে, তুমি এখন যাও।
শ্যাস্পেনের এত নামধাম শুনেছি। খেয়ে দেখার শখ ছিল–একটা বোতলের দামই শুনেছি। দু-তিন হাজার টাকা…।
ভাইয়া প্লিজ আমি আরেকদিন তোমার শখের কথাগুলো শুনবো।
তুই এমন রেগে গেলি কেন?
রাগি নি। আমি তো বললাম, আমার খুব মাথা ধরেছে।
কমলার মাকে বল এক বালতি গরম পানি করে দিতে। গরম পানি দিয়ে হট শাওয়ার নিলে শরীরটা হালকা হবে, ভালো ঘুম হবে।
আচ্ছা আমার যা করার করব তুমি যাও।
ফট করে রেগে গেলি। আশ্চর্য!
তারেক নিজের ঘরে ঢুকল। হাসানকে যে জরুরি কথাটা বলার ছিল সে কথাটা তখনি মনে পড়ল। তাকে গিয়ে সেই কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না। অকারণে সে যেমন রেগে গেছে–দরজায় ধাক্কা দিলে সে হয়তো দরজাই খুলবে না। কথাটা হচ্ছে তার অফিসে একটা মেয়ে টেলিফোন করেছে। মেয়েটার নাম চিত্ৰলেখা। সে হাসানকে খুঁজছে। খুব নাকি জরুরি। একবার না, মেয়েটা টেলিফোন করেছে। দু’বার।
ঘুমোতে যাবার আগে তারেক একটা কাগজে বড় বড় করে লিখল–চিত্ৰলেখা। সকালবেলা এই কাগজটা দেখলেই তার মনে পড়বে। হাসানকে খবরটা দেয়া যাবে।
সবচে’ ভালো হতো এখন দিতে পারলে।
রীনাকে টেলিফোন করার কোনো ইচ্ছা তারেকের ছিল না। অফিসে এসে রুমাল বের করার জন্যে পকেটে হাত দিয়ে দেখে রীনার টেলিফোন নাম্বার লেখা কাগজ। টেলিফোন করলে কে ধরবে? রীনার বান্ধবী? নাকি রীনাই ধরবে? তারেক টেলিফোন করবে কী করবে না বুঝতে পারছে না। তারপরেও কী মনে করে করল। দুটা রিঙের ভেতর না ধরলে সে রেখে দেবে।
