কথায় কথায় গুড বলছিস কেন?
মিস বলেছে বাসায় সব সময় ইংরেজি বলতে হবে।
হোমওয়ার্কের খাতায় এটা কীসের ছবি?
ভূতের ছবি। ভূতের গলা এত লম্বা থাকে নাকি?
এটা সাপভূত তো এজন্যে গলা লম্বা। সাপভূতদের গলা লম্বা হয়।
হোমওয়ার্কের খাতায় ছবি আঁকছিস কেন?
ছবি আঁকার খাতা শেষ হয়ে গেছে এই জন্যে।
মিস রোগ করবে।
মিস খুব এংরি হবে। রাগের ইংরেজি হলো এংরি।
এংরি বানান কী?
বানান জানি না।
পলাশ তুই জানিস?
জানি না।
গুড বানান জানিস?
জানি, কিন্তু বলব না।
বলবি না কেন?
তুমি তো আমাদের মিস না। মিস বানান জিজ্ঞেস করলে বলতে হয়।
আর কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতে হয় না?
না।
তারেক সিগারেট ধরাল। এদের পড়াশোনা করানো মোটামুটি অসম্ভব ব্যাপার। একজন টিচার রেখে দিতে হবে। বাড়তি খরচ, তাতে অসুবিধা হবে না। সংসারে মানুষ কমে গেছে। লায়লার বিয়ে হলে আরো কমবে। তার বেতনও কিছু বাড়বে। খুব শিগগিরই প্রমোশন হবার কথা। পলাশ বলল, বাবা সিগারেট খেলে ক্যানসার হয়।
কে বলেছে, মিস?
না, মা বলেছে।
মার প্রসঙ্গ চলে আসায় তারেক একটু শঙ্কিত বোধ করল। এই প্রসঙ্গ আলোচনায় না আসাই বোধহয় মঙ্গলজনক। টগর গম্ভীর গলায় বলল, যে সিগারেট খায় সে মারা যায়। আর সিগারেট খাবার সময় আশেপাশে যারা থাকে তারাও মারা যায়। তুমি সিগারেট খেলে আমরা মারা যাব।
কে বলেছে, তোদের মা না মিস?
মা বলেছে। সিগারেট যেমন খারাপ, চকলেটও খারাপ। চকলেট খেলে দাঁত নষ্ট হয়ে যায়। এক রকম পোকা এসে দাঁত খেয়ে ফেলে। দাঁতের ইংরেজি হলো টুথ।
তারেক সিগারেট ফেলে দিল। মার প্রসঙ্গ চলে এসেছে–এখন কি সেই বিষয়ে দুএকটা কথা বলা ঠিক হবে? না পুরো বিষয়টা নিয়ে চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে?
টুথের বানান কী?
ট-উ-কারে টু, থ—টুথ।
বাংলা বানান না। ইংরেজি?
জানি তোমাকে বলব না।
তারেক ইতস্তত করে বলল, তোর মা যে আসছে না। এ নিয়ে কী করা যায় বল তো?
টগর-পলাশ দুজনই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। তারেক বাচ্চাদের দিকে না। তাকিয়ে বলল, তোর মা যে আসছে না, এ জন্যে নিশ্চয়ই তোদের মন খারাপ। তার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না।
পলাশ বলল, দেখা হয় তো।
পলাশের এই কথা বলা মনে হয় ঠিক হয় নি। টগর চোখের ইশারায় তাকে চুপ করতে বলেছে। তারেক বিস্মিত হয়ে দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে।
মা’র সঙ্গে দেখা হয়?
হুঁ।
বাসায় আসে নাকি?
না। স্কুলে যায়।
স্কুলে যায়?
একদিন মা তার বাসায় নিয়ে গেল।
বাসায় নিয়ে গেল মানে–বাসা ভাড়া করেছে? বাসা কোথায়?
জানি না।
বাসাটা কেমন?
সুন্দর।
সে একাই থাকে না। আরো লোকজন থাকে?
জানি না।
জানিস না মানে কী? বাসায় আর কাউকে দেখিস নি?
উঁহুঁ।
তোদের মা যে তোদের দেখতে আসে, তোরা যে তার বাসায় গিয়েছিলি এটা এ বাড়ির আর কে জানে?
সবাই জানে। শুধু তুমি জান না।
মার বাসায় কীভাবে গিয়েছিল–সে এসে নিয়ে গিয়েছিল?
চাচু নিয়ে গিয়েছে। আবার নিয়ে এসেছে।
হাসান নিয়ে গেছে?
হুঁ।
তারেক অ্যাশট্রেতে ফেলে দেয়া আধা-খাওয়া সিগারেট তুলে নিল। তার দুই পুত্ৰ তার দিকে তাকিয়ে আছে। টগর বলল, ব্যাটম্যান মানে কী, তুমি জানি বাবা?
তারেক অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, না।
ব্যাটম্যান মানে হলো বাদুরমানুষ। ব্যাট মানে বাদুর। ম্যান মানে মানুষ।
ও।
বাদুরমানুষ কিন্তু উড়তে পারে না। শুধু লাফ দিতে পারে। একটা বাড়ির ছাদ থেকে আরেকটা বাড়ির ছাদে যায়। আর ঘোস্ট মানে কী জান?
হুঁ।
ঘোস্ট মানে ভূত। ভূত কিন্তু পৃথিবীতে হয় না। শুধু কার্টুনে হয়। আমাদের মিস বলেছে। অদৃশ্য মানব কাকে বলে তুমি কি জান বাবা?
না।
অদৃশ্য মানবকে চোখে দেখা যায় না। অদৃশ মানব কিন্তু ভূত না। মানুষ।
হুঁ।
অদৃশ মানব চোখে দেখা যায় না, এই জন্যে এদের ছবিও আঁকা যায় না। কিন্তু পলাশ তো বোকা–এই জন্যে সে অদৃশ্য মানবের ছবি এঁকেছে। ছবি দেখবে বাবা?
তারেক ‘হুঁ’ বলল। কিন্তু উঠে চলে গেল। ব্যাপারটা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না-সবাই মিলে কি তাকে বয়কট করেছে? হাসানের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলা দরকার; হাসানের সঙ্গে তার দেখা ইদানীং হচ্ছে না। হাসানের ব্যস্ততা খুব বেড়েছে। কোনো একটা কাজটাজ বোধহয় করছে। কী কাজ তা এখনো জিজ্ঞেস করা হয় নি। যে কাজই করুক খুব পরিশ্রমের কাজ নিশ্চয়ই। রোদে পুড়ে চেহারা নষ্ট হয়ে গেছে। সস্তা সিগারেটও মনে হয় প্রচুর খাচ্ছে। হাসান পাশ দিয়ে গেলে মনে হয় তামাকের একটা ফ্যাক্টরি হেঁটে চলে গেল। জর্দা দিয়ে পানও খাচ্ছে–দাঁত লাল–মুখ দিয়ে ভুরিভুরে জর্দার গন্ধ আসে।
হাসান দরজা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল। তারেক ধাক্কা দিতেই উঠে এসে দরজা খুলল।
ঘুমোচ্ছিলি?
না। শুয়েছিলাম।
দশটা বাজতেই শুয়ে পড়লি, শরীর খারাপ?
জ্বর জ্বর লাগছে।
রোদে রোদে ঘুরলে জ্বর তো লাগবেই-ভদ্রে মাসের রোদে তাল পেকে যায়, মানুষ তো পাকবেই। ভদ্র মাসে রাস্তাঘাটে মানুষ ঘোরে তাদের বেশির ভাগই পাকা মানুষ।
সিগারেট লাগবে ভাইয়া?
না সিগারেট লাগবে না। এক প্যাকেট কিনেছিলাম, সাতটা খেয়েছি। এখনো তেরটা বাকি আছে। এলাম তোর সাথে একটু গল্প-গুজব করি, বাতিটা জ্বালা।
হাসান অনিচ্ছার সঙ্গে বাতি জ্বালোল। তার জ্বর এসেছে। ভালো জুর। দুপুরে সে কিছু খায় নি। রাতেও খায় নি। ক্ষিধেয় নাড়ি পাক দিচ্ছে কিন্তু কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে কোনো খাবার সামনে আনলেই বমি হয়ে যাবে।
