কার কাছে শুনলেন?
তোমার বড় ফুফু, বললেন। তোমার হাতে নাকি জাদু আছে। আরেকবার তোমাকে নিয়ে এখানে আসব সেদিন তুমি রাঁধবে। সব যোগাড় যন্ত থাকবে। তুমি শুধু রান্না চড়িয়ে দেবে। তোমার কী কী লাগবে একটা লিষ্ট করে দিলে সেইভাবে ব্যবস্থা করে রাখব। ঠিক আছে?
জ্বি ঠিক আছে।
তোমার কোন রান্না ভালো হয়? মাছ না মাংস?
আমার মনে হয় মাছ।
সর্বনাশ করেছ, মাছ তো আমি খেতেই পারি না। মাছের মধ্যে চিংড়িটা খাই। তাও যে খুব আগ্রহ করে তা না।
শওকত আরেকটা সিগারেট ধরাল। তিতলী তাকিয়ে আছে বা পাশের জানালার দিকে। গাড়িতে বসে থাকতে তার ভালোই লাগছে। লোকটা অকারণে কথা বলে ভাব জমাতে চেষ্টা করছে এটাও খারাপ লাগছে না। একবার তার ইচ্ছা করল বলে–ভাব জমানোর জন্যে অকারণ কথা বলার দরকার নেই। ভাব হবার হলে আপনাতেই হবে।
একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছি। তোমার অসুবিধা হচ্ছে না তো?
জ্বি না।
খুব সস্তা ধরনের একটা কথা তোমাকে বলার ইচ্ছে করছে তুমি কী ভাববে ভেবে বলতে অস্বন্তি বোধ করছি। এ জাতীয় কথা ছেলেরা বাংলা সিনেমায় বলে।
আপনার যা বলতে ইচ্ছে করে বলুন।
তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। সারাক্ষণ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। তাকিয়ে থাকলে অ্যাকসিডেন্ট হবে সেই ভয়ে তাকাচ্ছি না।
গাড়ি কোথাও পার্ক করুন। পার্ক করে তাকিয়ে থাকুন।
শওকত শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসি আর থামেই না।
বাগানবাড়িতে পৌঁছে শওকতের মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। গেট তালাবন্ধ। আশপাশে কেউ নেই। ডাকাডাকি, চিৎকার, তালা ধরে ঝাঁকুনি কিছুতেই কিছু না। চারদিকে জনমানবশূন্য। তিতলী বলল, আপনি না বলেছিলেন আপনার কাছে চাবি আছে।
শওকত বিরক্তমুখে বলল, ভেতরের ঘরের চাবি। গেটের চাবি নেই। সবাইকে খবর দেয়া আছে তারপরেও এ কী অবস্থা।
গেট শেষ পর্যন্ত খুলল। দারোয়ান ভেতরে ঘুমোচ্ছিল। চোখ ডলাতে ডালতে সে এসে গেট খুলে দিল। এতে সমস্যার সমাধান হলো না। শোনা গেল মনতাজি মিয়ার জ্বর এসেছে বলে সে দুপুরে ঢাকায় চলে গেছে। রান্নার কোনো যোগাড় যন্তও নেই। সবকিছু মন্তাজের করার কথা। শওকত রাগে ফুসতে লাগল। তিতলী বলল, আপনি অস্থির হবেন না। একটা তো মোটে রাত-না খেয়ে আমি থাকতে পারব।
শওকত বিরক্ত গলায় বলল, না খেয়ে থাকবে কেন? আমি বাজারে যাচ্ছি যা পারি নিয়ে আসব–দারোয়ান রাঁধবে। তুমি একা থাকতে পারবে তো? ঠিক একাও না। দারোয়ান থাকবে। থাকতে পারবে?
পারব।
ভয়ের কিছু নেই; আর এই দারোয়ান খুব বিশ্বাসী।
আপনি বাজার করে আনুন। আমার কোনো অসুবিধা হবে না।
তুমি ঘুরে ঘুরে বাগান দেখ। শোবার ঘরে ছোটখাটো লাইব্রেরির মতো আছে। গল্পের বইটই পড়তে পার।
জ্বি আচ্ছা।
তিতলী একা একা অনেকক্ষণ হাঁটল। বাগানবাড়িটা আসলেই সুন্দর। শহরে পাখির ডাক শোনা যায় না–এখানে অনবরত পাখি ডাকছে। কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। পাখির ক্যানক্যানে ডাক খুব শ্রুতিমধুর না। শান্ত কোনো বন কি পৃথিবীতে আছে। যেখানে একটি পাখিও ডাকে না? শুধু খুব বাতাস হলে পাতার শব্দ শোনা যায়। এরকম বন থাকলে চমৎকার হতো। ভদ্রলোকের মামা–কী নাম যেন মিজু মামা, তিনি জায়গাটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছেন। ঝিলের মতো একটা জায়গার পাশে বসার জন্যে সিমেন্টের আসন বানিয়েছেন। দেখলেই বসতে ইচ্ছে করে। ঝিলের পানি অবশ্যি ঘোলা। পুকুর বা সিালের পানি হবে। আয়নার মতো চকচকে–যে পানি দেখামাত্ৰ হাত দিয়ে ছুতে ইচ্ছে করবে। যে পানিতে মুখ দেখতে মন চাইবে। এই পানির কাছে যেতে ইচ্ছে করে না।
মানুষেবা সঙ্গে পানির আশ্চর্য মিল আছে। কোনো কোনো মানুষকে পরিষ্কার ঝকঝকে পানির মতো মনে হয়। তাদের কাছে যেতে ইচ্ছে করে, সেই পানি ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, সেই পানিতে নিজের মুখ দেখতে ইচ্ছে করে। আবার কিছু কিছু মানুষ এই ঝিলের পানির মতো হাত দিয়ে ছোয়া দূরের কথা, কাছে যেতেও ইচ্ছে করে না। তারপরেও যেতে হয়। এই যেমন সে ঝিলের এই পানি পছন্দ করছে না, তারপরেও পানির পাশেই বসে আছে।
তিতলী তুমি এখানে?
জ্বি।
খাবারের ব্যবস্থা করেছি। ফ্লাঙ্কে করে চা নিয়ে এসেছি। দোকানের চা। ওভালটিন দেয়া, খেতে পারবে কিনা জানি না। খাবে?
জ্বি খাব।
শওকত ব্যস্ত ভঙ্গিতে চা আনতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্লাঙ্ক এবং দুটা কাপ নিয়ে এল। শার্টের বুকপকেটে এক প্যাকেট বিসকিট। মনে হচ্ছে মানুষটা খুব গোছানো স্বভাবের।
তিতলী।
জ্বি।
বাগানবাড়ি কেমন লাগছে?
সুন্দর।
আমাদের গ্রামের বাড়ি কিন্তু খুব সুন্দর। বিরাট পুকুর। শান বাধানো ঘাট। পানিও খুব পরিষ্কার–তোমাকে নিয়ে যাব।
জ্বি আচ্ছা।
তুমি দেখি জ্বি এবং জুি আচ্ছা ছাড়া কোনো কথা বলছি না। মাথা ধরেছে?
জ্বি।
এই নাও প্যারাসিটামল। আমি গাড়িতেই বুঝেছি তোমার মাথা ধরেছে–একপাতা প্যারাসিটামল নিয়ে এসেছি। দাঁড়াও একটা পানির বোতল নিয়ে আসি।
শওকত ব্যস্ত ভঙ্গিতে পানির বোতল আনতে গেল। তিতলী ট্যাবলেটের পাতা হাতে নিয়ে বসে আছে। সে নিজেকে তৈরি করছে। খুব কঠিন কিছু আজ তাকে বলতে হবে। বলতে হবে খুব সহজ ভঙ্গিতে। কথাগুলো সে মনে মনে অনেকবার বলেছে। মনে মনে বলা এক কথা, আর সামনাসামনি বলা আরেক কথা। তবু তাকে বলতেই হবে।
