শরিফা আমগাছের ডালে সুতা বাধল। চোখ বন্ধ করে বলল, আল্লাহপাক, দয়া কর। আমি দরিদ্র মেয়েমানুষ। ভাইজান আমাকে আদর করে একশ’টা টাকা দিয়েছেন। কতকিছু কিনব শখ করে আছি। তুমি টাকাটা মিলায়ে দাও।
সুতা বেঁধে শরিফা ফিরছে। জঙ্গলের ভেতর ঢুকেই সে বোরকার মাথার পর্দা সরিয়ে দিল। জঙ্গলােভর্তি গাছপালা। গাছপালার সামনে পর্দা করার কিছু নাই।
মা, এখানে কী করেন? শরিফা চমকে উঠল। বঁদিকে শিমুল গাছের নিচে লাবুস দাঁড়িয়ে আছে। শরিফার উচিত দ্রুত বোরকার পর্দা ফেলে দেয়া। কিন্তু তার হাত-পা কেমন শক্ত হয়ে গেছে।
মা, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি লাবুস। এক রাতে আপনি আমাকে আদর করে খানা দিয়েছিলেন।
শরিফা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আমি যাই। আমি যাই।
লাবুস বলল, আমি আপনাকে জংলী পার করায়ে দেই?
শরিফা বোরকার পর্দা ফেলে দিয়ে ভীত গলায় বলল, লাগবে না লাগবে না।
শরিফা দৌড়াচ্ছে। যে-কোনো সময় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে এমন অবস্থা।
বাড়ির উঠানে ঢুকে শরিফা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়ি সুনসান। করিমের ঘুম এখনো ভাঙে নি। ঘুম ভাঙলে সে শরিফাকে না দেখে চিন্তিত হয়ে উঠানে বসত।
শরিফা ঘরে ঢুকল। করিম চাদর গায়ে ঘুমাচ্ছে। শরিফা বোরকা খুলে উঠানে এসে অসমাপ্ত ঝাড়ু শুরু করল। কলাপাতার বেড়ার ওপাশ থেকে কেউ একজন গলাখ্যাকারি দিয়ে বলল, ইমাম সাহেব আছেন? উনার সঙ্গে বিশেষ প্রয়োজন ছিল। শরিফা জবাব দিল না। জবাব দেবার অর্থ পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা।
বেড়ার ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, আমার নাম মজু। ইমাম সাহেব একটা কাজে আমাকে একশ’ টাকা দিয়েছিলেন। কাজটা হয় নাই। আমি টাকাটা ফেরত দিব। এখনই ফেরত দিতে হবে। আমি লঞ্চে উঠব। কইলকাতা याद।
শরিফা দাঁড়িয়ে আছে। একশ’ টাকার কথা উঠেছে। ব্যাপারটা কী? করিম একশ’ টাকা কোথায় পেয়েছে?
মজু বলল, আপনে বাড়ির ভিতরে যান। আমি উঠানে টাকা রাইখা যাব। জলচৌকির উপর রাখব।
শরিফা ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। তার বুক ধ্বক ধ্বক করছে। ঘটনাটা কী?
জলচৌকির ওপর পাথর চাপা দেয়া নোটটা যে শরিফার এই বিষয়ে শরিফা নিশ্চিত। নোটের এক কোনায় হলুদের দাগ। গাছে চুল বাধায় কাজ হয়েছে। আল্লাহপাক শরিফার টাকা শরিফাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে এখন শরিফার মনে হচ্ছে কাজ না হলেই ভালো হতো। কিছু জিনিস গোপন থাকাই ভালো।
শরিফা!
শরিফা চমকে তাকাল। ঘুমন্ত মানুষ জেগে উঠেছে। তার গলায় বিরক্তি।
ফজর ওয়াক্ত পার হয়েছে, তুমি আমারে ডাকলা না— এটা কেমন কথা! তুমি নিজে কি নামাজ পড়েছ?
পড়েছি।
নিজে ঠিকই পড়লা, আমারে ডাকলা না?
আপনে সারা রাইত জাগনা ছিলেন এই জন্যে ডাকি নাই।
বিরাট অন্যায় করেছ শরিফা। বিরাট অন্যায়। তাড়াতাড়ি অজুর পানি দেও।
করিম অজু করছেন। শরিফা জলচৌকিতে বসা করিমের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে চোখ ফেরাতে পারছে না। এই মানুষটা তার একশ’ টাকা চুরি করেছে? এই মাওলানা মানুষ। তার স্বামী। হাদিস কোরান জানা স্বামী। তাকে কি শরিফা সরাসরি প্রশ্ন করবে? না-কি চুপ করে থাকবে?
করিম অজুর শেষে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, কী দেখো?
আপনারে দেখি।
আমারে দেখার কী আছে?
শরিফা বলল, আইজ আপনারে সুন্দর লাগতেছে। চেহারায় নুরানি ফুটছে। আপনারে একটা প্রশ্ন করব। নামাজের আগে করব না। পরে করব বুঝতেছি না।
কর, এখনই কর। আর একটা কথা, সব সময় মাথার মধ্যে প্রশ্ন নিয়া ঘুরবা না। বলো প্রশ্নটা কী?
শরিফা বলল, হাদিস কোরান মতে চুরির শাস্তি কী?
হাদিস কোরান মতে চুরির শাস্তি ভয়ঙ্কর। প্রথমবার যে চুরি করবে। তার ডান হাত কেটে ফেলতে হবে। তারপরেও চুরি করলে বাম হাত।
আপনার ডান হাত কাটা গেলে আপনে চলবেন কীভাবে?
কী বললা?
শরিফা চুপ করে রইল। করিম বলল, একশ’ টাকা হারায়া তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এখন আমারে চোর ভাবতেছ। আল্লাহপাক এই কারণে তোমারে কঠিন শাস্তি দিবেন। শাস্তি থেকে বাঁচার একটাই পথ। তওবা করা। আমার সঙ্গে তিনবার বলো- তওবা আস্তাগাফিরুল্লা।
তাওবা আস্তাগাফিরুল্লার।
আবার বলো তওবা আস্তাগাফিরুল্লা।
শরিফা আবার বলল, তওবা আস্তাগাফিরুল্লা। বলতে বলতে সে কী মনে করে হেসে ফেলল। মাওলানা ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, হাসো কেন? কিছুই বুঝলাম না, এখানে হাসির কী আছে!
শরিফা বলল, আমার হারানো টাকা আমি খুঁজে পেয়েছি, এইজন্যে মনের আনন্দে হাসতেছি। এই দেখেন টাকা। এক কোনায় হলুদের দাগ।
শাড়ির আঁচল খুলে শরিফা টাকা বের করেছে। মেলে ধরেছে।
টাকা কই পাইলা?
আপনে একজনেরে টাকাটা দিয়েছিলেন, সে ফিরত দিয়া গেছে।
তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? তুমি এইসব কী বলতেছ?
টাকা আপনে আমার বরই-এর হাঁড়ি থাইকা চুরি করেন নাই?
কী বলো তুমি!
শরিফা ঠান্ডা গলায় বলল, আপনে নামাজ শেষ কইরা স্থির হয় বসেন। আমি আপনের হাত কাটব। কুড়াল দিয়া এক কোপ দিব।
নাউজুবিল্লাহ। নাউজুবিল্লাহ।
নাউজুবিল্লাহ, বইলা লাভ নাই। আমি সত্যি হাত কাটব। বিসমিল্লাহ, বইল্যা এক কোপ দিব।
হঠাৎ শরিফার হাসি পেয়ে গেল। মানুষটা ভয় পেয়েছে। মনে হয়। সতি্যু সত্যি বিশ্বাস করছে তার হোত কাটা যাবে। শরিফার সামান্য মায়াও লাগছে।
করিম বলল, শরিফা তুমি পাগল। আমি পাগল স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করব না। আমি ঠান্ডামাথায় পশ্চিমমুখী হইয়া তোমারে তালাক দিতেছি। তালাক তালাক তালাক।
