মাওলানা বললেন, না। সে আমার কোনো ক্ষতি করে নাই। আমি তারে মারব কী জন্যে?
যখন ক্ষতি করব তখন কিন্তু আর উপায় থাকব না। এইটা শঙ্খচূড় সাপ। এর বিষ নামানি কোনো ওঝার পক্ষেও সম্ভব না।
মাওলানা সাপ খেদানোর চেষ্টা আরেকবার করলেন। শলার ঝাড়ু দিয়ে কয়েকবার সাপের খুব কাছাকাছি বাড়ি দিলেন। সাপের কোনো ভাবান্তর হলো না। মাথা উঁচু করে সে একবার মাওলানাকে দেখল, আরেকবার জুলেখাকে দেখে আগের মতো মাথা নামিয়ে ফেলল। মাওলানা বা জুলেখা দু’জনের কেউ তখন জানে না। এই শঙ্খচূড় সাপটা ডিম পাড়ার জন্যে খাটের নিচটা বেছে নিয়েছে। তাকে এখান থেকে সরানো এখন অসম্ভব।
ধনু শেখ খেতে বসেছেন। খাটে দস্তরখানা বিছিয়ে খাবার সাজানো হয়েছে। লাবুস তাঁর সঙ্গেই বসেছে। কালিজিরা চালের পোলাও, খাসির মাংস। বাটিভর্তি পেয়াজ দেয়া হয়েছে। খাদিমদার আছে দু’জন। একজন লাবুসের প্লেটে খাবার দিচ্ছে, আরেকজন ধনু শেখকে দেখছে।
লাবুস মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে। তার গায়ে নকশাতোলা পাঞ্জাবি! পায়জামা পাঞ্জাবিতে লাবুসকে সত্যিকার অর্থেই রাজপুত্রের মতো লাগছে। ধনু শেখ খানিকটা বিচলিত বোধ করছেন। কেন করছেন তাও বুঝতে পারছেন না। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, তোমার নাম কী বলেছিলা বিস্মরণ হয়েছি। আরেকবার বলে।
লাবুস।
পিঁয়াজ নিয়া খাও। মুসলমানদের জন্যে পিঁয়াজ খাওয়া দুস্তর। কারণ পিঁয়াজ মুসলমান। রসুন হিন্দু। বুঝেছ?
হুঁ।
একবার তো বলেছি। ই হাঁ করবা না। এখন তোমাকে আদবাকায়দা শিখতে হবে। কারণ তুমি এখন রাইস আদমি।
লাবুস বলল, রাইস আদমির দোষ-ত্রুটি লাগে না। দোষ-ত্রুটি গরিবের জন্য।
তোমাকে এইসব কে শিখায়েছে? তোমার ভিক্ষুক পিতা?
আমার যা শিখার আমি নিজে শিখেছি। আমার কোনো শিক্ষক নাই।
ধনু শেখ বললেন, আমারে শিক্ষক মানতে পার। আমি অনেক কিছু জানি যা তুমি জানো না। সোহরাবদীর নাম শুনেছ?
জি না।
তিনি এখন আমাদের নেতা। আমি তার নাম দিয়েছি কাটাকুটি নেতা।
কেন?
কারণ তিনি গোপনে দাঙ্গা-হাঙ্গামার কথা বলেন। তাঁর মন্ত্র হিন্দু কমাও।
মুসলমান কমাও, এই মন্ত্র কি কেউ বলে?
সব হিন্দু নেতাই মনে মনে এই মন্ত্র জপ করে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলে।
গান্ধিজি কি বলেন?
গান্ধিজি চুপ করে থাকেন। মাঝে মাঝে গান্ধিপোকার মতো ‘পাদ’ দেন। তখন সব জ্বলেপুড়ে যায়। হা হা হা।
লাবুস খাওয়া বন্ধ করে ধনু শেখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার হাসি অবিকল শশাংক পালের হাসি। মানুষটা চলে গেছে, কিন্তু তার হাসি রেখে গেছে।
ধনু শেখ বললেন, হিন্দু মারতে হবে এটা মাথার মধ্যে রাখবা। হিন্দু না মারলে পাকিস্তান কায়েম হবে না। হিন্দু মারলে ইংরেজ সরকার তোমাকে কিছুই বলবে না। কী জন্যে কিছু বলবে না জানো?
জানি না।
ইংরেজ চায় আমরা নিজেরা মারামারি করি। আমরা মারামারি করলে তারা থাকবে নিরাপদ। তখন ক্ষুদিরামরা তাদের মারবে না। এখন বুঝেছি যে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা আমার আছে? কী হলো, খাওয়া শেষ?
জি জনাব খাওয়া শেষ।
লাবুস হাত না ধুয়েই উঠানে নেমে গেল। ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টিতেই হাত ধোয়া হয়ে যাবে। লাবুস ভিজতে ভিজতে হরিচরণের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। পাকা পুলের কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। খালে পানি বেড়েছে, শো শো শব্দ হচ্ছে। শুনতে ভালো লাগছে। শব্দের মধ্যেও ভালো মন্দ আছে। কিছু শব্দ শুনতে ভালো লাগে, কিছু শব্দ শুনতে খারাপ লাগে। এর কারণ কী? আল্লাহপাক মানুষকে যেমন ভালো এবং মন্দতে ভাগ করছেন— জগতের সবকিছুকেই তাই করেছেন? এ তাঁর কেমন লীলা?
বৈশাখের শুরু
বৈশাখের শুরু। ভোরের আলো ভালোমতো ফোটে নি। আকাশ মেঘলা বলে চারদিক অন্ধকার হয়ে আছে। আকাশের মেঘ কিছুটা মনে হয় নিচেও নেমে এসেছে। জায়গায় জায়গায় গাঢ় কুয়াশা। বৈশাখ মাসের সকালে কুয়াশা পড়ে না। আজ পড়েছে।
হরিচরণের কবর এবং তার চারপাশ কুয়াশার মধ্যে পড়েছে। দূর থেকে আবছাভাবে বাঁধানো কবর এবং কবরের পাশের আমগাছটা চোখে পড়ছে। মনে হচ্ছে কেউ একজন কবরের ওপর মস্ত ছাতা মেলে ধরে আছে।
কবরের ঠিক মাথার কাছে আমগাছ কেউ লাগায় নি। আপনাআপনি হয়েছে। এবং অতি দ্রুত বিশাল বৃক্ষের রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর এই গাছে মুকুল আসে না। দু’বছর পর পর আসে। এই বছর ঝাঁকিয়ে মুকুল এসেছে। গাছের ডালভর্তি সুতা। সবার ধারণা কোনো কিছুর জন্যে আমগাছে সুতা বেঁধে প্রার্থনা করলে তা মিলে। মেয়েদের ক্ষেত্রে নিজের মাথার চুল বঁধতে হয়।
আমগাছের কাণ্ডে হাত রেখে যে যুবকটি দাঁড়িয়ে আছে তার নাম শিবশংকর। কোলকাতায় জাপানিরা বোমা ফেলবে এমন এক গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর শিবশংকরের বাবা মনিশংকর ছেলেকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আতঙ্কে বাস করার কোনো মানে হয় না। শিবশংকরকে নিয়ে এমনিতেই তিনি আতঙ্কে থাকেন। তার স্বাস্থ্য মোটেই ভালো যাচ্ছে না। অসুখবিসুখ লেগেই থাকছে। শিব শংকরের সঙ্গে তিনি গোপীনাথ বল্লভ নামের একজনকে পাঠিয়েছেন। গোপীনাথ হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। যোগ ব্যায়াম ভালো জানেন। যোগ ব্যায়ামের ওপর তার একটা বই আছে। বইয়ের নাম- ‘যোগ ব্যায়াম, নিরোগ শরীর’।
গোপীনাথ বল্লাভের দায়িত্ব শিবশংকরের স্বাস্থ্যু ঠিক করে দেয়া। এই কাজটা তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছেন। তাঁর নির্দেশেই সূর্য ওঠার আগে শিবশংকরকে উঠতে হয়। খালিপায়ে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর একঘণ্টা হাঁটতে হয়। হাঁটার পর পাঁচ মিনিট বজাসন এবং পাঁচ মিনিট শিবাসন করতে হয়। আসনের পর ভারপেট পানি খেয়ে গলায় আঙুল দিয়ে সেই পানি বমি করে উগরে ফেলতে হয়। এই পদ্ধতির নাম পাকস্থলী ধৌতকরণ।
