ইমাম সাহেব বাড়ি ফিরেন নাই?
শরিফা ক্ষীণ গলায় বলল, না।
পুরুষকণ্ঠ বলল, মা! আমার নাম লাবুস। ইমাম সাহেবের কিছু জিনিস আমার কাছে। যদি অনুমতি দেন উঠানে রেখে যাই।
যে পুরুষ মা’ সম্বোধন করেছে তাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়া যায়। শরিফা ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। দরজার আড়াল থেকে বলল, রেখে যান।
লাবুস উঠানে ঢুকল। যুবা পুরুষের গায়ে চাঁদের আলো পড়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ভিনদেশের কোনো রাজপুত্ৰ পথ ভুলে চলে এসেছে। শরিফার মনে হলো, এমন রূপবান পুরুষ সে তার জীবনে দেখে নি। আর এই যুবা পুরুষটার কী অদ্ভুত নাম— লাবুস।
শরিফা আর কথা বলবে না ঠিক করে রাখার পর বলল, আপনি হিন্দু না মুসলমান?
আমি মুসলমান। মা, আসসালামু আলায়কুম।
শরিফা বিব্রত গলায় বলল, ওয়ালাইকুম সালাম।
লাবুস বলল, মা, আমি সারাদিন খাই নাই। খুবই ক্ষুধার্তা। ঘরে কিছু কি আছে? চিড়া, মুড়ি, একটা কিছু হলেই হবে।
আপনি দাওয়ায় জলচৌকিতে বসেন। খাওয়া আনতেছি। কলসিতে পানি আছে। হাত-মুখ ধোন।
লাবুস বলল, আপনাকে মা ডেকেছি- আমাকে তুমি করে বলবেন।
শরিফা অতি দ্রুত খাওয়ার ব্যবস্থা করল। গরম ভাত। খলিসা মাছের ঝোল, পাট শাক, ডাল।
বারান্দায় পাটি পেতে খাওয়ার নিখুঁত আয়োজন। পাতে লবণ দেয়া, কাগজি লেবুর টুকরা, কাঁচামরিচ, একটা বাটিতে পাতে খাওয়ার ঘি।
শরিফা দরজার আড়াল থেকে ক্ষীণ গলায় বলল, আয়োজন কিছুই নাই, আমি শরমিন্দা। তোমারে দাওয়াত দিলাম। একদিন আসবা। পোলাও করব, মুরগির কোরমা করব।
লাবুস মাথা কাত করে বলল, জি আচ্ছা।
খাওয়া শেষ করে লাবুস উঠানে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহপাক, আমাকে আমার নতুন মা যে যত্নের সঙ্গে খানা দিয়েছেন, তাকে সারাজীবন যেন কেউ না কেউ এরকম যত্ন করে খাওয়ায়।
অদ্ভুত এই দোয়ার কথা শুনে শরিফার চোখে পানি এসে গেল।
আহারে বেচারা, ঘরে কিছুই ছিল না, তারপরেও কত তৃপ্তি করে খেয়েছে। কী সুন্দর করে দোয়াটা করেছে! প্রিয়জন কেউ কি এর নাই? সে কি পথে পথে না খেয়ে ঘুরে?
তোমার পরিচয় কী?
আমার কোনো পরিচয় নাই।
পরিচয় থাকবে না। এটা কেমন কথা! আমারে মা ডেকেছ, খুশি হয়েছি। তোমার আসল মা কে?
আমার কোনো মা নাই। এখন আমারে বিদায় দেন, আমি যাই।
কলাপাতায় শরীর ঢেকে ইমাম করিম কাদায় পানিতে মাখামাখি হয়ে গভীর রাতে ফিরলেন। তার চোখ রক্তবর্ণ। শরীর কাঁপছে। হতভম্ব শরিফা বলল, আপনার কী হয়েছে?
করিম বিড়বিড় করে বললেন, আগে গোসলের পানি দেও। গামছা দেও। জিনের হাতে পড়েছিলাম। জীবনসংশয় হয়েছিল। অনেক কষ্টে জানে বাঁচছি।
কন কী আপনি?
করিম বলল, তুমি কি ভাবিছ মিথ্যা বলতেছি? যা বলতেছি সবই সত্য। জিনের নাম খোররম। সে থাকে কোহাকাফ নগরে। এশার নামাজের পর বাড়ি ফিরতেছি, সে আমার পিছু নিছে। কখনো থাকে পিছে, কখনো চইলা আসে সামনে। তার হাত থেকে বীচার জন্যে সূরায়ে জিন পাঠ শুরু করলাম— এইখানে হইল সমস্যা।
কী সমস্যা?
ভয়ের কারণে মাঝখানে আমার দোয়া বিস্মরণ হলো। ‘ওয়া আন্না জানান না আললান তাকুলাল ইনসু পর্যন্ত পড়েছি, তারপর আর কিছু মনে আসে না। মাথা গেল আউলায়া, তখন জিন আইসা আমারে চাইপা ধরল। টান দিয়া নিয়া গোল জঙ্গলায়। পাছড়াপাছড়ি কামড়াকামড়ি।
কী সৰ্ব্বনাশ!
একসময় জ্ঞান হারাইলাম। যখন জ্ঞান ফিরাল দেখি ন্যাংটা হইয়া কাদার মধ্যে শোয়া। জানে যে বাঁচিছি। এইজন্য আল্লাহপাকের দরবারে শুকরিয়া।
ভয়ঙ্কর এই কথা শোনার পর শরিফা লাবুসের কথা চেপে গেল। সে যে ইমাম সাহেবের পাঞ্জাবি-লুঙ্গি দিয়ে গেছে, এটাও তো একটা রহস্য। আচ্ছা! এমন কি হতে পারে— লাবুস নামে যে এসেছে, সে-ই জিন খোররম? মানুষের বেশ ধরে এসেছে। তাকে মা বলে ডেকেছে। খাওয়া-দাওয়া করেছে। অনেক রাত পর্যন্ত শরিফা জেগে রইল। একসময় সে পুরোপুরি নিশ্চিত হলো, জিন খোররমের সঙ্গেই তার দেখা হয়েছে। মানুষ এত সুন্দর হয় না। মানুষ এত গরমে চাদর গায়ে রাখে না। শরিফার গা কাটা দিয়ে উঠল। পাশেই তার স্বামী অঘোরে ঘুমাচ্ছে। শরিফার ইচ্ছা করছে স্বামীকে ডেকে তুলে জিন খোররমের সাথে তার দেখা হওয়ার গল্পটা করে।
লাবুস ভালো ঝামেলায় আছে। অনাহারের ঝামেলা। এত বেলা হয়েছে, এখনো খাবারের কোনো ব্যবস্থা হয় নি। দুপুরে মাওলানা ইদরিসের বাড়ির কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এলো। ওই বাড়িতে তার মা জুলেখা থাকে। মায়ের সঙ্গে দেখা করার তার কোনো ইচ্ছা নেই।
সে রওনা হলো জংলার কালীবাড়ির দিকে। দেবীকে ভোগ হিসেবে কেউ কেউ হঠাৎ একটা দুটা পয়সা ছুঁড়ে দেয়। একবার এখান থেকেই একটা এক আনি পেয়েছিল।
কালীবাড়িতে কোনো পয়সা-কড়ি পাওয়া গেল না। কেউ একজন কলাপাতায় ক্ষীর দিয়ে গেছে। দুনিয়ার পিপড়া ক্ষীরের ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পিপড়ার খাওয়া দেখে সে জঙ্গলে ঢুকল। জঙ্গলে বুবি গাছে (লটকন) পাকা বুবি আছে। যত ইচ্ছা খাওয়া যায়। সমস্যা একটাই, বুবি খেলে ক্ষুধা যায় না, বরং আরো বাড়ে। সে জঙ্গলে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। জংলি কিছু কলাগাছ আছে। আঙুলের মতো ছোট ছোট কলা ধরেছে। এই কলা সে আগেও খেয়ে দেখেছে— তিতা এবং ভয়ঙ্কর কষটা। জোর করে খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে প্রবল বমিভাব হয়।
জঙ্গলের মাঝখানে জলা জায়গায় হুটপুট শব্দ হচ্ছে। লাবুস সেদিকে এগিয়ে গেল। কেউ বরিশি পুঁতে রেখেছে, সেখানে মাছ ধরা পড়েছে। প্রায় দুই হাত লম্বা এক বোয়াল। বর্শি ছেড়ার প্রাণান্ত চেষ্টায় সে ক্লান্ত। লাবুস বোয়ালটা ডাঙ্গায় তুলল। আগুনে পুড়িয়ে খেলে ভালো হবার কথা। আগুন জ্বালাবার কোনো সরঞ্জাম তার কাছে নেই। মাছটা কাঁচা খাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। যদিও তার মনে হচ্ছে, সে চোখ বন্ধ করে কীচা খেতেও পারবে। জংলি, মানুষরা তো একসময় কাঁচা মাছ খেত। তাদের সমস্যা না হলে তার হবে কেন?
