জুলেখা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি আমার ভালো বুদ্ধি। মানুষ আমার রূপটা শুধু দেখে, বুদ্ধি দেখে না। আপনি দেখেছেন, আমার ভালো লাগল।
ইদরিস বললেন, আরেকটা পান খাব।
জুলেখা বলল, পান দিতেছি। তার আগে একটা কথা বলি, মন দিয়া শুনেন। শশাংক পাল আপনারে একটা গোপন কথা বলেছে, আপনি যেটা আমারে বলেন নাই। আমার একটা গোপন কথা আছে, সেটা আপনারে এখন বলব।
বলো।
আমার মেয়েটার জন্মের পর আমি আপনারে ছেড়ে চলে যাব।
মাওলানা অবাক হয়ে বললেন, কেন?
জুলেখা স্বাভাবিক গলায় বলল, আমার কারণে আপনি বিরাট বিপদে পড়েছেন। সমাজে পতিত হয়েছেন। নামাজ কালাম ছেড়েছেন। মাথা খারাপের দিকে যাইতেছেন। আমি আপনারে মুক্তি দিব।
মেয়েটাকে কি নিয়ে যাবে?
না। তাকে আপনার কাছে দিয়া যাব। আপনি মেয়েটারে ভালো মানুষ হওয়া শিখাইবেন। আমি চাই আমার মেয়ে আপনার মতো ভালো মানুষ হোক।
জুলেখার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। গাল ভেজা। ভেজা গালে চাঁদের আলো চকচক করছে। মাওলানা বিস্মিত হয়ে বললেন, কাঁদতেছ কেন?
জুলেখা সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুছে বলল, আর কাঁদব না। বলেই সে ফিক করে হাসল। মাওলানা মুগ্ধ হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর স্ত্রী যে পৃথিবীর অতি রূপবতীদের একজন এটা তার মনেই থাকে না। হঠাৎ হঠাৎ বুঝতে পারেন। তখন তাঁর বড় বিস্ময় লাগে। পবিত্র কোরান শরিফে বেহেশতের আয়তচক্ষু হুরদের বর্ণনা আছে। তারা কি জুলেখা নামের এই মেয়ের চেয়েও সুন্দর? আল্লাহপাক যখন বলেছেন তখন অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্য কী রকম? কাকে আমরা সৌন্দর্য বলি? ফুল সুন্দর লাগে কেন? পাতাকে ফুলের মতো সুন্দর লাগে না, অথচ ফুলকে লাগে। ফুলের গন্ধ আছে। এইজন্যে কি? গন্ধ ছাড়াও তো ফুল আছে। সেই ফুলও তো সুন্দর।
জুলেখা বলল, কী চিন্তা করেন?
মাওলানা জবাব না দিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশে পূৰ্ণচন্দ্র। সেই চন্দ্ৰও সুন্দর লাগছে। সুন্দর তাহলে কী?
জুলেখা বলল, গান শুনবেন?
মাওলানা বললেন, না। গানবাজনা নিষেধ আছে।
নিষেধ থাকলেও শুনেন। আপনারে গান শুনাইতে ইচ্ছা করতেছে। বেহেশতে হুরদের গান শুনবেন। দুনিয়াতে আমি শুনাব। তখন তুলনা করবেন।
জুলেখা, গান শুনব না।
আপনে চন্দ্ৰ দেখতেছেন। আমি চন্দ্ৰ নিয়া গান করব।
বলেই জুলেখা গান শুরু করল।
ও আমার চন্দ্ৰসখারে
তোর কারণে হইলাম দিওয়ানা
ও আমার চন্দ্ৰসখারে
মিছামিছি হইছি দিওয়ানা।
আকাশের চাঁদের দিকে আরো একজন তাকিয়ে আছে। তার নাম লাবুস। সে বসে আছে লঞ্চঘাটায়। মাঝরাতে ভেঁপু বাজিয়ে লক্ষ্মী নেভিগেশন কোম্পানির শেষ লঞ্চ গোয়ালন্দ থেকে আসে। দূরের লঞ্চটাকে মনে হয় ঝাড়বাতি। ঝাড়বাতিটা আস্তে আস্তে লঞ্চের আকৃতি নেয়। দেখতে ভালো লাগে।
আজকের দিনটা লাবুসের ভালো কেটেছে। দুপুরে খাওয়া না হলেও সন্ধ্যায় ভারপেট খেয়েছে। খাওয়ার আয়োজন শশাংক পালের বাড়িতে। শ্মশানযাত্রীদের জন্যে খিচুড়ির আয়োজন ছিল। খিচুড়ি খেতে কেউ আসে নি।
লাবুস কলাপাতা নিয়ে বসেছে। বাবুর্চি কলাপাতায় খিচুড়ি ঢালতে ঢালতে বলল, শ্মশানযাত্রীর খাওয়া খায় মুসলমানে! এর নাম কলিকাল।
লাবুস বলল, অভাবের কোনো হিন্দু মুসলমান নাই।
বাবুর্চি বলল, কথা কইস না। মুখ বন্ধ কইরা খা। যত পারস খা। পাঁচ সের চাউলের খিচুড়ি। সব নষ্ট।
লাবুস মুখ বন্ধ করেই খেয়ে গেল। তিন-চারদিনের খাবার একসঙ্গে খেয়ে ফেলার ব্যবস্থা নেই। ব্যবস্থা থাকলে সে খেত। তাহলে আগামী কয়েকদিন তাকে আর খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। মানুষ হবার প্রধান সমস্যা, সে জরুরি কোনো জিনিসই জমা করে রাখতে পারে না। দিনের খাবার দিনে খেতে হয়। দিনের ঘুম দিনে ঘুমাতে হয়। খাওয়া এবং ঘুম কোনোটিই জমা রাখা যায় না।
লঞ্চ ভোঁ দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁকের ভেতর থেকে তাকে দেখা যাবে। আজ আকাশে থালার মতো চাদ। চাঁদের আলো এবং লঞ্চের আলো মিলেমিশে কী সুন্দর দৃশ্যই না হবে! সুন্দর দৃশ্য দেখার আকুলতা লারুসকে ব্যাকুল করল।
তার মতো আরো একজন ব্যাকুল হলেন। তিনি বহুদূর দেশ আমেরিকায় বাস করেন। তাকে বলা হয় ‘জঙ্গলের কবি’। নাম রবার্ট ফ্রষ্ট। তিনি জঙ্গলের আলোছায়ায় হেঁটে বেড়ান। এবং প্রায়ই বলেন, অদ্ভুত সুন্দর এই পৃথিবীর সঙ্গে তার প্রেমিকের কলহের মতো কলহ।
I had a lower’s quarrel with the World.
And were an epitaph to be my story
I’d have a short One ready for my own.
I would have written of me on my Stone;
I had a lower’s quarrel with the world.
বান্ধবপুর বাজার
বান্ধবপুর বাজারে এককড়ি সাহার চালের আড়ত। তিনি সামান্য পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলেন। যুদ্ধের কারণে এখন রমরমা অবস্থা। ধান-চালের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। আরো বাড়বে— এরকম গুজব বাতাসে ভাসছে। সব চাল না-কি মিলিটারিরা কিনে নিবে। পাউরুটি খেয়ে যুদ্ধ করা যায় না। ভাত খেয়েও যুদ্ধ হয় না। ভাতে ঘুম পায়। তারপরেও মিলিটারিদের জন্যে রাতে ভাতের ব্যবস্থা। রাতে ভাত খেয়ে তারা আরামে ঘুমায়। দিনে যুদ্ধ শুরু হয়। দেশের চাল সব সরকার কিনছে। এদিকে আবার বাৰ্মা মুলুক থেকে চাল আসা বন্ধ। জাপানিরা বাৰ্মা দিয়ে ভারতবর্ষে ঢুকবে। নাক-চ্যাপটা মগগুলিকে শায়েস্তা করবে। এটা একটা আশার কথা।
