মুসুল্লিদের আজ যে হাদিসটা বলব। এই হাদিস আমরা পেয়েছি। ইয়াজিদের কন্যা বিবি আসমার কাছ থেকে। তিনি বলছেন, একদিন নবিজি (সাল্লালালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম) এর সামনে খাবার আনা হয়েছে। তিনি সেই খাবার আমার এবং আমার সঙ্গে উপস্থিত কিছু মহিলার সামনে রেখে বললেন, খাও। আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম ক্ষুধার্ত, তারপরেও ভদ্রতা করে বললাম, আমাদের ক্ষুধা নাই। তখন নবিজি বললেন, ‘হে মহিলাবৃন্দা! ক্ষুধার সঙ্গে মিথ্যা মিশিও না।’
এখন মুসল্লিগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যা চিন্তা করেন। ব্যাখ্যা হলো, ভদ্রতার কারণে মিথ্যা বলা যাবে না। যেই মিথ্যায় ক্ষতি নাই সেই মিথ্যাও বলা যাবে না। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা বলা যাবে না। সবাই বলেন— আলহামদুলিল্লাহ।
সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলল। মাওলানা দোয়া শুরু করলেন। কোথাও ভুল নেই। কোনো ভ্ৰান্তি নেই। শুধু এক জায়গাতেই সমস্যা। মাওলানার ধারণা ঘরে তার স্ত্রী আছে। অতি রূপবতী স্ত্রী।
বাড়িতে ঢোকার আগে উঠানে দাঁড়িয়েই তিনি কয়েকবার গলা খাকারি দেন। যেন তার স্ত্রী গায়ের কাপড় বেশামাল থাকলে ঠিকঠাক করে নিতে পারেন। স্ত্রীকে স্বামীর সামনেও আব্রু রক্ষা করার বিধান।
বাড়িতে ঢুকে পাগড়ি খুলতে খুলতে মাওলানা বলেন, বউ, রান্না কিছু হয়েছে?
তাঁর প্রশ্নের কেউ জবাব দেয় না। কিন্তু মাওলানা জবাব শুনতে পান এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন, থাক থাক, জ্বর গায়ে নিয়ে এখন রান্না করতে বসতে হবে না। সামান্য চাল-ডাল আমি নিজেই ফুটিয়ে নিতে পারব। তুমি বরং কিছুক্ষণ শুয়ে থাক। গোসল করবে? পানি এনে দেব? তাহলে থাক গোসলের দরকার নাই। জ্বর সারুক। বউ, আমার কিন্তু ধারণা তোমার ম্যালেরিয়া হয়েছে। প্রতিদিন একই সময় জ্বর, এইটা ম্যালেরিয়া ছাড়া আর কিছু না। আমাকে মনে করিয়ে দিও, সতীশ কবিরাজের কাছ থেকে মিকচার এনে দিব। পাঁচ দাগ মিকচার খেলেই জ্বর শেষ। খেতে তিতা। নিষিন্দার রসের চেয়েও তিতা। কিন্তু ম্যালেরিয়ার যম।
মাওলানা বারান্দায় রান্না করতে বসেন। চোঙা দিয়ে চুলায় ফুঁ দিতে দিতে পরিষ্কার শুনতে পান উঠান ঝাট দেয়া হচ্ছে। পাতা জমানো হচ্ছে। মাওলানা দুঃখিত গলায় বললন, বউ, তুমি দেখি আমার কোনো কথাই শুন না। শরীরে জ্বর নিয়া উঠান ঝাঁট দিতে শুরু করলা। কয়েকটা শুকনা পাতা পইড়া আছে, এতে হইছে কী? বন কর।
ঝাড় দেয়ার শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। মাওলানা বড়ই আনন্দ পান।
হাটের দিনে মাওলানাকে তাঁর অদৃশ্য স্ত্রীর জন্যে টুকটাক অনেক কিছু কিনতে দেখা যায়। সস্তার জিনিস- কাঁচের চুড়ি, ফিতা, কাঠের কােকই। দোকানিরা এই সময় তাঁর সঙ্গে নানান রহস্য করে। তিনি সেই রহস্যের কিছুই বোঝেন না। তাদের কথার জবাব দিয়ে যান। স্ত্রী প্রসঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগে।
মাওলানা সাব, কাচের চুড়ি যে কিনতেছেন ভাবি সাবের হাতের মাপ দরকার না?
এই মাপেই চলবে। মাপ আমি জানি।
সবুজ চুড়ি কিনলেন, ভাবি সাবের গায়ের রঙ কী? গায়ের রঙ শাদা না হইলে চুড়ি ফুটব না।
গাত্ৰবৰ্ণ অতি পরিষ্কার।
মাশাল্লাহ।
নতুন এক সাবান বাইর হইছে কোম্পানির, জলে ভাসা সাবান। পুসকুনিতে ছাইড়া দিবেন। পানিতে ভাসতে থাকব। ভাবি সাবের জন্যে সাবান একটা দিব?
না। সে পুকুরে স্নান করে না।
পুকুরে স্নান করতে সমস্যা কী?
সমস্যা আছে। পর্দার সমস্যা। চাইর দিক খোলা।
সেইটাও তো একটা কথা।
মাওলানাকে নিয়ে নানান আমোদ হয়। বান্ধবপুরের লোকজন আমোদ করে। পরিচিতজনরা করে। অপরিচিতজনারাও করে। সবচে’ বেশি আমোদ করেন। ধনু শেখ। আজকাল তাঁর সময়ের খুব অভাব। নানান মিটিং করতে হয়। সভা সমিতিতে যেতে হয়। ময়মনসিংহ শহরে নিজের থাকার জন্যে তিনি বাড়ি বানিয়েছেন। বাড়ির নাম ‘খান ভিলা’। বান্ধবপুরে মাসে এক দুই বারের বেশি। আসতে পারেন না। যখনই আসেন মাওলানাকে ডেকে পাঠান। ধনু শেখের সময়টা ভালো কাটে।
মাওলানা, তোমার স্ত্রী আছে কেমন?
জি জনাব ভালো। শুকুর। আলহামদুলিল্লাহ।
গতবারে তোমার কাছে শুনেছিলাম। উনার ম্যালেরিয়া হয়েছে।
জি। সতীশ কবিরাজের কাছ থেকে এনে ওষুধ খাইয়েছি। এতে আরাম হয়েছে।
এখন আর জ্বর আসে না?
জি-না। আল্লাপাকের মেহেরবানি।
এখন পর্যন্ত কেউ উনারে চউক্ষে দেখল না, এইটা কেমন কথা?
পর্দা-পুসিদার মধ্যে থাকে।
স্ত্রীলোকের সামনেও কি পর্দা করে?
জি।
ভালো তো। খুবই ভালো। তা তোমাদের সন্তানাদি কিছু হবে? আছে কোনো খবর?
এখনো খবর নাই।
খবর হইলে আগেভাগে বলবা। নয়তো একদিন হঠাৎ শুনব তোমার সন্তান হয়েছে, তারেও কেউ চোখে দেখে না।
খবর হইলে আপনারে জানাব।
তোমার স্ত্রীর নাম তো জুলেখা। নাম ঠিক বলেছি না?
জি।
সে রঙিলা নটিবাড়ির জুলেখা না তো?
জি-না। তওবা। আপনি কী বলেন!
না হইলেই ভালো। মাওলানা হইয়া নটি বিবাহ করলে লোকজন তোমার পেছনে দাঁড়ায়া নামাজ পড়বে না। ঠিক না?
জি ঠিক।
রঙিলাবাড়ির জুলেখার খবর কিছু রাখ? শুনেছি সে নাকি কলিকাতায় থাকে। তাঁর গানের থাল বাইর হইছে। দুইটাকা কইরা থালের দাম।
আমি কিছু জানি না।
না জানাই ভালো। তুমি স্ত্রীকে নিয়া আছ ভালোই আছ। ভালো কথা, তোমার কি স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ হয়?
হয় না।
দুইজন মানুষ একসাথে বাস করতেছ, কিছু ঝগড়া তো হওয়ার কথা। ধমক ধামাক কোনোদিনও দেও নাই?
একবার দিয়েছিলাম, শুরু করুল কান্দন। কান্দন দেইখা মন খারাপ হয়েছিল বিধায় ঠিক করেছি। আর ধমক ধামক না।
