আপনি অল্পবয়সে সুন্নতি দাড়ি রেখেছেন দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু ভাই সাহেব, দাড়ির সঙ্গে গোঁফ রাখা ঠিক না। আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হেস সালাম গোঁফ রাখতেন না। দাড়িগোঁফ একসঙ্গে রাখা সুন্নতের বরখেলাফ। কোনো খাদ্যদ্রব্যের সাথে যদি গোঁফের স্পর্শ হয় সেই খাদ্যদ্রব্য নাপাক হয়ে যায়।
আগুন্তুক বলল, আমার মায়ের কারণে গোঁফ রাখতে হয়েছে। মা বলেন গোঁফ ছাড়া দাড়িতে আমাকে না-কি খুবই খারাপ দেখায়।
তাহলে ঠিক আছে। মায়ের মনে কষ্ট দেয়া কোনোক্রমেই ঠিক না। নবিজির হাদিস আছে- ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ আপনার কি অজু আছে? না-কি অজু করবেন?
অজু করব।
আসেন অজু করেন। আমি কল চাপব। এই কল নতুন বসানো হয়েছে। অতি সুমিষ্ট পানি। এক চুমুক খেলে দিল ঠাণ্ড হয়।
মাওলানা তাকিয়ে আছেন। আগন্তুক অজু ঠিকমতো করতে পারছে কি-না এটাই তাঁর দেখার বিষয়। বেশিরভাগ মানুষ অজু ঠিকমতো করতে পারে না। হাতে ধরে অজু শেখাতে হয়। অজুর দোয়া শেখাতে হয়।
আপনি কি অজুর নিয়ত জানেন?
আরবিতে জানি না। নিয়ত বাংলায় পড়ি।
বাংলায় পড়লেও হবে। সোয়াব সামান্য কম হবে। আমি আপনাকে আরবি নিয়ত শিখায়া দিব।
আগুন্তুক বললেন, শুকরিয়া।
আগন্তুক সুষ্ঠুমতে অজু করল। মাওলানা আনন্দ পেলেন।
মোহাম্মদ মফিজ শশী মাস্টারের বাড়ি দেখে বলল, বাহ্।
শশী বলল, বাহ মানে কী? আনন্দের বাহ না অবজ্ঞার বাহ?
মফিজ বলল, বিস্ময়ের বাহ। তোর বাড়িঘর দেখে মনে হচ্ছে ইংরেজ থাকুক। ইংরেজের মতো। আমরা এইখানে জীবন পার করে দেই। মৎস্য মারিব খাইব সুখে।
শশী মাস্টার বলল, এক্কেবারে আমার মনের কথা।
মফিজ বলল, এটা কি তোর মাছ মারার জায়গা?
হুঁ। সুন্দর কি না বল?
‘বাহ্’। টাইপ সুন্দর।
মাছ ধরার জায়গাটা বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া। হিজল গাছের বড় দুটা ডাল মাধাইখালের উপর দিয়ে কিছুদূর যাবার পর উপরের দিকে উঠেছে। ডাল দুটার উপর পাটাতন বিছিয়ে মাছ ধরার জায়গা করা হয়েছে। রোদ যেন মাথায় না। লাগে সেই ব্যবস্থাও আছে।
শশী মাস্টার বলল, নিজের হাতে মাছ ধরি, রান্না করি।
মফিজ বলল, কাজকর্ম না থাকলে তুই না-কি চরের বালি মেখে শুয়ে থাকিস?
হুঁ। বালু চিকিৎসা।
এতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। আমাদের উচিত লো প্রোফাইলে থাকা, দৃষ্টি আকর্ষণ করা না।
শশী মাস্টার বলল, আমি একমত হলাম না। হাই প্রোফাইলের মানুষ সবসময় চোখের সামনে থাকে বলে তাদের নিয়ে মাথা ঘামায় না। কৌতূহল তৈরি হয় লো প্রোফাইলের মানুষের দিকে।
মফিজ বলল, বিনোদের ফাঁসি হয়েছে, খবর পেয়েছিস?
হুঁ।
ফাঁসির সময় হঠাৎ না-কি খুব ভড়কে গিয়েছিল। চিৎকার চেচামেচি শুরু করেছিল। কিছুতেই ফাঁসিতে ঝুলিবে না। টেনে হিঁচড়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।
শশী মাস্টার বলল, গাধা।
গাধা তো বটেই। এতে অন্য বিপ্লবীদের মন দুর্বল হয়। ভালো কথা, আমার থাকার জায়গা কি তোর এখানে?
না। আমি সাত্ত্বিক ব্ৰাহ্মণ। তোর মতো যবনকে নিজের বাড়িতে স্থান করে দেব কেন! তুই থাকিবি ঋষি হরির বাড়িতে।
ঋষি হরিটা কে?
যার স্কুলের আমি শিক্ষক তাঁর নাম হরিচরণ। লোকে তাঁকে অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন সাধুপুরুষ হিসেবে জানে। যদিও তিনি জাতিচ্যুত। ধর্মচুত। ভালো কথা, তুই থাকিবি কতদিন?
জানি না কতদিন। তবে তোকে চলে যেতে হবে। তোর ডাক এসেছে। নতুন মিশন।
কবে যেতে হবে?
শিগগিরই যেতে হবে। তুই যাবি চট্টগ্রামে। মাস্টারদার সঙ্গে যোগ দিবি।
গুড। গেটআপ ভালো নিয়েছিস। দেখেই মনে হচ্ছে, অতি ধর্মপ্ৰাণ মাওলানা। নামাজের নিয়মকানুন জানিস?
অবশ্যই।
শশী মাস্টারের বর্শিতে মাছ ধরা পড়েছে। সে বর্শি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাছের ঝাঁপাঝাপিতে মনে হচ্ছিল বিশাল কোনো মাছ। দেখা গেল বিশাল কিছু না, মাঝারি আকৃতির আড় মাছ।
শশী মাস্টার বলল, আমার মায়ের কোনো খবর রাখিস?
না। প্ৰাণ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
তোর বাবা মা’র খবর কী?
জানি না। তোর গানাবাজনা কি চলছে?
হুঁ।
তোর জন্যে দুটা রেকর্ড এনেছি। কানা কেস্টর কীর্তন। এখনই বের করে দেব, না পরে নিবি?
এখন দে। সেলিব্রেট করি।
সেলিব্রেশনটা কিসের?
দুই বন্ধুর মিলন।
কলের গানে গান বাজছে। দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে আছে।
তনু যৌবনে তপন তাটিনি
খেলে। কৃষ্ণ দ্বজ যায়…
যমুনায়, যমুনায়।…
শশী মাস্টার গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে বলল, ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে আমি প্রথম কাজ কী করব জানিস? বিবাহ করব।
অতি উচ্চশ্রেণীর কোনো চিন্তা বলে তো মনে হচ্ছে না।
এটা যে কত বড় উচ্চশ্রেণীর চিন্তা বিবাহের পর বুঝতে পারবি। পতিত কন্যা বিবাহ করব।
ডোম কন্যা? আছুৎ?
শশী মাস্টার জবাব না দিয়ে দ্বিতীয় রেকর্ডটি কলের গানে রাখল।
মোহাম্মদ মফিজের স্থান হলো হরিচরণের বাড়িতে।
শশী মাস্টার ব্যবস্থা করে দিলেন। শশী মাস্টার বললেন, মোহাম্মদ মফিজ আমার পরিচিত। জব্বলপুরের মানুষ। শহরের নোংরা আবহাওয়ায় শরীর খারাপ করেছে বলে কিছুদিন গ্রামে থাকবেন। আমি বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাব। আমার অনুপস্থিতিতে উনি ছাত্র পড়াবেন।
হরিচরণ বললেন, কোনো অসুবিধা নাই। যতদিন ইচ্ছা থাকবেন। আমার বাড়ি তো খালি পড়ে আছে।
অতিথিকে হরিচরণের পছন্দ হলো। নির্বিরোধী ভালো মানুষ। পড়াশোনায় খুবই আগ্ৰহ। বেশিরভাগ সময় বই নিয়ে আছেন। বই পড়ার স্থানও বিচিত্র। কখনো পুকুরঘাটে, কখনো শতরঞ্চি পেতে শিউলিতলায়, আবার কখনো বা বই হাতে হাঁটতে হাঁটতে পড়া। হরিচরণের সঙ্গে অতিথির কথাবার্তা হয় না বললেই চলে। মানুষটা স্বল্পবাক।
