হতভম্ব অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য বললেন, কী বললা?
ধনু শেখ বললেন, যা বলেছি। সত্য বলেছি। তবে আপনার চিন্তার কিছু নাই। কেউ জানবে না।
অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য বিড়বিড় করে বললেন, কেউ জানুক বা না-জানুক, জাত তো চলে গেছে।
ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, জাত চলে গেলেও চুপ করে থাকেন। আপনার কন্যা আছে। তার বিবাহ দিতে হবে না? ঠাকুর, যাই।
অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য ঘোর লাগা মানুষের গলায় বললেন, কোথায় যাও?
ধনু শেখ বললেন, আজ মঙ্গলবার। নটিবাড়িতে যাই। মঙ্গলবার রাতটা আমি নটিবাড়িতে কটাই। জানেন নিশ্চয়ই?
অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য কাদো কাদো গলায় বললেন, এইটা তুমি কী করলা?
ধনু শেখ হাই তুলতে তুলতে বললেন, আপনাদের এমন কিছু কি আছে যা খেলে মুসলমানের জাত যাবে? থাকলে দেন খাই। সমানে সমান হবে।
ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্যের সপরিবারে গো-মাংস ভক্ষণ কাহিনী তৃতীয় দিনের দিন প্রকাশিত হয়ে পড়ল। বিধান দেবার জন্যে শ্যামগঞ্জ থেকে ন্যায়রত্ন রামনিধি চলে এলেন। তিনি বললেন, গরু যদি অল্পবয়স্ক হয় তাহলে জাত যাবে না। প্ৰায়শ্চিত্ত করলেই হবে। কারণ পাৰ্বতীর পিতা, শিবের শ্বশুর মহারাজা দক্ষ যে যজ্ঞ করেছিলেন সেখানে গোবৎস বধ করা হয়েছে। ব্ৰাহ্মণরা গোবৎসের খেয়েছেন।
জানা গেল ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য যে মাংস খেয়েছেন তা বয়স্ক গরুর মাংস।
ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, এরও বিধান আছে। যে পরিমাণ গো-মাংস প্ৰত্যেকে খেয়েছে সেই পরিমাণ কাঁচা গোবর এক সপ্তাহ খাবে। তাতে শরীর শোধন হবে। শরীর শোধিত হবার পর গঙ্গায় একটা ড়ুব দিলে গো-মাংস ভক্ষণজনিত বিষ শরীর থেকে চলে যাবে।
ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য শরীর শোধনের প্রাথমিক পরীক্ষায় ফেল করলেন। এক চামচ গোবর মুখে দিয়ে বমি করতে করতে মৃতপ্রায় হলেন। সপরিবারে মুসলমান হবার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এক শুক্রবার জুমা নামাজের পর তিনি মাওলানা ইদরিসের কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিলেন। সবাই মুখে তিনবার বললেন—
লা ইলাহা ইল্লাললাহ।
আল্লাহ ছাড়া কোনো মারুদ নাই।
মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
মুহাম্মদ তাঁর রসুল।
মাওলানা ইদরিস প্রত্যকের ডান কানে তিনবার করে সূরা ইয়াসিন পাঠ করে ফুঁ দিয়ে দিলেন। ফু’র পরপরই ডান হাতে কান বন্ধ করতে হলো। সূরা ইয়াসিন দীর্ঘ সময় ক্যানের ভেতর থাকে।
হাজাম ধারালো বাঁশের কঞ্চি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ইসলাম ধর্মগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়া মাত্র সে দলের পুরুষদের খতনা শুরু করল। তাদের চোখের জল এবং চাপা গোঙানির ভেতর দিয়ে ইসলামধর্মে দাখেলের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হলো। অম্বিকা ভট্টাচার্যের নাম হলো— মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। সবাই ডাকা শুরু সিরাজ ঠাকুর। ঠাকুর থেকে মুসলমান হয়েছিল এই জন্যই নামের শেষে ঠাকুর।
এই ঘটনার বিস্তৃত ব্যাখ্যার একটা কারণ আছে। বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের মাতুল বংশের একটা শাখার পূর্বপুরুষ ঠাকুর অম্বিকা ভট্টাচার্য। বর্তমান পুরুষরা হিন্দুয়ানির সব ছেড়েছেন, ঠাকুর পদবি ছাড়েন নি। ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের এক নানার নাম আনিসুর রহমান ঠাকুর। তিনি কঠিন ধাৰ্মিক মানুষ ছিলেন। তাঁর রাত কাটতো এবাদত বন্দেগি করে।
জুলেখার বাড়িতে আজ নতুন অতিথি। অতিথিকে জুলেখার চেনা চেনা লাগছে। ঠিক চিনতে পারছে না। তবে এই মানুষটাকে সে যে দেখেছে। এই বিষয়ে সে নিশ্চিত।
অতিথি খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসেছেন। এই খাট জুলেখা নতুন কিনেছে। ময়ূর খাট। ময়ুরের কাজ করা। অতিথি বলল, তোমার সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছি। তোমার নাম কী গো?
জুলেখা বলল, পিতামাতা নাম রাখতে বিস্মরণ হয়েছেন। আপনে সুন্দর দেইখা নাম দেন।
অতিথি বলল, আমার সাথে মীমাংসায়’ (ধাধায়) কথা বলব না। আমি মীমাংসা পছন্দ করি না। তোমার নাম বলো, ধর্ম বলো।
জুলেখা বলল, আমার যেমন নাম নাই, ধৰ্মও নাই। আমার ঘরে যে আসে তার ধর্মই আমার ধর্ম।
নাম বলো। নাম না বললে উইঠ্যা চইলা যাব।
অতিথি উঠার ভঙ্গি করল। জুলেখা চুপ করে রইল। চলে যেতে চাইলে চলে যাবে। জুলেখা বাধা দিবে না। অতিথি বলল, তুমি সুন্দর ঠিক আছে, কিন্তু অতি বেয়াদব মেয়ে। সঙ্গে বন্দুক থাকলে গুল্লি করতাম। বেয়াদব মেয়ের একটাই শাস্তি— নাভি বরাবর গুল্লি।
জুলেখা এই কথায় অতিথিকে চিনল। ইনি এককালের জমিদার শশাংক পাল। হাতি নিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতেন। বাঘের সন্ধান করতেন। জুলেখা বলল, আপনের মাথা সামান্য গরম হয়েছে। শরবত খাবেন? শরবত খাইলে মাথা ঠাপ্ত হবে।
তুমি তোমার নাম বলো। নাম বললে মাথা ঠাণ্ডা হবে।
আমার এক নাম জুলেখা। আরেক নাম চান বিবি।
কোনটা আসল?
দুইটাই আসল।
মুসলমান?
হুঁ।
কালো ব্যাগটা খোল। বোতল আছে। গোলাসে কইরা বোতলের জিনিস দেও। আইজ এই জিনিস বেশি কইরা খাইতে হবে। মন অত্যধিক খারাপ।
মন খারাপ কী জন্যে?
আইজ অম্বিকা ভট্টাচাৰ্য দলেবলে মুসলমান হইছে, খবর পাও নাই?
জুলেখা বলল, তার গরু খাওনের ইচ্ছা হইছে সে মুসলমান হইছে। আপনের কী? আপনে ফুর্তি করতে আইছেন ফুর্তি করেন। গান শুনবেন?
গান জানো?
শিখতেছি।
শিখা শিখির গানের মধ্যে আমি নাই। সারাজীবন বড় বড় ওস্তাদের মাহফিলে গান শুনেছি। বড় বড় বাইজিদের নাচ গান শুনে সোনার মোহর দিয়েছি।
জুলেখা চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলল, এখন তো আপনের হাতে সোনার মোহর নাই। আমার গান ছাড়া গতি কী?
