মা, আপনার নাম?
আমার নামে আপনার প্রয়োজন নাই। যা করতে বললাম করেন। হাতে সময় নাই।
নামটা বলেন মা! কোনো একদিন খাস দিলে আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করব।
আমার জন্যে দোয়া করতে হবে না। আমার স্বামীর জন্যে প্রার্থনা করবেন। যেন সে ভালো হয়ে যায়। আমার স্বামীর নাম লক্ষণ দেওয়ান।
বৃদ্ধা মহিলা ঘরের ভেতর থেকে কাশতে কাশতে ডাকছে, ও বৌমা! ও বৌমা!
বৌটি কুপি নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। মাওলানা দৌড়াতে শুরু করলেন। অচেনা অজানা বৌটির কথা ভেবে চোখে পানি আসছে। এখন অশ্রুবর্ষণের সময়। মেয়েটার জন্যে আল্লাহপাকের দরবারে খাস দিলে প্রার্থনা করতে হবে। মেয়ের স্বামীর জন্যেও করতে হবে। স্বামীর নাম লক্ষণ দেওয়ান। আজকাল তার নাম মনে থাকে না। এই নাম কি মনে থাকবে? লক্ষণ দেওয়ান, লক্ষণ দেওয়ান, লক্ষণ দেওয়ান। বিপদ থেকে উদ্ধার পেলেই নফল রোজা রেখে এই কাজটা করবেন।
রাত দশটার মতো বাজে। শীতের রাত বলেই নিশুতি মনে হচ্ছে। বান্ধবপুর বাজারের সব ঘরের বাতি নেভানো। লঞ্চঘাটায় কিছু আলো আছে। লাবুস পাকা পুলের উপর বসে আছে। পুলের মাথায় প্রকাণ্ড জামরুল গাছ। গাছভর্তি জোনাকি পোকা একসঙ্গে জুলছে নিভছে। দেখতে সুন্দর লাগছে। একটি জোনাকি অন্য একটির সঙ্গে কথা কীভাবে বলে? আলোর সংকেতে? জোনাকি পোকাদের কথা বুঝতে পারলে কত কী জানা যেত।
গায়ে কালো কম্বল জড়িয়ে কে যেন এদিকেই আসছে। লাবুসকে দেখে সে জামরুল গাছের আড়ালে চলে গেল। লাবুস বলল, কে?
আমি করিম। ইমাম করিম।
গাছের পিছনে লুকায়ে আছেন কেন?
তোমাকে দেখে শরমিন্দা হয়েছি বিধায় লুকায়ে আছি।
শরমিন্দা হয়েছেন কেন?
আমি সবের কাছেই শরমিন্দা। যার স্ত্রী অন্যের দখলে সে তো শরমিন্দা হবে। এটা জগতের নিয়ম। স্ত্রী অন্যের সঙ্গে ঘুমায়, এই কষ্ট তুমি বুঝবা না। তুমি শাদি করা নাই।
জোর করে কেউ আপনার স্ত্রী দখল করে নাই।
তাও ঠিক। আমার কপাল মন্দ।
আপনি সামনে আসেন। একটা বিষয় নিয়া আলাপ করি।
করিম এগিয়ে এলেন। লাবুসের পাশে বসলেন।
লাবুস বলল, আপনার স্ত্রীকে আমি যে মা ডাকি এটা কি আপনি জানেন?
করিম বিস্মিত হয়ে বলল, না। তবে তার সঙ্গে তোমার যে দেখা হয়েছিল। এই বিষয়টা জানি।
লাবুস বলল, একজন পুরুষ যেমন তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে একজন স্ত্রী কি স্বামীকে তালাক দিতে পারে না? তাহলে আপনার স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিয়ে আপনার কাছে চলে আসতে পারেন।
স্ত্রীদের এই ক্ষমতা নাই। এই ক্ষমতা শুধু পুরুষের। স্ত্রী যদি তালাক চায় তাকে তার স্বামীকে টাকা পয়সা দিয়ে কিংবা হাতেপায়ে ধরে মানাতে হবে যেন স্বামী তালাক দেয়। এটা সহি হাদিস। বোখারি শরিফ।
এটা কি ভুল না?
আসমানি কানুনের ভুল ধরা ঠিক না।
লাবুস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। করিম বললেন, আমি তোমার মা’কে একটা পত্ৰ দিয়েছি। সেই পত্রে তাকে বলেছি। পালায়া চলে আসতে। সে যদি পালায়া আসে। তখন তারে নিয়া দূরদেশে চলে যাব। যেখানে কেউ তারে চিনে না। আমারেও চিনে না। আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বাস করব।
পত্র কি পাঠায়া দিয়েছেন?
হুঁ। ধনু শেখের মেয়ে আতরের হাতে দিয়েছি। সে বলেছে পত্র পৌঁছায়ে দিবে। একটাই সমস্যা— তোমার মা বাংলা পড়তে জানে না।
আতর পড়ে শুনাবে।
করিম চুপ করে রইল। লাবুস বলল, শুনেছি ইমামের চাকরি আপনার চলে গেছে। নতুন ইমাম আসবে। আপনার এখন চলে কীভাবে?
করিম জবাব দিল না।
লাবুস বলল, আজ কি আপনার খাওয়া হয়েছে?
করিম এই প্রশ্নেরও জবাব দিল না। উঠে দাঁড়িয়ে যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে দ্রুত চলে গেল।
করিম যাচ্ছে ধনু শেখের বাড়ির দিকে। খুব কাছে সে যাবে না। দূর থেকে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকবে। ধনু শেখের শোবার ঘরে আলো জ্বলছে। করিম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখ জ্বালা করছে।
শরিফা মাথা নিচু করে খাটে বসে আছে। ধনু শেখ বসেছেন তার সামনে। দু’জনের হাতেই গ্রাস। ধনু শেখ যতবার বলছেন ততবারই শরিফা গ্লাস ঠোঁটে লাগাচ্ছে। শরিফা এমনভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে যেন তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
ধনু শেখ আদুরে ভঙ্গিতে ডাকলেন, শরিফা রানি।
জি।
এখন থেকে তোমারে ডাকব রানি। স্বামী আদর করে রানি ডাকে, এটা অনেক বড় ব্যাপার। বুঝেছ?
বুঝেছি।
চুমুক দাও। গ্লাস হাতে নিয়া বইসা থাকবা না। এইটা একটা ঢং। ঢং করবা না। ঢং আমার পছন্দ না।
শরিফা গ্লাসে চুমুক দিল।
ধনু শেখ বললেন ,তোমার বিষয়ে আমার দিলখোশ হয়েছে। তোমারে নিয়া আমি কিছুদিনের জন্যে কলিকাতা যাব। ফুর্তির জায়গা দুনিয়াতে একটাই। কলিকাতা। বায়োস্কোপ দেখবা। বাইজি নাচ দেখবা। ঠিক আছে?
জি।
হাসিমুখে বলো ঠিক আছে। প্যাঁচার মতো মুখ কইরা কথা বলব না। তুমি প্যাচা না। এক অক্ষরের কথা বলাও বন্ধ করা। তুমি টিকটিকি না যে সবকিছুতে বলবা- টিক টিক। এখন হাসিমুখে বলবা, আমি বাইজি নাচ দেখব।
শরিফা হাসিমুখে বলার চেষ্টা করল, আমি বাইজি নোচ দেখব। বলতে পারল না। মুখ আরো বিকৃত হয়ে গেল। ধনু শেখ এতেই সন্তুষ্ট হলেন। নেশাগ্ৰস্ত হয়ে তাঁর এমনই অবস্থা যে হাসি এবং কান্নার তফাৎ তিনি ধরতে পারলেন না।
ধনু শেখের মুখ দিয়ে লালা পড়ছিল। তিনি মুখের লালা মুছতে মুছতে বললেন, কলিকাতায় তোমার জন্যে ড্যান্স মাস্টার রেখে দিব। ড্যান্স মাস্টার তোমারে নাচ শিখাবে। ঘুংগুর, পইরা তুমি নাচবা। ঝুমঝুম ঝুমঝুম ঝুমঝুমি। চুমুক দেও।
