আতর চোখ উজ্জ্বল করে বলল, কী দেখাতেন?
প্রমাণ করতাম যে, এক সমান দুই।
এক সমান দুই হবে কেমনে?
এখানেই তো মজা।
আতর বলল, আমি একটা কাঠি নিয়ে আসি, আপনি মাটিতে লিখে দেখান।
আতর কঞ্চি নিয়ে এসেছে। শিবশংকরের পাশে উবু হয়ে বসেছে। শিবশংকর উৎসাহ নিয়ে আঁকাআঁকি করছে। আতর দেখছে মুগ্ধচোখে।
মনে করা,
x = y এখন আমি উভয়পক্ষকে y দিয়ে গুণ করলাম। তাহলে কী হবে?
xy = y2
এখন আমি উভয়পক্ষ থেকে x2 বাদ দিলাম। তাহলে কী হবে?
xy – x2 = y2 – x2 এসো এখন উৎপাদকে বিশ্লেষণ করি। তাহলে কী হবে?
х (у-x) = (у-х) (у+x)
এখন উভয়পক্ষকে (y-x) দিয়ে ভাগ দেব।
х (у-х) / (y-x) = (у-х) (у+x) / (y-x)
কাটাকুটি করার পর কী থাকবে?
x = y+x
যেহেতু y এবং x সমান
X = x+x
x = 2x
এখন x দিয়ে ভাগ দিলে হবে।
1 =2
শিবশংকর আনন্দিত গলায় বলল, আতর, বুঝতে পেরেছ? এক সমান দুই যে প্রমাণ করলাম।
আতর বলল, না।
খুব সহজ অংক, তুমি বুঝতে পারলে না কেন?
বুঝতে না পারলে আমি কী করব?
তোমার তো বুদ্ধি কম।
আতর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আপনারও বুদ্ধি কম।
শিবশংকর বলল, কেন বলছি আমার বুদ্ধি কম?
আপনি কাঁচামরিচ খান না। এইজন্যে আপনার বুদ্ধি কম। যারা কাঁচামরিচ খায় না তাদের বুদ্ধি কম হয়।
কে বলেছে?
এটা সবাই জানে। আপনার বুদ্ধি কম। এইজন্যে আপনি জানেন না। আপনি প্রমাণ করেছেন এক সমান দুই। আমি প্রমাণ করব আপনার বুদ্ধি নাই। করব?
কর।
একটা পাখির নাম বলেন যার ঠ্যাং তিনটা। এরকম পাখি সত্যিই আছে?
আছে।
এ দেশের পাখি?
হুঁ।
আমি জানি না।
হুঁ।
আতর বলল, প্রমাণ হয়েছে না। আপনার বুদ্ধি কম?
পাখিটার নাম বলে।
আপনি অনুসন্ধান করে বের করেন।
আতর চলে যাচ্ছে। শিবশংকর মন খারাপ করে তাকিয়ে আছে। তার খুব ইচ্ছা করছে আতরকে বলে, তুমি যে পাখির কথা বলেছ সেই পাখি আসলে নাই। তারপরেও ধরে নিলাম। এরকম পাখি আছে। ধরে নিলাম আমি বোকা। তুমি চলে যেও না। আরো কিছুক্ষণ থাক। আমার সঙ্গে গল্প কর। আমি অনেক মজার মজার জিনিস জানি। সব তোমাকে বলব।
ধনু শেখ শরিফাকে বিবাহ করে স্ত্রী নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। শরিফা জড়সড় হয়ে আছে। অকারণে চমকে চমকে উঠছে। আতর তার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করছে। চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে দিয়েছে। সহজ স্বাভাবিক গলায় বলেছে, কলিকাতা থেকে কলের গান আনায়েছি। আপনি কি গান শুনবেন? জুলেখার একটা থাল আছে। একপিঠে উনার গান, অন্যপিঠে কৃষ্ণভানুর গান।
শরিফা ক্ষীণ গলায় বলল, গান শুনব না।
আতর বলল, কাপতেছেন কেন?
শরিফা বলল, ভয়ে কাপতেছি। খুব ভয় লাগতেছে আতর।
ভয় পাবেন। মেয়ে হয়ে জন্মানোর এটা শাস্তি।
ধনু শেখ প্রচুর মদ্যপান করে এক রাতের স্ত্রীকে নিয়ে ঘুমুতে গেলেন। জড়ানো গলায় বললেন, বৌ শরিফা, তুমি বড়ই ভাগ্যবতী। ঠ্যাংওয়ালা স্বামীর সঙ্গে সংসার করলা, আবার ঠ্যাং ছাড়া স্বামীর সাথেও সংসার করলা। হা হা হা।
শরিফা আতঙ্কে এবং ভয়ে শিউরে উঠল।
ফজরের নামাজ পড়েই করিম ধনু শেখের বাড়িতে চলে এসেছে। ধনু শেখ ঘুম থেকে উঠলেন দুপুরবেলায়। করিমকে বাংলাঘরে ডেকে পাঠালেন। দরাজ গলায় বললেন, প্রচুর মদ্যপান করে রাতে শুয়েছি। শুয়েই ঘুম। স্ত্রীর সঙ্গে ভাবভালোবাসা, আদর-সোহাগ কিছুই হয় নাই। কাজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজ আর তালাক দিব না। তালাক ফালাক যা হবার কিছুদিন পরে হবে।
করিম বলল, এসব কী বলেন?
ধনু শেখ গলা উঁচিয়ে বললেন, কী বলি মানে? তোমার সঙ্গে কি দলিল করেছি যে একদিন পরে স্ত্রী তালাক দিব? বলো কোনো দলিল করেছি?
করিম হতভম্ব গলায় বলল, আমি শরিফার সঙ্গে কথা বলব।
ধনু শেখ বললেন, অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাও, এটা কেমন কথা? পর্দাপুষিদা বিস্মরণ হয়েছ? যাও বিদায় হও। অনেক ত্যক্ত করেছ, আর না।
ধনু শেখ বাংলাঘর ছেড়ে অন্দরের দিকে রওনা দিলেন। তাকে উৎফুল্ল এবং আনন্দিত মনে হচ্ছে। পাখির মাংস রাতে খাওয়া হয় নি। রোধে রাখা হয়েছে। পাখির মাংস বাসি করে খাওয়া নিয়ম। এখন লুচি এবং পাখির মাংস দিয়ে নাশতা করবেন। এটা ভেবেও ভালো লাগছে। স্ত্রীর জন্যে শাড়ি গয়নার ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়া বৌ’র ফকিরনীর মতো বেশভূষা থাকবে কেন? গলা হাত খালি দেখতেও খারাপ। নেত্রকোনায় লোক পাঠানো দরকার, লাল শাড়ি কিনে আনবে। বৌ মানুষকে লাল শাড়ি ছাড়া মানায় না।
গত দুদিন ধরে মীরা চুপচাপ। তার মুখে রামনাম নেই। সে কোনো শব্দও করছে না। শ্ৰীনাথ বিব্রত অবস্থায় আছেন। মীরাকে দেখতে আসা দর্শনাথীদের বলছেন, মা কুপিত হয়েছেন। কারো ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
নয়া বাজার থেকে বড় বাড়ির এক বৌ এসেছে মীরাকে দিয়ে কপালে সিঁদুর দেয়াতে। বৌটির নাম সরাজুবালা। বারবার তার গর্ভ নষ্ট হচ্ছে। যদি মীরাকে দিয়ে সিঁদুর দেয়ালে গর্ভ রক্ষা হয়। মীরার হাতে সিঁদুরের কোটা দেয়া মাত্র সে কোটা দূরে ফেলে দিল। শ্ৰীনাথ হাহাকার করে উঠলেন, যা ভেবেছি তাই। দেবী কুপিত। পূজার ব্যবস্থা করতে হবে। দেবীর রাগ কমাতে হবে। সরাজুবালা নামের বেঁটি কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।
মীরার দর্শনার্থীদের মধ্যে একজন পুরুষ— একাকড়ি সাহা। যুদ্ধের কারণে তাঁর ব্যবসা ফুলে ফেপে উঠেছে। চালের দাম এতটা বাড়বে তিনি চিন্তাও করেন নি। বাৰ্মা থেকে চাল আসা বন্ধ এটা ঠিক। দেশের চাল গেল কোথায়? এককড়ি খবর পেয়েছেন কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ভুখা মানুষের না-কি ঢল নেমেছে। তারা ভাত চায় না। তাদের একটাই আকুতি— একটু ফ্যান দেন। অবস্থা যেদিকে যাচ্ছে তাতে মনে হয় না। ফ্যানও পাওয়া যাবে। ঘরে ভাত রান্না হলে তবেই না। ফ্যান হবে।
