আনিস বলল, চলুন যাই দেখে আসি।
ঠাট্টা করছেন?
আমি ঠাট্টা করি না। একজন মানুষ ক্ষুধার স্বরূপ বুঝতে চাচ্ছে এটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে বলেই আমি চুপ করে আছি।
একজন মানুষ মরে যাবে তারপরও আপনি চুপ করে থাকবেন?
আনিস হাসি মুখে বলল, মানুষ এত সহজে মরে না। চলুন যাই অনশন ভাঙিয়ে দিয়ে আসি। বিলু বিস্মিত গলায় বলল, আমরা সবাই মিলে যা পারলাম না। আপনি তাই করবেন। অনশন ভাঙ্গাবেন?
হ্যাঁ।
আনিস সোবাহান সাহেবের সঙ্গে কি কথা বলব। কেউ জানল না। কারণ ঘরে তখন দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিল না। কিন্তু দেখা গেল আনিস ঘর থেকে বেরুবার পর পরই সোবাহান সাহেব বললেন, আমাকে এক গ্লাস দুধ দাও।
খবর শুন হতভম্ব হয়ে গেল ফরিদ। এটা কি কথা? চিত্ৰনাট্য এখন কমপ্লিট আর এখনি কি-না অনশন ভঙ্গ। আর দুদিন পর ভাঙলে অসুবিধাটা কি হত? এই দুদিনে ইস্পটেন্ট কিছু সন্ট নিয়ে নেয়া যেত! মহৎ কাজে পদে পদে বাধা আসে এটাই হচ্ছে খাটি কথা। মহাপুরুষদের যে বাণী–তোমার পথ কুসুমান্তীর্ণ নয় এটাই হচ্ছে আদি সত্য।
রাগ করে রাতে ফরিদ ভাত খেল না। এই রাগ তার নিজের উপর না, দুলাভাইয়ের উপরও না। এই রাগ হচ্ছে প্রকৃতির উপর। যে প্রকৃতি পদে পদে মানুষকে আশাহত করে।
সোবাহান সাহেব চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। মিলি বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ডাক্তার পাশেই আছে। ডাক্তারের মুখ আনন্দে ঝলমল করছে কারণ এই অনশনের কারণে খুব ঘন ঘন সে এ বাড়িতে আসতে পেরেছে। এখন অনশন ভাঙায় একটু সমস্যা হয়েছে আর হয়ত ঘন ঘন আশা সম্ভব হবে না। তবে ভাগ্য যদি ভাল হয় তাহলে হয়ত তৃষ্ণার্তা মানুষের কষ্ট বোঝানোর জন্যে এই লোক পানি খাওয়া বন্ধ করবেন। সেই সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ মনে হচ্ছে। মিলি বলল, ডাক্তার সাহেব। আপনি এখনো বসে আছেন কেন চলে যান। মনসুর বলল, না আমার কোন অসুবিধা নেই। এগারোটার দিকে প্রেসারটা মেপে তারপর যাব।
তাহলে আসুন আমাদের সঙ্গে চারটা ভাত খান।
জি আচ্ছা।
মিলি হাসতে হাসতে বলল, কেউ ভাত খেতে বলতেই আপনি বুঝি রাজি হয়ে যান? এ রকম চট করে রাজি হওয়াটা কি ভাল? আমাদের হয়ত ভাত খাওয়াবার ইচ্ছা নেই ভদ্রতা করে বলেছি।
মিলি হাসতে হাসতে কথাগুলো বলছে। শুনতে কি ভালই না লাগছে। আচ্ছা এই মেয়ের সঙ্গে তার যদি কোনদিন বিয়ে হয় তাহলে সেকি কোনদিন তার সঙ্গে কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া করবে? না করবে না। কোনদিন না। এই মেয়েকে সে কোনদিন কোন কড়া কথা বলতে পারবে না। এই মেয়ের খুব কঠিন কথায়ও সে রাগ করতে পারবে না।
ডাক্তার সাহেব।
জি।
আপনি আনিস সাহেবের ছোট মেয়েটাকে একবার দেখে যাবেন। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়েছে। আপনি বরং উপর থেকে রুগী দেখে আসুন— আমি ভাত দিতে বলি।
জি আচ্ছা।
নিশার জ্বর তেমন কিছু না। একশর কিছু বেশি। তবে লাংস পরিষ্কার না। কেমন যেন ঘড়ি ঘড় শব্দ হচ্ছে। আনিস বলল, কেমন দেখলেন?
মনসুর বলল, ভাল।
সত্যি ভাল তো? আপনার গলায় তেমন জোর পেলাম না।
লাংসে কেমন ঘড়ি ঘড় শব্দ হচ্ছে, মনে হচ্ছে বুকে বোধ হয়। কফ জমে গেছে। সকাল পর্যন্ত দেখব। তারপর এন্টিবায়োটিক দেব।
আপনার ভিজিট কত ডাক্তার সাহেব?
মনসুর খানিক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আনিস সাহেব। আমি বাচ্চাদের সঙ্গে খুব ভাল মিশতে পারি না। কিছু কিছু মানুষ আছে ভালবাসা প্ৰকাশ করতে পারে না। আমি সেই রকম। আমি আপনার বাচ্চা দুটাকে যে কি পরিমাণ পছন্দ করি তা ওরা জানে না। কিন্তু আমি জানি, আমার হৃদয় জানে। আপনি ভিজিটের কথাটা তুলে খুব কষ্ট দিলেন।
আনিস লজ্জিত স্বরে বলল, ভাই কিছু মনে করবেন না।
না। আমি কিছু মনে করিনি।
আনিস হাসতে হাসতে বলল, আমিও আপনাকে খুব পছন্দ করি। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আপনাকে খানিক সাহায্য করতে পারি।
মনসুর অবাক হয়ে বলল, আমাকে সাহায্য করতে পারেন?
হ্যাঁ পারি। আমার মনে হয় আপনার কিছু উপদেশের প্রয়োজন আছে।
মনসুর তাকিয়ে রইল। আনিস বলল, যে কথাটা আপনি বলতে পারেন না, লজ্জা বোধ করেন বা সংকোচ বোধ করেন সেটা বলে ফেলবেন। পেটে জমিয়ে রাখবেন না। এই হচ্ছে উপদেশ।
আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।
ধরুন আপনি কাউকে ভালবাসেন। রূপবতী কোন এক তরুণীকে। কিন্তু বলার সাহস পাচ্ছেন না। সব সময়ই আপনার মনে এক ধরনের ভয়। এক ধরনের শংকা। ঐ ভয়, ঐ শংকা দূর করে ফেলুন। যখন মেয়েটিকে একা দেখবেন এগিয়ে যাবেন, সহজ স্বাভাবিক গলায় বলবেন, আমি তোমাকে ভালবাসি। এতে অতীতে কাজ হয়েছে। বর্তমানে হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। আমার মনে হয় অনেকদিন থেকেই এ কথাটা আপনি কাউকে বলতে চাচ্ছেন। সাহস পাচ্ছেন না।
আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন?
আপনাকে বলছি কারণ আপনি নিতান্তই একজন ভাল মানুষ, আমি আপনার উপকার করতে চাই।
আমার উপকার করা নিয়ে আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।
মনসুর নিচে নেমে এল কিন্তু আনিসের কথা মাথা থেকে দূর করতে পারল না। ব্যাপারটা তো আসলেই তাই। কাছে যাওয়া এবং এক পযায়ে শান্ত গলায় আসল কথাটা বলে ফেলা— আমি তোমাকে ভালবাসি। I love you.
জগতের সবচে পুরাতন কথা আবার সবচে নতুন কথা। এই কথা বলতে এত সংকোচ কেন? এত দ্বিধা কেন? সে মিলিকে এই কথা বলার পর মিলি কি করতে পারে? সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখা যাক।
ক. মিলি মাথা নিচু করে ফেলল। তার ঠোঁট অল্প অল্প করে কাঁপছে। চোখের কোণ আন্দ্রে। ক্ষীণ গলায় ছোট্ট করে বলল— তুমি এসব কি বলছ? যাঃ আমার লজ্জা লাগছে। (মিলির এটা কখনো করবে না। মিলি প্রকৃতি এটা নয়।)
