একটু সেজেগুজে ডাক্তারের সামনে হাঁটাহাঁটি করলে কি কোন অসুবিধে আছে? এক কাপ চা এনে দিবে। এক গ্রাস পানি আনবে। যাবার সময় বলবে, ডাক্তার সাব ভাল আছেন? আবার আসবেন। একটু ঢং ঢেং না করলে হয়? দুনিয়াটাই হচ্ছে ঢং ঢাংয়ের।
অবশ্যি এমদাদ চেষ্টার ক্ৰটি করছে না। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হলেই গল্প গুজব করছে। একটা সম্পর্ক পাতানের চেষ্টায় আছে। কোনমতে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেললে নিশ্চিন্ত। সেই সম্পর্কও করা যাচ্ছে না। ডাক্তারকেও একটু বোকা কিসিমের বলে মনে হচ্ছে। এটা একদিক দিয়ে ভাল। স্বামী হিসেবে বোকাদের কোন তুলনা নেই। যত বোকা তত ভাল স্বামী। ডাক্তারটা কত বোকা সেটাও ঠিক ধরা যাচ্ছে না। তবে এই বাড়ির মিলি মেয়েটির সঙ্গে বড় বেশি খাতির। এটা একটা সন্দেহজনক ব্যাপার। একটু লক্ষ্য রাখতে হবে। গতকাল অবশ্যি ডাক্তারে চেম্বারে গিয়ে কিছু কাজ করা হয়েছে। এইসব কাজ ঠাণ্ডা মাথায় করতে হয়। এখন বয়স হয়ে গেছে। মাথা আগের মত ঠান্ডা না। গতকাল ডাক্তারের সঙ্গে কথাবার্তা যা হল তা হচ্ছে–
এমদাদ : এই যে ডাক্তার ভাই, শরীর ভাল? চিনছেন তো আমারে? আমি এমদাদ। পাকুন্দিয়ার এমদাদ। আমার নাতনীটার শরীরটা খারাপ। ভাবলাম একটু অষুধ আপনার কাছ থেকে নিয়ে যাই।
ডাক্তার : কি অসুখ?
এমদাদ : মাথার যন্ত্রণা। আরো কি সব যেন আছে। আমি নিয়ে আসবনে আপনের কাছে। দেখে শুনে যাই হোক একটা কিছু দিবেন। আপনের উপরে আবার খুব ভক্তি। আপনাকে খুবই ভাল পায়।
এই কথায় ডাক্তার খানিকক্ষণ খুক খুক করে কাশল। এটা খুব ভাল লক্ষণ। কাজেই কথাবার্তা এই লাইনেই চালানো ভাল। এমদাদ গলার স্বর খানিকটা নিচু করে বলল, মেয়েদের মন বোঝা বড় মুশকিল। ঐ দিন আপনারে নিয়া বিরাট ঝগড়া মিলির সঙ্গে।
ডাক্তার : (খানিকটা উৎসাহী) মিলির সঙ্গে ঝগড়া?
এমদাদ : জি।
ডাক্তার : কি জন্যে বলুন তো?
এমদাদ : মেয়েছেলের কারবারতো। মিলি একদিন বলল–ডাক্তার সাহেব বেকুব কিসিমের লোক এই শুইন্যা পুতুল রাগ করল।
ডাক্তার : (হতভম্ব) আমাকে বেকুব কিসিমের লোক বলল?
এমদাদ : বাদ দেন। বাদ দেন। মেয়েছেলের কারবার, তামশা কইরা বলছে। মেয়েছেলেরা তামশা কইরা অনেক কথা কয়। হে হে হে।
এমদাদ চেষ্টার চূড়ান্ত করছে, কিন্তু একা একা কত করবে? পুতুলের নিজেরও তো সাহায্য দরকার। সে যদি কাঠের টুকরার মত থাকে তাহলে হবে কিভাবে? শাড়িটা বদলাতে বললে বদলায় না। চুলটা আচড়িয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ক্ষতিতো কিছু নাই?
তাছাড়া অবস্থা এমন কিছু করারও সময় না। একজন ঝিম ধরে পড়ে আছে। এখন যায়। তখন যায় অবস্থা। ক্ষুধা কি জিনিস বুঝতে চায়। আরে বাবা আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা না ক্ষুধা কি জিনিস তুমি বোঝ। যদি আল্লাহতালার সেই রকম ইচ্ছা থাকত তোমারে গরিব বানিয়ে পাঠাত। খামোকা ভড়ং।
এ বাড়িতে এমন্দাদের সব সময় মুখ শুকনা করে থাকতে হয়। ভাব দেখাতে হয় যে চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। এসব কি ভাল লাগে? আর বুড়া যদি সত্যি সত্যি মরে যায় তাহলে তো সাড়ে সর্বনাশ। সে যাবে কোথায়?
সন্ধ্যাবেলা আকাশ অন্ধকার করে মেঘ করল। কালবৈশাখীর প্রথম ঝাপ্টা। হাওয়ায় ঘরের দরজা জানালা উড়িয়ে নিয়ে যাবার মত অবস্থা। টগর এবং নিশার আনন্দের সীমা নেই। বৃষ্টির মধ্যে খুব লাফাচ্ছে। বৃষ্টির জল অসম্ভব ঠাণ্ডা। শীতে একেকজন থারথার করে কপিছে তাতেও আনন্দ বাধা মানছে না। আনিস ঘর থেকে এই দৃশ্য দেখছে তবে চুপচাপই আছে। তার মুখে মৃদু হাসি দেখে মনে হচ্ছে সেও বেশ মজাই পাচ্ছে হয়ত সে পানিতে নামবে। টগর বলল, বাবা পানিতে নামবে?
আনিস হাসি মুখে বলল, ঠাণ্ডা কেমন তার উপর নির্ভর করছে।
নিশা শীতে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, একদম ঠাণ্ডা না বাবা। গরম পানি।
খুব গরম?
হ্যাঁ খুব গরম।
আনিসও নেমে পড়ল। শীতে জমে যাবার মত অবস্থা। তবু বাচ্চাদের সঙ্গে হৈচৈ করে ভিজতে ভাল লাগছে। সবার ঠাণ্ডা লেগে যাবে বলাই বাহুল্য। নিশা এখনই হাঁচি দিচ্ছে।
আর বোধ হয় মেয়েটাকে পানিতে থাকতে দেয়া উচিত হবে না। কিন্তু ওঠে যেতে বলতেও খারাপ লাগছে। করুক, একটু আনন্দ-করুক।
নিশা শীতে কাঁপতে কাপতে বলল, বাবা আজ সারা রাত আমরা পানিতে ভিজব–কেমন?
আমার আপত্তি নেই।
পানিতে বেশিক্ষণ ভেজা গেল না। শীলা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। দৌড়ে সবাইকে ঘরে ঢুকতে হল। তিনজনেই শীতে থর থর করে কাঁপছে। নিশার গায়ে সম্ভবত জ্বর উঠেই গেছে। সে একটু পর পরই হাঁচি দিচ্ছে। বিলুর কাছ থেকে অষুধ এনে খাইয়ে দেয়া দরকার। আনিসকে বিলুর কাছে যেতে হল না। বিলু নিজেই এসে উপস্থিত।
বিলু মুখ শুকনো করে বলল, আপনারা মনে হচ্ছে খুব মজা করলেন। আনিস বলল, হ্যাঁ করলাম। অনেকদিন পর পানিতে ভিজলাম। যাকে বলে শৈশবে ফিরে যাওয়া।
আপনার সঙ্গে একটা কথা বলার জন্যে এসেছিলাম আনিস সাহেব।
বলুন।
আপনার বাচ্চাগুলোর গা মুছিয়ে শুকনো কাপড় পরিয়ে দিন তারপর আমার সঙ্গে নিচে আসুন, বলছি।
মনে হচ্ছে খারাপ খবর। আমাদের জন্যে খারাপ খরব আপনার জন্যে কেমন তা জানি না। বাবার ব্লাড প্রেসার খুব ফল করেছে।
বলেন কি?
বাড়ির একটা মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে পড়ে আছে এবং তা পড়ে আছে আপনার উল্টা পাল্টা কথা শুনে। অথচ আপনি এদিনও তাঁকে দেখতে যান নি।
