রহিমার মা তৎক্ষণাৎ শাড়ি বদলে গত ঈদে পাওয়া সাদা শাড়ি পরে ফেলল। নতুন শাড়ি এবং চশমার কারণে ছোট খাট একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
মনসুর বিকেলে এসেছে। তাকে খবর দেয়া হয় নি, নিজ থেকেই এসেছে। এ বাড়িতে আসবার জন্যে অনেক ভেবেচিন্তে একটা অজুহাতও তৈরি করেছে। অজুহাত খুব যে প্রথম শ্রেণীর তা নয়, তবে মনসুরের কাছে মনে হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর। সে ঠিক করে রেখেছে মিলিকে বলবে, আজ আমার জন্মদিন। কাজেই এই বাড়ির মুরুত্বীদের দোয়া নিতে এসেছি। জন্মদিনের কথায় সবাই খানিকটা দুর্বল হয়। মিলিও নিশ্চয়ই হবে। যতক্ষণ কথা বলার প্রয়োজন তার চেয়েও কিছু বেশি কথা বলবে। চা নাশতা দেবে। একটা মানুষতো আর একা একা বসে চা খাবে না। মিলি বসবে তার সামনে। কি ধরনের কথা সে মিলির সঙ্গে বলবে তা মোটামুটি ঠিক করা। কয়েকটা হাসির গল্প বলবে মিলিকে হাসিয়ে দিতে হবে। মেয়েরা রসিক পুরুষ খুব পছন্দ করে। হাসির গল্প সে নিজেও পছন্দ করে কিন্তু তেমন বলতে পারে না।
মনসুর দরজার বেল টিপল। দরজা খুলে দিল রহিমার মা। তার চোখে চশমা, পরনে ইস্ত্রী করা ধবধবে সাদা শাড়ি। মিলি সোফায় বসে কি একটা ম্যাগাজিন পড়ছে।
মনসুর রহিমার মার দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলল, আজ আমার জন্মদিন।
রহিমার মা এবং মিলি দুজনই বিস্মিত হয়ে ডাক্তারে দিকে তাকাল। মনসুর মুখের হাসি আরও বিস্তৃত করে বলল, ভাবলাম জন্মদিনে মুরুব্বীদের কাছে থেকে দোয়া নিয়ে যাই। আপনি আমার জন্যে দোয়া করবেন–
এই বলে মনসুর নিচু হয়ে রহিমার মা-র পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলল।
মিলি তার হতভম্ব ভাব সামলে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, রহিমার মা যাওতো ডাক্তার সাহেবের জন্যে চা নিয়ে এসো।
রহিমার মা চলে যেতেই মনসুর ক্ষীণ স্বরে বলল, মনে হচ্ছে একটা ভুল হয়ে গেছে।
হ্যাঁ কিছুটা হয়েছে। আপনি মুরুব্বীদের দোয়া নিতে এসেছেন। রহিমার মা বয়সে আপনার অনেক অনেক বড় সেই হিসেবে মুরুব্বী–কাজেই এত আপসেট হচ্ছেন কেন? বসুন। যা হবার হয়ে গেছে।
জ্বি না। বসব না। কাইন্ডলি এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি যদি খাওয়ান। আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম।
আপনি বসুন। পৃথিবী উল্টে যাবার মত কিছু হয়নি। এ রকম ভুল আমরা সব সময় করি।
মিলি ভেতর থেকে ঠাণ্ডা পানি এনে দেখল ডাক্তার নেই। এই প্রথম ডাক্তার ছেলেটির জন্যে সে এক ধরনের মায়া অনুভব করল। তার ইচ্ছা করতে লাগল। কাদেরকে পাঠিয়ে মনসুরকে ডেকে আনায়। চা খেতে খেতে দুজনে খানিকক্ষণ গল্প করে। বেচারা বড় লজ্জা পেয়েছে।
ফরিদ
রের খাওয়ার পর ফরিদ টানা ঘুম দেয়। বাংলাদেশের জল হাওয়ার জন্যে এই ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজন বলে তার ধারণা। এতে মেজাজের উগ্ৰ ভাবটা কমে যায়–স্বভাব মধু হয়। ফরিদের ধারণা জাতি হিসেবে বাঙালি যে ঝগড়াটে হয়ে যাচ্ছে তার কারণ এই জাতি দুপুরে ঠিক মত ঘুমুতে পারছে না।
তার ঘুম ভাঙল বিকেল চারটায়। চোখ মেলে অবাক হয়ে দেখল। সাত-আট বছরের একটি ফুটফুটে ছেলে এবং চার-পাঁচ বছরের পরীর মত একটি মেয়ে পা তুলে তার খাটে বসে আছে। গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শিশুদের ফরিদ কখনো পছন্দ করে না। শিশু মানেই যন্ত্রণা। ফরিদের ভুরু কুঞ্চিত। সে গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা কে?
ছেলেটি তার চেয়েও গম্ভীর গলায় বলল, আমরা মানুষ।
এখানে কি চাও?
কিছু চাই না।
ছোট মেয়েটি বলল, আপনি আমাদের ধমক দিচ্ছেন কেন? ধমক দিলে আমরা ভয় পাই না।
নাম কি তোমার?
আমার নাম নিশা, ওর নাম টগর। ও আমার ভাই।
আপনার নাম কি?
এতো দেখি বড় যন্ত্রণা হলো।
আমাদের নাম জিজ্ঞেস করেছেন আমরা বললাম, এখন আপনার নাম জিজ্ঞেস করেছি আপনি বলবেন না কেন?
আমার নাম ফরিদ।
আপনাকে কি বলে ডাকব?
কিছু ডাকতে হবে না।
বড়দের কিছু ডাকতে হয়, চাচা, মামা, খালু এইসব।
বললাম তো কিছু ডাকতে হবে না।
নাম ধরে ডাকব?
আরো বড় যন্ত্রণা করছে তো। নামো বিছানা থেকে। নামো।
টগর এবং নিশা গম্ভীর মুখে নামল। ঘর থেকে বের হল কিন্তু পুরোপুরি চলে গেল না, পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে রইল। মাঝে মাঝে পর্দা সরিয়ে মুখ দেখায় এবং জীব বের করে ভেংচি কাটে আবার মুখ সরিয়ে নেয়। রাগে ফরিদের সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। এত সাহস এই দুই বিছুর! এল কোথেকে এইগুলো? খুব সহজে এগুলোর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। এরা তার হাড় ভাজা ভাজা করে দেবে। সে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে। শিশুদের সঙ্গে তার এক ধরনের বৈরী সম্পর্ক আছে। শিশুরা তাকে নানান ভাবে যন্ত্রণা দেয়।
ফরিদ ডাকল, কাদের কাদের।
অবিকল ফরিদের মতে করে টগর বলল, কাদের-কাদের।
ফরিদ চেঁচিয়ে বলল, এই বিছু দুটাকে ঘাড় ধরে বের করে দে তো কাদের।
ছোট মেয়েটি ফরিদের মত করে বলল, এই বিছু দুটাকে ঘার ধরে বের করে দেতো।
ফরিদ প্ৰচণ্ড ক্ষোভের সঙ্গে বলল, উফ!
সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি বলল–উফ!
টগর, এবং নিশা এখন যে খেলাটা খেলছে। তার নাম নকল খেলা। এই খেলা হচ্ছে মানুষকে রাগিয়ে দেবার খেলা। যাকে রাগিয়ে দেয়া দরকার তার সঙ্গে এই খেলা খেলতে হয়। সে যা বলে তা বলতে হয়। অবশ্যি বড়দের সঙ্গে এই খেলা খেলতে নেই। তবে টগর এবং নিশা দুজনেরই মনে হচ্ছে এই মানুষটা বড় হলে তার মধ্যে শিশু সুলভ একটা ব্যাপার আছে। তার সঙ্গে এই খেলা অবশ্যই খেলা যায়।
