সোবাহান সাহেবের মন খারাপ লাগছে, তিনি মাছের দেশের মানুষ অথচ মাছের ব্যাপারে প্রায় কিছুই জানেন না। শুধু জানেন বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে যখন আকাশ গুড় গুড় করে উঠে তখন কৈ মাছের ঝাক পানি ছেড়ে শুকনোয় উঠে আসে। রহস্যময় ব্যাপার। এই পৃথিবী যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কত অদ্ভুত রহস্য চারদিকে দিয়েছেন। তাকে চিনতে হবে। এইসব রহস্যের মাঝে।
বারান্দায় মিলি হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে গাইছে। মেয়েটার গানের গলা চমৎকার অথচ ভাল করে গান শিখল না। তার ইচ্ছা করল মেয়েকে ডেকে পাশে বসিয়ে গান শুনেন। তা সম্ভব হবে না। গাইতে বললে মিলি গাইতে পারে না। সে না-কি গান করে নিজের জন্যে, অন্য কারো জন্যে না।
মিলি গাইছে—
বলি গো সজনী যেয়ো না, যেয়ো না
তার কাছে আর যেয়ো না।
সুখের সে রয়েছে, সুখে সে থাকুক,
মোর কথা তারে বোলো না বোলো না।
সুন্দর গানতো। সোবাহান সাহেবের মন আনন্দে পূর্ণ হল। তিনি খাতা বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাড়ালেন। মিলি রেলিং-এ হেলান দিয়ে আছে। আকাশ ভরা জোছনা। কি অপরূপ ছবি। এমন সুন্দর পৃথিবী ফেলে রেখে তাঁকে চলে যেতে হবে ভাবতেই কষ্ট হয়। স্বৰ্গ কি এই পৃথিবীর চেয়েও সুন্দর হবে? তাও কি সম্ভব?
মিলি গান বন্ধ করে বাবার দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল, আমার মন অসম্ভব খারাপ হয়ে আছে। বাবা।
কেন?
কাল আমার টিউটোরিয়েল, কিছু পড়া হয়নি। পড়তে ভাল লাগে না, কিযে করি!
সোবাহান সাহেব সিস্নেহে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। মিলি বলল, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা আমরা পড়ালেখা করে নষ্ট করি। কোন মানে হয় না।
রহিমার মা
নিরিবিলি বাড়ির সবচে সরব মহিলা–রহিমার মার মুখে আজ সারাদিন কোন কথা নেই। মিনু ব্যাপারটা লক্ষ করলেন, জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে রহিমার মা?
রহিমার মা থমথমে গলায় বলল, কি হয় নাই। গরিবের আবার হওয়া হওয়ি। গরিবের কিছুই হয় না।
মিনু আর তাকে ঘাটালেন না। চুপচাপ আছে ভাল আছে, কথা বলা শুরু করলে মুশকিল।
সন্ধ্যায় চা বানাতে বানাতে রহিমার মা নিজের মনেই বলল, গরিবের দুঃখ কেউ বুঝে না। মাইনষেতো বুঝেই না আল্লায়ও বুঝে না।
খুবই ফিলসফিক কথা। এ জাতীয় কথাবার্তা বলা শুরু করলে বুঝতে হবে ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে।
যা ঘটেছে তাকে ভয়াবহ বলা ঠিক হবে না। ঘটনা ঘটেছে গত রাতে। কাদের এবং রহিমার মা এক ঘরে ঘুমোয়। কাজকর্ম শেষ করে রাত এগারোটায় দিকে রহিমার মা ঘুমুতে এসে দেখে কাদের জেগে বসে আছে। কাদেরের চোখে নতুন চশমা। কাদেরকে কেমন ভদ্রলোক ভদ্রলোক লাগছে। কাদের বলল, কেমন দেহায় খালাজী?
রহিমার মা তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারল না। বিস্ময় সামলাতে সময় লাগল।
চশমা কই পাইছস?
কিনলাম। একশ দশ টেকা দাম। টেকা পয়সার দিকে চাইলেতো হয় না খালাজী। টেকা পয়সা হইল বাটপাতা। আইজ আছে কাইল নাই। জেবন তো বটপাতা না। জেবনের সাধ আহ্লাদ আছে। কি কন খালাজী?
রহিমার মা জবাব দিল না। কাদের চোখে থেকে চমশা খুলে গম্ভীর ভঙ্গিতে কাচ পরিস্কার করতে করতে বলল, জিনিসটার প্রয়োজনও আছে খালাজী। চেহারা সুন্দরের কথা বাদ দিলেও জিনিসটার বড়ই দরকার। চউক্ষে ধুলাবালি পড়ে না। রইদ কম লাগে। চউক্ষের আরাম হয়।
দাম কত কইলি?
একশ দশ। পাওয়ার দিলে আরো বেশি পড়ত। বিনা পাওয়ারে নিলাম। বুড়াকালে পাওয়ার কিনুম।
রহিমার মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস আটকে রাখতে পারল না। এই কাদের ছোকরা বড়ই শৌখিন। বেতনের টাকা পেলেই এটা ওটা কিনে ফেলে। গত মাসে কিনেছে কলম। কলম কিনে এনে গম্ভীর গলায় বলেছে, কলম কিনলাম একটা খালাজী, চাইনিজ।
রহিমার মা অবাক হয়ে বলেছে, কলম দিয়া তুই করবি কি? লেহাপড়া জানছ?
কাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেছে লেহাপড়া কপালে নাই করমু কি কন? লেহাপড়া না জানলেও কলম এটা থাকা দরকার। পকেটে কলম থাকলে বাইরের একটা লোক ফাঁট কইরা তুমি বইল্যা ডাক দিব না। বলব, ভাইসাব।
রহিমার মারও খুব শখ ছিল একটা কলম কেনার। তবে কাদের যেমন কলম পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারে সে তা পারবে না জেনে কেনে নি। এখন আবার চশমা কিনে ফেলেছে। ঈর্ষায় রহিমার মার চোখ জ্বালা করতে লাগল।
কাদের বলল, দেহায় কেমন খালাজী?
রহিমার মা বিরক্ত মুখে বলল, যেমুন চেহারা তেমুন দেহায়। ভ্যান ভ্যান করিস না।
আয়নায় অনেকক্ষণ কাদের নিজেকে দেখল। তারপর বারান্দায় একটু হেঁটে আসল। চমশা পরার পর তার হাঁটার ভঙ্গিও বদলে গেছে।
সেই রাতে মনের কষ্টে রহিমার মার ঘুম হল না। তার মেজাজ খারাপের এই হচ্ছে পূর্ব ইতিহাস। মিনু পূর্ব ইতিহাস জানেন না। কাজেই রহিমার মা যখন এসে তাঁকে বলল, আমার চউক্ষে যেন কি হইছে আম্মা, তখন সঙ্গত কারণেই চিন্তিত হয়ে বললেন, কি হয়েছে?
চাউখ খালি কড় কড় করে।
তাই না-কি?
আবার চিলিক দিয়ে বেদনা হয়।
ডাক্তার দেখাও।
ডাক্তার লাগতো না আম্মা। চশমা দিলে ঠিক হইব। চশমার দাম বেশি নাএকশ দশ। কাদের কিনছে।
কাদের চশমা কিনেছে?
জি আম্মা। জেবনের একটা সাধ আহলাদ আছে না?
মিনু বিরক্ত হয়ে বললেন, কাদের যা করে তোমাকে তাই করতে হবে? তুমি বড় যন্ত্রণা কর রহিমার মা।
কয় দিন আর বাঁচুম আম্মা কন?
আচ্ছা ঠিক আছে যাও চশমা দেয়া হবে।
রহিমার মার চোখে আনন্দে পানি এসে গেল।
চশমা এল তার পরের দিন। রহিমার মা মুগ্ধ। আয়নায় সে নিজেকে চিনতে পারে না। কাদের বলল, ময়লা শাড়িডা বদলাইয়া একটা ভাল দেইখ্যা শাড়ি পরেন। খালা। চশমার একটা ইজজত আছে।
