আনিস বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার। অনেক ধন্যবাদ।
রাত আটটার মত বাজে।
মিলি বিরক্ত মুখে খাতা কলম নিয়ে বসে আছে। তার সামনে চার পাঁচটা বই। আগামীকাল সকাল নটায় তার টিউটোরিয়েল ক্লাস। এ্যাসাইনমেন্টের কিছুই এখনো করা হয়নি। বিষয়টাই মাথায় ঢুকছে না। এর আগের টিউটোরিয়েলে বি মাইনাস পেয়েছে। এবার মনে হচ্ছে সি মাইনাস হবে। খাতায় প্রথম বাক্যটা লিখে শেষ করবার আগেই কাদের ঘরে ঢুকে বলল, আফা আফনেরে ডাকে।
মিলি রাগি গলায় বলল, কে ডাকে?
ডাক্তার সাব। গ্ৰীন ফার্মেসীর চেংড়া ডাক্তার।
আমাকে ডাকছে কি জন্যে? আমার কাছে কি?
আমি ক্যামনে কই আফা? আমি হইলাম গিয়া চাকর মানুষ। আমার সাথে কি আর খাতিরের আলাপ করব?
মিলি কঠিন গলায় বলল, তুই কথা বেশি বলিস, কথা কম বলবি।
অর্ডার দিলে কথাই কমু না। অসুবিধা কি? কথা কওনের মইধ্যেতো আফা আরাম কিছু নাই।
যা আমার সামনে থেকে।
কাদের গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেল। পেছনে পেছনে আসছে মিলি, বেআক্কেল ডাক্তারের জন্যে তার মেজাজ খুবই খারাপ হয়েছে, যদিও তাকে দেখে তা বোঝা যাচ্ছে না।
মনসুরের পোশাক-আষাক আজ খুবই পরিপাটি। সার্ট প্যান্ট সবই নতুন কেনা হয়েছে। জুতা জোড়াও নতুন। জুতা জোড়া সাইজে খানিকটা ছোট হয়েছে। কেনার সময় তা ঠিক বোঝা যায়নি। এখন জানান দিচ্ছে। পাটন টন করছে। পায়ের আঙুলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে কি-না কে জানে। মিলিকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। মিলি বলল, কি ব্যাপার ডাক্তার সাহেব?
না মানে আপনার বাবার প্রেসারটা চেক করতে এসেছিলাম।
আপনাকে কি আসতে বলেছিল কেউ?
জ্বি না। তবে উনার যেহেতু হাই প্রেসারের টেনডেন্সি কাজেই প্রায়ই চেক করা দরকার।
ও আচ্ছা।
আমি আপনাদের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম দেখেই যাই।
ভাল করেছেন। বাবা দোতলায় তার ঘরে। আসুন বাবার কাছে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।
চলুন।
মিলি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, আপনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন কেন?
মনসুর লজ্জিত গলায় বলল, নতুন জুতা। সাইজে হয়েছে ছোট। কেনার সময় বুঝতে পারি নি। মনসুর সিড়ির শেষ মাথা পর্যন্ত উঠল না। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দিশাহারা গলায় বলল, একটা ভুল করে ফেলেছি।
মিলি বলল, প্রেসার মাপার যন্ত্র ফেলে এসেছেন। তাই না?
জ্বি। তাহলে আজ বরংচ চলে যান। বাবার শরীর যদি খারাপ হয় আপনাকে খবর দেব।
আমি বরং এক দৌড়ে নিয়ে আসি। যাব আর আসব।
তেমন ইমার্জেন্সিতো না। ব্যস্ত হবার কিছুই নেই। আপনি সিঁড়ি ধরে ধরে নামুন। ঐ দিনের মত হওয়াটা ভাল হবে না।
মনসুর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা ঐ দিনকার ঘটনাটা ভুলতেই পারছে না। সামান্য দুর্ঘটনার বেশিতো কিছু না। দুর্ঘটনা মানুষের জীবনে ঘটে। না? সব সময়ই তো ঘটছে।
অতিরিক্ত সাবধানতার জন্যেই কি না কে জানে সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে মনসুরের নতুন জুতা ক্লিপ কাটল। অতি সহজেই মনসুর নিজেকে সামলাতে পারত। কিন্তু সে কেন জানি মিলির মুখের দিকে তাকাতে গেল আর তখনি রেলিং-এ ধরে রাখা হাত ফসকে গেল। সে গড়িয়ে পড়ে গেল নিচে। আজ ঐ দিনের চেয়েও ভয়াবহ শব্দ হল।
সোবাহান সাহেব, ফরিদ, কাদের এবং রহিমার মা ছুটে এল। সোবাহান সাহেব বললেন, কি ব্যাপার? মিলি বলল, ডাক্তার সাহেব পড়ে গেছেন।
ফরিদ বিস্মিত গলায় বলল, কোন ডাক্তার ঐ দিনকার পাগলা ডাক্তার?
মিলিকে ঐ প্রশ্নের জবাব দিতে হল না। মনসুর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, একেবারেই ব্যথা পাইনি।
ফরিদ বলল, আপনি ব্যথা পেয়েছেন কি পাননি এটা আমার জিজ্ঞাসা নয়। আমি জানতে চাচ্ছি। আপনাদের ডাক্তারী শাস্ত্রে আছাড়া, খাওয়া রোগ নামে কোন রোগ আছে কি না? যদি থেকে থাকে তাহলে সেই রোগের চিকিৎসা আছে, না সেটা দুরারোগ্য ব্যধি?
মনসুরের মনে হল ইনি রসিকতা করছেন। অপমানজনক পরিস্থিতিতে রসিকতা খুবই ভাল জিনিস। সবাই মিলে এক সঙ্গে হেসে উঠলে ব্যাপারটা হালকা হয়ে যায়। সবাই হেসে উঠবে এই ভেবে মনসুর উচ্চস্বরে হাসল। আশ্চর্য অন্য কেউ তার সঙ্গে হাসছে না। বরংচ কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। নির্যাৎ তাকে পাগল ভাবছে।
ধারণা ভদ্রলোকের ব্রেইন ফাংশান করছে না। এই যে ভাই ডাক্তার সাহেব, আপনি কাদেরের সঙ্গে যান। সপ্তাহখানেক বেড রেস্টে থাকবেন। বিশ্রামের মত ভাল জিনিস আর কিছু নেই। সব চিকিৎসার সেরা চিকিৎসা হচ্ছে বিশ্রাম।
নিরিবিলি বাড়ির দুজন সদস্য রাতের খাবার খেতে বসেছে। ফরিদ এবং মিলি। মিনু বেশির ভাগ সময় রাতে খান না। আজও খাবেন না। বাকি শুধু সোবাহান সাহেব। ফরিদ এবং মিলি প্লেটে ভাত নিতে নিতে সোবাহান সাহেব এসে পড়লেন। ফরিদ হাসি মুখে বলল, কেমন আছেন দুলাভাই?
সোবাহান সাহেব অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন।
কথা বলছেন না কেন দুলাভাই? রাগ করলেন না কি?
চুপচাপ খাওয়া দাওয়া কর। আমাকে বিরক্ত করবে না।
খাওয়ার টেবিল হচ্ছে সামাজিকভাবে মেলামেশার একটা স্থান। নিঃশব্দে খাওয়া দাওয়া করে উঠে যাওয়া খাবার টেবিলের উদ্দেশ্য নয়।
চুপ কর।
এত ভাল যন্ত্রণা হল দেখি–কিছু বললেই চুপ কর। আপনার সমস্যাটা কি?
মিনু লেবু দিতে এসে বললেন, চুপচাপ খেয়ে বিদেয় হ ফরিদ। ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না। ফরিদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। গল্প গুজব করে খাওয়া দাওয়া করতে তার ভাল লাগে। দুলাভাই টেবিলে থাকলে তা সম্ভব হয় না। সোবাহান সাহেব মিনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আজও ইলিশ? পর পর তিন দিন ইলিশ হয়ে গেল না?
