আমি ছদ্মনামে লিখি।
ছদ্মনামটা কি?
আপনাকে বলতে চাচ্ছি না। ছদ্মনাম গ্রহণের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেকে আড়াল করা। যদি বলেই ফেলি। তাহলে শুধু শুধু আর ছদ্মনাম নিলাম কেন?
তুমি কি লেখা?
আনিস লক্ষ্য করল এই ভদ্রলোক হঠাৎ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন এবং নিজে তা বুঝতে পারছেন না।
এইটি ভাল লক্ষণ। আনিস বলল, গল্প, উপন্যাস। এসব লিখি। একটি প্ৰবন্ধের বই আছে। কেউ সেই বই পড়ে না।
আমার বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছা তোমার কেন হল?
শুনেছি আপনি ভাড়া খুব কম নিতেন। এ্যাডভান্সের ঝামেলা ছিল না। তাছাড়া বাড়িটাও আমার পছন্দ হয়েছে।
তুমি কি ব্যাচেলার?
জ্বি না। আমার দুটি বাচ্চা আছে।
দেশের সমস্যা নিয়ে কি তুমি ভাব?
আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।
এই যে দেশে অসংখ্য সমস্যা এসব নিয়ে কখনো ভাব?
কোন সমস্যার কথা বলছেন?
সব রকম সমস্যা।
জ্বি-না, ভাবি না।
তুমি একজন লেখক মানুষ, তুমি এসব নিয়ে ভাব না? তুমি কি রকম লেখক?
খুবই বাজে ধরনের লেখক।
তুমি এখন যেতে পার। তোমাকে বাড়ি ভাড়া দেব না।
দেবেন না?
না। তোমাকে আমার পছন্দ হয় নি।
আপনাকেও আমার পছন্দ হয় নি। তবে আপনার বাড়ি পছন্দ হয়েছিল।
আমাকে পছন্দ না হবার কারণ?
আপনি হচ্ছেন এক শ্রেণীর পয়সাওয়ালা অকৰ্মণ্য বৃদ্ধ। যারা দেশের সমস্যা নিয়ে ভাবে এবং মনে করে এই ভাবনার কারণে সে অনেক বড় কাজ করে ফেলছে। এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পায়। আসলে আপনার এসব চিন্তা ভাবনা অর্থহীন এবং মূল্যহীন। আপনার যা করা উচিত তা হচ্ছে— রগরগে থ্রীলার পড়া। মাঝে মাঝে দান দক্ষিণ করা যাতে পরকালে সুখে থাকতে পারেন। ইহকাল এবং পরকাল দুটিই ম্যানেজ করা থাকে বলে।
অভদ্র ছোকরা। স্টপ। স্টপ।
আপনি খুব বেশি রেগে যাচ্ছেন। আপনার প্রেসার ট্রেসার নেইতো? প্রেসার থাকলে সমস্যা হয়ে যেতে পারে।
বহিস্কার। বহিস্কার। এই মুহুর্তে বহিস্কার।
সোবাহান সাহেব প্ৰচণ্ড চিৎকার করতে লাগলেন। মিলি বারান্দায় ছুটে এল। চোখ বড় বড় করে বলল, কি হয়েছে?
এই ছোকরাকে ঘাড় ধরে বের করে দে। ফাজিলের ফাজিল, বিদের বদ।
মিলি কড়া গলায় বলল, আপনি বাবাকে কি বলেছেন?
আনিস অবস্থা দেখে পুরোপুরি হকচকিয়ে গেছে। কিছু একটা বলতে গিয়েও সে বলতে পারল না। মিলি বলল, প্লীজ আপনি এখন কথা বলে আর ঝামেলা বাড়াবেন না। চলে যান। আনিস গেট পার হয়ে চলে যাবার পর সোবাহান সাহেব বললেন, কাদের বাসায় আছে?
মিলি বলল, আছে।
কাদেরকে বল ঐ ছোকরাকে ধরে আনতে।
বাদ দাও না বাবা। আর কেন?
যা করতে বলছি কর।
ভদ্রলোক কে?
আমাদের নতুন ভাড়াটে।
তোমার কথা বুঝলাম না বাবা।
তিনতলার ঘর দুটা তার কাছে ভাড়া দিয়েছি। ছোকরাকে আমার পছন্দ হয়েছে। ছোকরার মাথা পরিষ্কার।
কাদের আনিসকে আনতে গেল। সোৱাহান সাহেব নিজেই দোতলার ছাদে উঠলেন ঘর দুটির অবস্থা দেখার জন্যে। অনেক দিন তালাবন্ধ হয়ে আছে।
দুটি ঘর। একটা বাথরুম, রান্নাঘর। ছোট পরিবারের জন্যে খুব ভালই বলতে হবে। ঘর দুটির সামনে বিশাল ছাদ। ছাদে অসংখ্যা টব, টবে ফুলের চাষ হচ্ছে। মিলির শখ।
মিনু ছাদে উঠে এলেন। তার মুখ থমথমে। কিছুক্ষণ আগে মিলির কাছে তিনি বাড়ি ভাড়া দেবার খবর শুনেছেন। রাগে তার গা জুলে যাচ্ছে।
তুমি নাকি ছাদের ঘর দুটি ভাড়া দিচ্ছ?
হ্যাঁ।
কাকে দিলে?
নামটা মনে আসছে না। ফাজিল ধরনের এক ছোকরা।
বাড়ি ভাড়া দেয়া কি খুব দরকার ছিল?
না।
তাহলে, বাড়ি ভাড়া দিলে কেন?
আমার দরকার ছিল না, কিন্তু ঐ ফাজিলের দরকার ছিল।
তুমি হুট করে একেকটা কাজ কর আর সমস্যা হয়।
সোবাহান সাহেবের মেজাজ। চট করে খারাপ হয়ে গেল। তিনি থমথমে গলায় বললেন, আমি সমস্যার সৃষ্টি করি?
মিনু চুপ করে গেলেন। সোবাহান সাহেব চাপা গলায় বললেন, আমার জন্য কারোর কোন সমস্যা হোক তা আমি চাই না।
এই বলেই তিনি নিচে নেমে গেলেন। মিনু গেলেন পেছনে পেছনে।
একতলার বারান্দায় আনিস দাঁড়িয়ে আছে। কাদের তাকে নিয়ে এসেছে। আনিস খানিকটা শংকিত বোধ করছে। বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে আবার ডেকে আনার অর্থ সে ঠিক ধরতে পারছে না। সোবাহান সাহেব তার কাছে এসে দাঁড়ালেন এবং শুকনো গলায় বললেন, এসেছ?
আনিস বলল, জ্বি। আপনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
সোবাহান সাহেব বললেন, তোমাকে বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে না। এটা বলার জন্যে ডেকে পাঠিয়েছি।
সেতো একবার বলেছেন।
আবার বললাম, আবার বলায় তো দোষের কিছু নেই।
জ্বি না নেই। দ্বিতীয়বার বলাটা ভাল হয়েছে। এখন কি আমি যেতে পারি?
হ্যাঁ যাও।
স্লামালিকুম।
আনিস গেটের বাইরে বেরুতেই মিনু বললেন, কাদের যা ভদ্রলোককে ডেকে নিয়ে আয়।
কাদের সোবাহান সাহেবের দিকে তাকাল। তিনি কিছু বললেন না। মিনু বলল, দাঁড়িয়ে আছিস কেন যা। কাদের বিমর্ষ মুখে বের হল। বড় যন্ত্রণায় পড়া গেল।
আনিস বড় রাস্তা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কাদের সেখানেই তাকে ধরল, নিষ্প্রাণ গলায় বলল, আপনেরে বুলায়।
আনিস বলল, ঠাট্টা করছি?
জ্বি না। আবার যাইতে বলছে।
আবার যাব?
যাইতে ইচ্ছা না হইলে যাইয়েন না। আমারে খবর দিতে কইছে। খবর দিলাম। যাওন না যাওন আফনের ইচ্ছা।
নাম কি তোমার?
আমার নাম মোহাম্মদ আব্দুল কাদের। সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল কাদের।
সৈয়দ নাকি।
জ্বি। বোগদাদী সৈয়দ।
বল কি? বোগদাদী সৈয়দ যখন খবর নিয়ে এসেছে তখন তো যেতেই হয়।
আনিস তৃতীয়বারের মত নিরিবিলি বাড়ির বারান্দায় এসে উঠল। সোবাহান সাহেব তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, কাদের ভদ্রলোককে তিনতলার ঘর দুটার চাবি এনে দে।
