তুষের বালিশে মাথা রেখে মাদুরের ওপর শোয় ফজল। খুব একটা খারাপ লাগছে না। ছেঁড়া কলাপাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সাদা মেঘ, কালো মেঘ উড়ে যাচ্ছে। মেঘ সরে গেলে উঁকি দেয় রোদ। মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাঁপটায় ফেটে যাচ্ছে ছই-এর কলাপাতা।
দক্ষিণ দিক থেকে চিট-চিট-চিট পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ফজল মাথা উঁচু করে। পাটগাছের ভেতর দিয়ে দৃষ্টি চলে তার। সে দেখতে পায়–কিছু দূরে পাটগাছের সাথে বাসা বুনছে বাবুই পাখি। এ পাটখেতের পরেই ধানখেত। আউশ ধান পাকার সময় হয়েছে– বুঝতে পারে ফজল।
আউশ ধান পাকার সময় হলে আসুলি এলাকার তাল-বাবলা গাছের বাসা ছেড়ে ঝাঁক বেঁধে এগুলো আসে। দূর থেকে আসা-যাওয়ার সময় নষ্ট হয়, ডানায় ব্যথা ধরে, পেটের দানাও যায় হজম হয়ে। তাই ধানখেতের কাছাকাছি কোনো পাটখেতে এরা অস্থায়ী বাসা তৈরি করে। শুধু চর অঞ্চলেই নয়, আসুলির বিল অঞ্চলেও এরা ধান পাকার সময় এ রকম অস্থায়ী বাসা তৈরি করে।
ফজল ভাবে, সময়ের মূল্য এ ছোট পাখিগুলোও বোঝে। তাই ওরা তাদের মতোই তৈরি করছে ভাওর ঘর।
শুক্লা সপ্তমীর চাঁদ ডুবে গেছে। ফজল পাটখেত থেকে বেরোয়। এগিয়ে যায় নদীর দিকে। নদীর পাড়ের ধানখেতে ডুবিয়ে রাখা ডিঙিটা তুলে সে চরাটের ওপর বৈঠা নিয়ে বসে। চারদিকটা ভালো করে দেখে নেয়। টহলদার কলের নৌকার সন্ধানী আলো দেখা যায় না কোথাও। এ কলের নৌকার ভয়ে রাতে নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধ। জেলেরাও সন্ধ্যার আগেই জাল গুটিয়ে কোনো নিরাপদ ঘেঁজায় পাড়া গেড়ে বিশ্রাম নেয়।
ফজল নলতার খাড়ি ধরে বেয়ে নিয়ে যায় ডিঙিটাকে।
টুকরো টুকরো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। যেন ধোপার কাপড় শুকোবার মাঠ। মেঘের ফাঁক দিয়ে তারা উঁকি মারছে। দিনের দুপুর থেকে রাতের দুপুর পর্যন্ত দাপাদাপি করে বাতাসের ডানা এখন ক্লান্ত। ক্রান্তি নেই শুধু পানির। গা দুলিয়ে নেচে নেচে কুলকুল গান গেয়ে অবিরাম বয়ে যাচ্ছে পানি। রুপালি পানির আভাস পাওয়া যাচ্ছে অন্ধকারেও।
উজান ঠেলে ধীরগতিতে চলছে ডিঙি। নিজের বৈঠার শব্দের সাথে তাল রেখে চলছে ফজলের হৃদস্পন্দন।
যে কাজের জন্য সে বেরিয়েছে, তার পরিকল্পনা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। এখন ডিঙিটাকে পেছনে ফেলে তার মন পৌঁছে গেছে ঘটনাস্থলে ।…উত্তর ভিটির এ ঘরে থাকে আরশেদ মোল্লা। ব্যাটা জানোয়ার! কোনো দয়ামায়া নেই তোর জন্য। বাইরে থেকে দে শিকল এঁটে দুটো দরজায়। জানোয়ারটা বেরুতে পারবে না আর। চারদিকের বেড়ায় দে কেরোসিন ছিটিয়ে। ভয় কিসের? ম্যাচবাতির কাঠি জ্বালিয়ে দে আগুন!
ফজলের মনে দাউদাউ করে জ্বলছে ক্রোধের আগুন।
আগুন! আগুন! বাঁচাও! বাঁচাও!!
হঠাৎ অনেক মানুষের আর্ত চিৎকার ফজল শুনতে পায় তার নিজের মনে।
বাঁচাও! বাঁচাও!!
এ চিৎকার শুধু আরশেদ মোল্লার নয়। রূপজানের চিৎকারও যে শোনা যাচ্ছে। আগুন কি ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমভিটি ঘরেও? হ্যাঁ তাইতো! ঘরের লাগোয়া ঘর। শ-শ করে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন।
রূপজান!
একটা অস্ফুট চিৎকার দিয়ে চেতনা ফিরে পায় ফজল। তার বৈঠা টানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাল ছেড়ে দেয়ায় ঘুরে যাচ্ছিল ডিঙিটা।
ফজল ডিঙিটাকে ডানদিকে ঘুরিয়ে নেয়। কিছুদূর গিয়ে আরেকটা খাড়ির মধ্যে ঢোকে। ভাটির টানে এবার দ্রুত এগিয়ে যায় ডিঙি।
সব চক্রান্তের মূলে আছে পা-না-ধোয়া জানোয়ারটা। ওকেই খতম করতে হবে আগে। ওর সাথে পুড়ে মরবে ওর বউ-ছেলে-মেয়ে সব। যাক, পুড়ে ছাই হয়ে যাক, কালসাপের বংশ নির্বংশ হোক।
ডিঙিটাকে লটাঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে রেখে সে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়। চার ভিটিতে চারখানা ঘর। ঢেউটিনের চালা, পাতটিনের বেড়া। এ ঘরে আগুন লাগানো সহজ নয়। কপাট, চৌকাঠ, রুয়া-বাগা কাঠের। দরজা আর জানালার কপাটে লাগাতে হবে আগুন। গত বছর পাটের দাম কম ছিল। পাট নিশ্চয়ই বেচেনি জঙ্গুরুল্লা। ঘরে পাট থাকলে তো কথাই নেই। ফরফর করে জ্বলে উঠবে আগুন।
জঙ্গুরুল্লা কোন ঘরে থাকে–ফজলের জানা নেই। ঘরগুলোর সবকটা দরজা বাইরে থেকে শিকল এঁটে বন্ধ করে দেয় সে। বোতল থেকে হাতের তেলোয় কেরোসিন ঢেলে ছিটিয়ে দেয় কপাট-চৌকাঠগুলোয়। তারপর ম্যাচবাতির কাঠি জ্বালায় সে। জ্বলন্ত কাঠি-ধরা হাতটা তার এগিয়ে যায় কপাটের দিকে।
ওয়াঁ-আঁ–ওঁয়া-আঁ-আঁ।
শিশুর কান্না। ফজলের হাতটা থেমে যায়। বুকটা কেঁপে ওঠে। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এসে নিবিয়ে দেয় কাঠির আগুন।
ওয়াঁ-আঁ–ওঁয়া-আঁ-আঁ।
অসংখ্য নিষ্পাপ শিশুর কান্না প্রতিধ্বনি তোলে তার বুকের ভেতর। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই একটা জানালা।
ঘরের ভেতর হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। সে কুপির আলোয় দেখতে পায় একটি তরুণী মা শিশুর ভিজে কাঁথা বদলে দিচ্ছে।
ওয়াঁ-আঁ–ওঁয়া-আঁ-আঁ।
আবার সেই কান্না। ফজলের অভিভূত দৃষ্টির সামনে মা ও শিশু। মা কোলে তুলে নিয়েছে শিশুকে। বুকের কাপড় সরিয়ে স্তনের বোঁটা শিশুর মুখে দিতেই তার কান্না থেমে যায়। নিষ্পাপ শিশু নিশ্চিন্ত আরামে স্তন চুষছে আর হাত-পা নাড়ছে।
ফজল আর দেরি করে না। সে সব কটা দরজার শিকল খুলে দিয়ে নিঃশব্দে ফিরে যায় নদীর ধারে। তারপর লটা ঝোঁপের আড়াল থেকে ডিঙিটা বের করে সে বৈঠায় টান মারে।
