কই গেলেন বেয়াইসাব? এরফান মাতব্বরের গলা।
আরশেদ মোল্লা খাটো গলায় বলে, ঐ যে আইয়া পড়ছে! আমি গেলাম।
আরশোদ মোল্লা বাড়ির পেছন দিক দিয়ে সটকে পড়ে।
বেয়াইসাব কই? আবার হাঁক দেয় এরফান মাতব্বর। আরে–আরে–আরে! গরুতে ক্যালার ড্যামগুলা খাইয়া ফালাইল। কই গেলেন মোল্লাসাব?
এরফান মাতব্বর তার হাতের লাঠি উঁচিয়ে হেঁই হাঁট-হাট করে গরুগুলোকে তাড়া দেয়।
রূপজানের মা সোনাভান ওরফে সোনাইবিবি মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে আসে গরু বাঁধবার জন্য।
আসলামালেকুম বেয়ানসাব। কেমন আছেন?
আল্লায় ভালোই রাখছে।
মোল্লাসব কই?
উনি হাট করতে গেছে দিঘিরপাড়।
হাট করতে গেছে! তয় এই মাত্র গরু নাওয়াইতে দ্যাখলাম কারে?
হ উনিই। ঐ পুবের বাড়ির তারা হাটে যাইতে আছিল। তাই ত্বরাত্বরি গিয়া ওঠছে তাগো নায়। গরু বান্ধনেরও অবসর পায় নাই।
সোনাইবিবি গরু বাঁধবার জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু গরুর শিং নাড়া দেখে সে ভয়ে পিছিয়ে আসে। তার মাথার ঘোমটা পড়ে যায়, নাকের দোলায়মান সোনার চাঁদবালিটা চিকমিকিয়ে ওঠে।
মাতব্বর বলে, আপনে পারবেন না। আমি আমার গাবুররে ডাক দিতে আছি। ওরে একাব্বর, এই দিগে আয়। গরুগুলারে গোয়ালে বাইন্দা রাখ।
মাতব্বর বেঠকখানায় গিয়ে চৌকির ওপর বসে। তার প্রশ্ন এড়িয়ে অন্দরে চলে যেতে পারেনা সোনাইবিবি। সে অন্দরমুখি দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে মাতব্বরের সাথে কথা বলছে।
বউমা কই, বেয়ান সাব? নাইতে গেছে।
আইজ বউমারে নিতে আইছি। একটা মাত্র পুতের বউ আমার। বউ বাড়িতে না থাকায় বাড়ি-ঘর আমার আন্দার অইয়া রইছে।
আপনেরা আমাগ মাইয়ার মোখৃখান যে আন্দার কইর্যা থুইছেন হেই কথাতো কন্ না। মাইয়ার গয়নাগুলারে বেবাক–
গয়নার কথা কেন? এই দ্যাহেন, বেবাক গয়না ছাড়াইয়া আনছি।
গয়নার পুটলিটা উঁচু করে দেখায় মাতব্বর। তারপর আবার বলে, বউমারে ডাক দ্যান। তার গয়না তার আতে বুঝাইয়া দিমু আইজ।
কিছুক্ষণ পর রূপজান আসে। শ্বশুরের কদমবুসি করে সে দাঁড়ায় তার কাছে।
মাতব্বর বলে, তোমার এই বুড়া পোলার উপরে রাগ অইয়া রইছ মা? এই দ্যাহো। মাতব্বর। গয়নার পুটলি খোলে। এই নেও মা, তোমার গলার হার। নেও, গলায় দ্যাও। শরম কিয়ের?
হারটা গলায় পরে রূপজান।
আর এই ধরো কানের মাড়িজোড়া। কানে দ্যাও মা, কানে দ্যাও। তুমি তো জানো মা, কেমুন বিপাকে পইড়া গেছিলাম। তা না অইলে কি আমার মা-র গয়না বন্দুক দেই আমি? কানে দিছ মা? হ্যাঁ এইতো এহন কেমুন সোন্দর দেহা যায় আমার মা-লক্ষ্মীরে।
একজোড়া অনন্ত ও ছয়গাছা চুড়িসহ পুটলিটা রূপজানের দিকে এগিয়ে দিয়ে মাতব্বর আবার বলে, এই নেও মা। কিছু থুইয়া আহি নাই। বেবাক ছাড়াইয়া আনছি। আর দ্যাহো, কেমুন চকমক-ঝকমক করতে আছে। সবগুলারে পালিশ করাইয়া আনছি।
রূপজানের গয়না পরা হলে মাতব্বর বলে, এইতো এহন আমার মা-র মোখখান হাসি খুশি দ্যাহা যায়। আর এই নেও শাড়ি। দ্যাহো কী সোন্দর গুলবদন শাড়ি। যাও মা শাড়ি পিন্দা তোমার মা-র কদমবুসি করো গিয়া। আর জলদি কইর্যা তৈয়ার অইয়া নেও।
সোনাইবিবি দরজার আবডালে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলে, কর্তা বাড়িতে নাই। খালি বাড়িরতন মাইয়া দেই ক্যামনে?
কর্তা নাই, কর্তানি তো আছে। যান বেয়ানসাব, বউমারে সাজাইয়া-গোজাইয়া দ্যান।
উনি বাড়ি না আইলে তো মাইয়া দিতে পারমু না।
উনি কোন সুম আইব, তার তো কোনো ঠিক নাই!
হ, হাটে গেছে, আইতে দেরি অইব। আপনে আর একদিন আইয়েন।
আর একদিন আর আইতে পারমু না। আইজই বউ লইয়া বাড়িত যাওন চাই। এইখানে এই পাড়া গাইড়া বইলাম আমি। যান, খাওনের যোগাড় করেন। পালের বড় মোরগাড়া জবাই করেন গিয়া।
.
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা। কিন্তু এখনো বাড়ি ফিরে এল না আরশেদ মোল্লা। চৌকির ওপর শুয়ে বসে বিরক্তি ধরে গেছে এরফান মাতব্বরের। অস্বস্তিতে ছটফট করে সে। এর মধ্যে রূপজান তামাক সাজিয়ে দিয়ে গেছে বার কয়েক। প্রত্যেক বারই তাকে জিজ্ঞেস করেছে মাতব্বর, কি মা, তোমার বাজান আইছে?
অধৈর্য হয়ে ওঠে রূপজানও। সে বার বার ছাঁচতলায় গিয়ে নদীর দিকে তাকায়। কিন্তু তার বাজানকে দেখা যায় না কোনো নৌকায়। তার ব্যাকুলতার কাছে হার মানে লজ্জা সঙ্কোচ। সে মা-কে বলে, মা, বাজান এহনো আহেনা ক্যান?
উনির আহন দিয়া তোর কাম কি?
দ্যাহো না, মিয়াজি যাওনের লেইগ্যা কেমুন উতলা অইয়া গেছে।
তোর মিয়াজি উতলা অইছে, না তুই উতলা অইছস?
লজ্জায় মাথা নত করে রূপজান। মেয়ের দিকে চেয়ে মায়ের মন ব্যথায় ভরে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সে।
রূপজানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সে বলে, আমি আর কী করতে পারি, মা। তোর বাপ বেবুঝ, গোঁয়ার। আমার কোনো কথা কানে লয় না।
যেই গয়নার লেইগ্যা আমারে আটকাইছে, হেই গয়না তো বেবাকই দিছে আবার। বাজান বাড়িত থাকলে যাইতে মানা করত না। তুমি মিয়াজিরে কও আমারে লইয়া যাইতে।
কোন্ ডাকাইত্যা কথা কস, মা। উনির হুকুম ছাড়া তোরে যদি এহন যাইতে দেই, তয় কি আমারে আস্ত রাখব! কাইট্যা কুচিকুচি কইর্যা গাঙে ভাসাইয়া দিব না!
যদি যাইতে না দ্যাও, তয় গয়নাগুলা রাখবা কোন মোখে? এগুলা ফিরাইয়া দেই?
ফিরাইয়া দিবি ক্যান্? উনি বাড়িত আহুক। ওনারে বুঝাইয়া-সুজাইয়া তোরে পাড়াইয়া দিমু একদিন।
