ওসমানী প্রেসিডেন্টকে আড়াল করে খালেদ মোশাররফকে বললেন, খালেদ, তুমি ব্যবস্থা নাও। আর রক্তপাত না। প্লিজ।
খালেদ বললেন, আমি নিজেও রক্তপাত চাচ্ছি না।
খালেদের ইশারায় শাফায়েত জামিল অস্ত্র নামিয়ে বললেন, আপনারা খবর পেয়েছেন কি না আমি জানি না। সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া মেজর রউফের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে পেনশন চেয়েছেন। কাগজপত্র আমার সঙ্গে আছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করুন এবং খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমকে সেনাপ্রধান করার ব্যবস্থা করুন।
এতক্ষণ প্রেসিডেন্টের মুখ রক্তশূন্য ছিল, এখন কিছুটা রক্ত ফিরে এল। তিনি বললেন, হুট করে কাউকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করা যায় না। মন্ত্রিসভায় ২৬ জন মন্ত্রি আছে। তাদের অনুমোদন লাগবে।
শাফায়েত জামিল আবার অস্ত্র তাক করতেই খন্দকার মোশতাক বিড়বিড় করে বললেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন একটা ফর্মালিটি ছাড়া কিছু না। খালেদ মমাশাররফের সেনাপ্রধান হতে আমি কোনো বাধা দেখি না। মুক্তিযুদ্ধের একজন মহাবীর বাংলাদেশের সেনাপ্রধান—ভাবতেই ভালো লাগছে।
মন্ত্রী পরিষদের সভায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হলো এবং তাঁকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হলো। তার কাধে জেনারেলের ব্যাজ পরিয়ে দিলেন এয়ার মার্শাল তোয়ব এবং এডমিরাল এম এইচ খান।
এই দিনে দু’টি বিশেষ ঘটনাও ঘটে। ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসির মিলিটারি অ্যাটাচি ব্রিগেডিয়ার ভোরা খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে আসেন। তিনি গিফট র্যাপে মোড়া উপহারের একটি প্যাকেটও নিয়ে আসেন। ব্রিগেডিয়ার ভোরার শুভেচ্ছা উপহারের ব্যাখ্যা করা হলো অন্যভাবে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান একটি ভারতীয় পরিকল্পনা। খালেদ মোশাররফের হাত ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনী ঢুকল বলে।
ব্রিগেডিয়ার ভোরার সৌজন্য সাক্ষাতের চেয়ে বড় ঘটনা হলো, ওইদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি মিছিল বের হয়। মিছিল শেষ হয় ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। মিছিলের নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফের মা।
খালেদ মোশাররফের এক বোন আমার মা’র (বেগম আয়েশা ফয়েজ) পরিচিত। তিনি প্রায়ই আমাদের বাবর রোডের বাসায় আসতেন। ওই মহিলার কারণেই হয়তোবা আমার মা মুজিব দিবস পালনের বিষয়টা জানতেন। তিনি তাঁর ছেলেদের কিছু না জানিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। হয়তোবা তিনি ধারণা করেছিলেন ছেলেরা বিষয়টা পছন্দ করবে না। একটা বয়সের পর বাবা-মা নিজ সন্তানদের ভয় পেতে শুরু করে। সম্ভবত মা’র তখন সেই বয়স চলছিল।
ওইদিনের মিছিলটি ছিল খালেদ মোশাররফের মৃত্যুর ঘণ্টা। মিছিল দেখে লোকজন আঁতকে উঠল। তারা ধারণা করল, খালেদ মোশাররফ ভারতের চর। (দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দেশে তখন ভারতবিদ্বেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কারও মনেই নেই মনে রাখার চেষ্টা নেই যে, আমাদের স্বাধীনতার পেছনে হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিকের জীবনদানের মতো ঘটনা ঘটেছে।)।
দেশে ব্যাপক প্রচারণা চলতে লাগল, লিফলেট বিলি হতে লাগল—খালেদ মোশাররফের হাত ধরে বাকশাল ফিরে আসছে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ফিরে আসছে। বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে ভারতের এক করদ রাজ্য।
রাত এগারটা। সেনাপ্রধানের ফ্ল্যাগ কার অবন্তিদের বাড়ির সামনে দাঁড়ানো। গাড়ির আগে ও পেছনে সেনাপ্রধানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সশস্ত্র সৈন্যদের দুটি মিলিটারি পিকআপ।
দরজা খুলল অবন্তি। অবাক হয়ে বলল, চাচা! আপনি?
খালেদ মোশাররফ বললেন, আমার রাজকন্যা মা, কেমন আছ?
আমি ভালো আছি চাচা। দাদাজান আপনাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করছিলেন। আপনি ভালো আছেন তো?
হ্যাঁ। আমি যে এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান, এই খবর কি জানো?
না তো!
রেডিওতে এখনো খবর যায় নাই। কাল ভোরে চলে যাবে। খুব ঝামেলায় ছিলাম বলে তোমার মাছের দাওয়াতে আসতে পারি নি। মাছ কি ফ্রিজে কিছু তোলা আছে?
আছে।
তাহলে মাছ গরম করতে বলে। আমি দুপুর থেকে কিছু খাই নি। তোমার দাদাজান কি ঘুমাচ্ছেন?
হ্যাঁ। তার শরীর খারাপ। জ্বর এসেছে। ঘুম ভাঙাব? ডেকে তুলি?
না। উনার বয়েসী মানুষের কাঁচা ঘুম ভাঙলে সমস্যা। বাকি রাত আর ঘুম হবে না। আমি নিজে প্রচণ্ড ঝামেলায় আছি। তারপরেও তোমার কাছে ছুটে এসেছি কেন, কারণটা শোনো। তোমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।
অবন্তি বলল, আমি মারা গেছি, এরকম?
না। কারোর মৃত্যু দেখা তো ভালো স্বপ্ন। দিনের বেলা একসময় এসে স্বপ্ন বলে যাব। তুমি সেইভাবে ব্যবস্থা নিয়ো। আমি যা স্বপ্নে দেখি তা-ই হয়।
খালেদ মোশাররফ আরাম করে মাছ খাচ্ছেন। তিনি আনন্দিত গলায় বললেন, আজকের খাওয়াটা আমার কাছে কেমন লাগছে জানতে চাও?
চাই।
মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার সাতাশ ঘণ্টা পর প্রথম খাবার খাই। দরিদ্র এক কৃষক, নাম মিজান মিয়া। আমরা সাতজন ক্ষুধার্ত মানুষ। মিজান মিয়া খাবার দিল—গরম ধোয়াওঠা ভাত, মাষকালাইয়ের ডাল, পিয়াজ আর কাঁচামরিচ। অমৃতও এত স্বাদ হবে বলে আমি মনে করি না। খাবারটা খেয়েছিলাম মে মাসের ৯ তারিখে। ওই দিনটা আমি ঘোষণা করেছি মাষকালাই দিবস’ হিসাবে। ওই দিন রাতে তোমার চাচি আমার জন্যে মাষকালাইয়ের ডাল রান্না করে। মোটা চালের ভাত রান্না হয়। আমি তৃপ্তি করে মাটির সানকিতে খাই। তোমার আজকের রান্না ওই দিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। নভেম্বরের চার তারিখকে আমি পাঙ্গাস দিবস’ ঘোষণা করলাম। প্রতি বছর এই দিনে আমি পাঙ্গাস মাছ দিয়ে ভাত খাব।
