অবন্তি বলল, চাচা, আমি কি আপনাকে একটি অন্যায় অনুরোধ করতে পারি?
পারো।
আমার স্যার শফিক সাহেব জেলহাজত থেকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিটা পড়ে দেখুন। চিঠি পড়লেই হবে। আমি আলাদা করে কিছু বলব না।
খালেদ মোশাররফ বললেন, তোমার স্যার খুবই সাহসী মানুষ। পনেরই আগস্টে একা মিছিল বের করে স্লোগান দিচ্ছিল–মুজিব হত্যার বিচার চাই।
অবন্তি বিস্মিত হয়ে বলল, এই ঘটনা আমি জানতাম না তো!
খালেদ মোশাররফ বললেন, সাহসী মানুষ আমি খুব পছন্দ করি। কেন জানো?
আপনি নিজে সাহসী, এইজন্যে।
না। কারণ সাহসী মানুষেরা একবারই মারা যায়। ভীতুরা মৃত্যুর আগেই বহুবার মারা যায়। ‘Cowards die many times before their death.’ বলো দেখি কার লাইন?
শেকসপীয়ার।
খালেদ মোশাররফ শফিকের লেখা চিঠিটা ভুরু কুঁচকে পড়লেন। চিন্তিত গলায় বললেন, খুনের আসামিকে হুট করে জেলহাজত থেকে ছাড়িয়ে আনা যায় না। মা, তোমাকে বুঝতে হবে যে, দেশে আইনকানুন আছে।
অবন্তি বলল, আইনকানুন থাকলে জেলখানার ভেতর চার নেতাকে খুন করা হয় কীভাবে? খালেদ মোশাররফ বললেন, তাও তো ঠিক। দেশে আইনকানুন ছিল না। তবে এখন হবে।
প্রেসিডেন্ট মোশতাক তার কাঙ্ক্ষিত দেশত্যাগ করেছেন। বিচারপতি সায়েমের কাছে দায়িত্ব দিয়ে আগামসি লেনের বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন। শেষ হয়েছে তার আশি দিনের শাসন। তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন ভোরবেলায়, ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেন পাঁচ তারিখ মধ্যরাতে।
জেলহাজতে শফিক কম্বলের ওপর কুকুরকুণ্ডলি অবস্থায় ঘুমাচ্ছিল।
হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। সে আতংকে অস্থির হয়ে চেঁচাতে লাগল—আবার পাগলাঘণ্টি বাজে। আবার পাগলাঘণ্টি!
সবাই তাকে বোঝনোর চেষ্টা করল, পাগলাঘণ্টি বাজছে না। হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছে।
শফিক বলল, ঘণ্টা বাজছে। আমি পরিষ্কার শুনেছি। এখনো ঘণ্টা বাজছে। ঢং ঢং ঢং।
শফিক হাঁপাচ্ছে। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। শফিক তখনো জানে না খালেদ মোশাররফ তার মুক্তির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি রমনা থানাকে কঠিন নির্দেশ দিয়েছেন—শফিক নামের মানুষটা যদি নির্দোষ হয় তাকে যেন অতি দ্রুত মুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।
খালেদ মোশাররফ তখনো জানেন না তার নিজের সময় ফুরিয়ে এসেছে। ক্ষমতার দাবাখেলায় তিনি হেরে গেছেন। উঠে এসেছেন জিয়াউর রহমান। নিয়তি তার ওপর প্রসন্ন ছিল, নাকি তিনি নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করেছেন তা পরিষ্কার না।
জিয়াউর রহমান খবর পাঠালেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে। তিনি ব্যাকুল হয়ে জানালেন, বন্ধু, আমাকে উদ্ধার করো।
কর্নেল তাহের বন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিলেন। জিয়ার মুক্তির বিষয় ত্বরান্বিত হলো, কারণ সাধারণ সৈনিকেরা ছিলেন তার পক্ষে। তারা শুরু করলেন সিপাহি বিপ্লব। তারা ক্যান্টনমেন্ট কাঁপিয়ে তুললেন স্লোগানে।
‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই
হাবিলদারের উপর অফিসার নাই।’
অফিসাররা সিপাহিদের হাতে মারা পড়তে লাগলেন। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে গেল। সিপাহিদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে অফিসাররা পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন।
সাতই নভেম্বরের ভোরবেলা
সাতই নভেম্বরের ভোরবেলাটা অবন্তির কাছে অন্যরকম মনে হলো। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি, দমকা হাওয়া। ঢাকা শহর ডুবিয়ে দেবে এমন অবস্থা। হঠাৎ আসা বৃষ্টি হঠাৎ থেমে গিয়ে ঝকঝকে রোদ উঠল। সেই রোদ ভেজা গাছের পাতায় কী সুন্দর করেই না মিশে যাচ্ছে। অবন্তি শব্দ করে বলল, বাহ! ঢাকার নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সরফরাজ খান আতংকিত গলায় বললেন, কে কথা বলে? কে?
অবন্তি বলল, দাদাজান, আমি কথা বলেছি।
সরফরাজ বললেন, তুই না। তোর গলা আমি চিনি। পুরুষের গলা। হারামজাদাটা এসেছে? আসা-যাওয়া বন্ধ করতে হবে। He has no business here. বদের বাচ্চা বদ! মতলববাজ মতলব নিয়ে ঘুরছে।
দরজা খুলে সরফরাজ বের হলেন। এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। চাপা গলায় বললেন, বদটা কই?
অবন্তি বলল, কোন বদের কথা বলছ? হাফেজ জাহাঙ্গীর?
হুঁ।
সে আসে নি দাদাজান। আমি কথা বলছিলাম। তুমি আমার কথা শুনেছ। আমার ধারণা, তোমার জ্বর বেড়েছে। জ্বরের ঘোরে মাথা এলোমলো। যাও শুয়ে থাকো।
সরফরাজ খান বললেন, আমি পরিষ্কার বদটার গলা শুনলাম। ঢাকার আকাশে যুদ্ধ’–এইসব হাবিজাবি কথা বলছে।
হাবিজাবি কথা আমি বলছিলাম। আর দাদাজান শোনো, কথায় কথায় একজন মানুষকে বদ, বদের বাচ্চা এইসব বলবে না।
বদকে বদ বলব না?
অবন্তি বলল, হাফেজ জাহাঙ্গীর আর যা-ই হোক বদ না।
তুই বুঝে ফেলেছিস?
হ্যাঁ, বুঝে ফেলেছি। তুমি বিছানায় গিয়ে শোও, আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
সরফরাজ খান ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, আমার সেবা লাগবে না। তুই বদটার জন্যে তোর সেবা জমা করে রাখ। হাফেজ জাহাঙ্গীর এক বদ আর তুই এক বদনি।
অবন্তি বলল, ভালো বলেছ তো। বদ-বদনি। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বদবদনি।
সরফরাজ খান অবন্তির মুখের ওপর শব্দ করে দরজা বন্ধ করলেন। অবন্তি মগভর্তি চা নিয়ে ছাদে চলে গেল। সুন্দর একটা সকাল নষ্ট হতে দেওয়া ঠিক না।
ছাদের কামিনীগাছে গত রাতে ফুল ফুটেছে। ছাদভর্তি কামিনী ফুলের সুঘ্রাণ। মগে চুমুক দিয়ে অবন্তি বলল, বাহ্ কী অদ্ভুত গন্ধ! বলতে বলতেই তার চোখে পড়ল হাফেজ জাহাঙ্গীর আসছেন। কাকতালীয় ব্যাপার তো বটেই। দাদাজান হাফেজ জাহাঙ্গীরের কথা বললেন, সঙ্গে সঙ্গেই তার দেখা পাওয়া গেল। কে বলবে কেন এত ঘনঘন কাকতালীয় ব্যাপার ঘটে। হাফেজ জাহাঙ্গীরের হাতে বিশাল এক টিফিন ক্যারিয়ার। নিশ্চয়ই টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি উরসের খাবার। নভেম্বরের ছয় তারিখ উরস হওয়ার কথা। অবন্তি নিচে নেমে এল।
