এর পরপরই মেজর রশীদের আরেকটি ফোন পাই। তিনি আমাকে জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই জনৈক ক্যাপ্টেন মোসলেম জেলগেটে যেতে পারেন। তিনি আমাকে কিছু বলবেন। তাকে যেন জেল অফিসে নেওয়া হয় এবং ১. জনাব তাজউদ্দীন আহমদ, ২. জনাব মনসুর আলী, ৩. জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ৪. জনাব কামারুজ্জামান—এই ৪ জন বন্দিকে যেন তাকে দেখানো হয়।
এ খবর শুনে আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চাই এবং টেলিফোনে প্রেসিডেন্টকে খবর দেওয়া হয়। আমি কিছু বলার আগেই প্রেসিডেন্ট জানতে চান, আমি পরিষ্কারভাবে মেজর রশীদের নির্দেশ বুঝতে পেরেছি কি না। আমি ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি আমাকে তা পালন করার আদেশ দেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারজন সেনাসদস্যসহ কালো পোশাক পরা ক্যাপ্টেন মোসলেম জেলগেটে পৌঁছেন। ডিআইজি প্রিজনের অফিসকক্ষে ঢুকেই তিনি আমাদের বলেন, পূর্বোল্লিখিত বন্দিদের যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে তাকে নিয়ে যেতে। আমি তাকে বলি, বঙ্গভবনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আমাকে কিছু বলবেন। উত্তরে তিনি জানান, তিনি তাদের গুলি করবেন। এ ধরনের প্রস্তাবে আমরা সবাই বিমূঢ় হয়ে যাই। আমি নিজে এবং ডিআইজি প্রিজন ফোনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই। সে সময় জেলারের ফোনে বঙ্গভবন থেকে মেজর রশীদের আরেকটি কল আসে। আমি ফোন ধরলে মেজর রশীদ জানতে চান, ক্যাপ্টেন মোসলেম সেখানে পৌঁছেছেন কি না। আমি ইতিবাচক জবাব দেই এবং তাকে বলি, কী ঘটছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
ক্যাপ্টেন মোসলেম বন্দুকের মুখে আমাকে, ডিআইজি প্রিজন, জেলার ও সে সময় উপস্থিত অন্যান্য কর্মকর্তাদের সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যেখানে উপরোল্লিখিত বন্দিদের রাখা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও তার বাহিনীকে তখন উন্মাদের মতো লাগছিল এবং আমাদের কারও তাদের নির্দেশ অমান্য করার উপায় ছিল না। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী পূৰ্বোল্লিখিত চারজনকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করা হয় এবং একটি রুমে আনা হয়, সেখানে জেলার তাদের সনাক্ত করেন। ক্যাপ্টেন মোসলেম এবং তার বাহিনী তখন বন্দিদের গুলি করে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পর নায়েক এ আলীর নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদল সবাই মারা গেছে কি না তা নিশ্চিত হতে জেলে আসে। তারা সরাসরি সেই ওয়ার্ডে চলে যায় এবং পুনরায় তাদের মৃতদেহ বেয়নেট চার্জ করে।
স্বাক্ষর
এন জামান
মহা কারাপরিদর্শক
৫.১১.৭৫
নভেম্বরের চার তারিখ
নভেম্বরের চার তারিখ।
সকাল সাতটা।
চায়ের কাপ হাতে বঙ্গভবনে নিজের ঘর থেকে বারান্দায় এসেছেন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন। মাথায় নেহেরু টুপি, কাঁধে চাদর, এক হাতে পাইপ। (তিনি বঙ্গবন্ধুর মতো পাইপ টানতেন। একই তামাক এরিন মোর ব্যবহার করতেন।)
বারান্দায় তার সেক্রেটারি কুমিল্লা বার্ড-খ্যাত মাহবুবুল আলম চাষী চিন্তিত মুখে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। মোশতাক তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, সুপ্রভাত।
মাহবুবুল আলম চাষী বললেন, জি স্যার। সুপ্রভাত।
মোশতাক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হৃষ্ট গলায় বললেন, তুমি কি জানো একমাত্র আমিই শেখ মুজিবুর রহমানকে তুমি করে বলতাম?
জানতাম না স্যার। হঠাৎ এই প্রসঙ্গ কেন?
তোমাকে এতদিন আপনি করে বলেছি। আজ থেকে তুমি করে বলব।
অবশ্যই বলবেন। আপনাকে আনন্দিত মনে হচ্ছে। কারণটা কী বলবেন?
কারণ হচ্ছে আমি নিজ বাড়িতে ফিরে যাব। শান্তিমতো ঘুমাব। গা টেপার জন্যে লোক রাখব? সে আমাকে ঘোড়ার মতো দলাই-মলাই করবে। খালেদ মোশাররফকে বলব, বাবারে, আমি বৃদ্ধ লোক, এক পা কবরে দিয়ে রেখেছি। আমাকে ছেড়ে দাও। তোমরা দেশ চালাও। আমার দোয়া থাকল।
চাষী বললেন, আপনার নিজের ইচ্ছায় কিছু হবে এ রকম মনে হচ্ছে না। তারপরেও চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
আমি খালেদ ছোকড়ার কাছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হিসাবে একটা জিনিস চাইব। দিবে কি না কে জানে!
স্যার, কী চাইবেন?
একটা ট্যাংক চাইব। ট্যাংকে করে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে যাব। মাঝে মাঝে নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে যাব পাবদা মাছ কিনতে।
চাষী বললেন, চরম দুঃসময়েও আপনার রসবোধ দেখে ভালো লাগল। খন্দকার মোশতাক বললেন, এখন চরম দুঃসময়?
চাষী বললেন, অবশ্যই। কখন কী ঘটবে কিছুই বলা যাচ্ছে না। Winter of Discontent.
Winter of Discontent আবার কী?
একটা উপন্যাসের নাম স্যার।
ও আচ্ছা, তুমি তো আবার অতিরিক্ত জ্ঞানী। মেজরদের মতো ইন্টারমিডিয়েট পাশ না। ভালো কথা, তোমাকে একটা উপদেশ দিয়ে যাই। কাজে লাগবে। উপদেশটা হলো, মূর্খদের সঙ্গে কখনো তর্ক করতে যাবে না।
চাষী বললেন, কেন তর্কে যাব না?
খন্দকার মোশতাক বললেন, কারণ হলো মূখরা তোমাকে তাদের পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে এসে তর্কে হারিয়ে দিবে। এখন বুঝেছ?
চাষী বললেন, ভেরি ইন্টারেস্টিং।
সকাল এগারটা।
খন্দকার মোশতাক নিজের অফিসে বসে আছেন। সঙ্গে আছেন ওসমানী। এই সময় ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকলেন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল শাফায়েত জামিল এবং চারজন সশস্ত্র সৈন্য। খালেদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, তবে কর্নেল শাফায়েত জামিলের হাতে ভোলা সাব-মেশিনগান।
শাফায়েত জামিল প্রেসিডেন্টের দিকে অস্ত্র তাক করে বললেন, আপনি খুনি। আপনার সারা শরীর রক্তে মাখা। চার নেতাকে আপনি ঠান্ডা মাথায় খুন করেছেন। আমিও আপনাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করব। You old rat!
