তিনি কর্নেল ওসমানীকে টেলিফোন করে কাঁদো কাঁদো গলায় তক্ষুনি বঙ্গভবনে আসতে বললেন।
প্রেসিডেন্টের জন্যে সকালের নাশতা নিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট চায়ের কাপে বড় চুমুক দিয়ে মুখ পুড়িয়ে ফেললেন। তিনি হা করে বসে আছেন। মুখের জ্বলুনি কমছে না। মাথার ওপর মিগ বিমান চক্কর দিচ্ছে। তারা কি বোমা বর্ষণ করবে? তিনি বোমার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন? কবর দেওয়ার মতো শরীরের কোনো অংশ কি অবশিষ্ট থাকবে? মনে হয় না।
রেডিও বাংলাদেশ নীরব। তার মানে বড় কিছু-একটা ঘটেছে। সেটা কী?
ওসমানী বঙ্গভবনে ঢোকার পর জানা গেল, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। খালেদের সঙ্গে আছেন তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ সহচর ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়েত জামিল। ক্যান্টনমেন্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁদের হাতে। এয়ার মার্শাল তোয়াব খালেদকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর নির্দেশেই আকাশে মিগ বিমান উড়ছে। শুধু যে ভয় দেখানোর জন্যে উড়ছে তা না। ফারুকের ট্যাংকবহরের ওপর বোমাবর্ষণের পরিকল্পনাও তার আছে।
খালেদ মোশাররফের নির্দেশে ৪৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অ্যান্টি ট্যাংক কামান নিয়ে বঙ্গভবন ঘিরে ফেলল। পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা। একদিকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের বাহিনী, অন্যদিকে ফারুকের ট্যাংক ও আর্টিলারি বহর। দুই দলই মুখখামুখি বসা।
সেনাবাহিনী প্রধান জিয়া বন্দি। জিয়ার বাসভবন ঘিরে রাখা সৈন্যদলের প্রধান মেজর হাফিজকে জিয়া জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি বন্দি?
মেজর হাফিজ হাসলেন। এই হাসির অর্থ জেনারেল জিয়া বুঝতে পারলেন।
অজানা আশংকায় অস্থির হয়ে বেগম জিয়া টেলিফোন করলেন ওসমানীকে। তার একটাই অনুরোধ, জিয়াকে যেন নিরাপত্তা দেওয়া হয়।
বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের কাছে খালেদ মোশাররফ তিনটি দাবি পাঠিয়েছেন। দাবিগুলো হচ্ছে—
১. সমস্ত ট্যাংক ও কামান ক্যান্টনমেন্টে ফেরত আসবে। শহরে কিছুই থাকবে না।
২. বঙ্গভবনে বসে ফারুক-রশীদের দেশ চালানোর অবসান ঘটবে। তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরে চেইন অব কমান্ড মানতে হবে।
৩. জিয়া চিফ অব স্টাফ থাকতে পারবেন না।
মেজর ফারুক, মেজর রশীদ, ওসমানী এবং প্রেসিডেন্ট রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছেন। খালেদ মোশাররফের তিন দাবি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ফারুক বললেন, আমি আমার ট্যাংক ও আর্টিলারি নিয়ে যুদ্ধ করব। ক্যান্টনমেন্টে আমার ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
প্রেসিডেন্ট বললেন, যুদ্ধ করলে ব্যাঙা হয়ে যাবেন।
ফারুক চোখমুখ লাল করে বললেন, ব্যাঙা হয়ে যাব মানে কী?
ওপর থেকে যখন বোমা পড়বে তখন ব্যাঙের মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাবেন। একে বলে ব্যাঙা হয়ে যাওয়া।
ফারুক বললেন, জটিল সময়ে আপনার তৃতীয় শ্রেণীর রসিকতা আমার খুবই অপছন্দ।
প্রেসিডেন্ট বললেন, রসিকতা বাদ। এখন একটা প্রস্তাব দেই? আপনাদের দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করি? আমার প্রস্তাব নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন। মাথা গরম করবেন না। আপনারা দেশত্যাগ করবেন। আমিও দেশত্যাগ করব।
কর্নেল ওসমানী অবাক হয়ে বললেন, দেশত্যাগ করে আপনি কোথায় যাবেন?
প্রেসিডেন্ট বললেন, আমি বঙ্গভবন ছেড়ে আগামসি লেনের নিজ বাড়িতে চলে যাব। এটাই আমার জন্যে দেশত্যাগ।
খালেদ মোশাররফ বিকাল তিনটায় জেলহত্যার খবর পেলেন। তিনি শীতল গলায় বললেন, একজীবনে অনেক রক্ত দেখেছি, আর রক্ত দেখতে চাই না, তবে খন্দকার মমাশতাকের বুকে আমি নিজ হাতে চারটা বুলেট ঢুকিয়ে দেব। চার নেতার সৌজন্যে চার বুলেট। ফারুক রশীদ গং-এর অবসানও আমি ঘটাতে যাচ্ছি। প্রয়োজনে বঙ্গভবন আমি ধুলায় মিশিয়ে দেব।
খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনের উদ্দেশে নিজেই যুদ্ধযাত্রা করলেন। তখন সময় সন্ধ্যা সাতটা। একটু আগেই মাগরেবের আযান হয়েছে।
একই সময়ে তেজগা বিমান বন্দরে একটা বিমান ব্যাংককের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছিল। বিমানে আছেন মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদসহ ১৭জন সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা। মহিলাদের অনেককেই নীরবে অশ্রুবর্ষণ করতে দেখা গেল।
ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বঙ্গভবনের গেট দিয়ে ঢোকার মুহূর্তে তেজগা বিমান বন্দর থেকে বিশেষ বিমান ব্যাংককের উদ্দেশে দেশ ছাড়ল।
আইজি প্রিজন নুরুজ্জামানের জেলহত্যা রিপোর্ট
১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর ভোের তিনটায় আমি বঙ্গভবন থেকে মেজর রশীদের একটা ফোন পাই। তিনি আমার কাছে জানতে চান, ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কোনো সমস্যা আছে নাকি? আমি জানালাম, ঠিক এই মুহূর্তের অবস্থা আমার জানা নেই।
এরপর তিনি আমাকে জানালেন কয়েকজন বন্দিকে জোর করে নিয়ে যেতে কিছু সেনাসদস্য জেল গেটে যেতে পারে। আমি যেন জেল গার্ডদের সতর্ক করে দেই। সেই অনুযায়ী আমি সেন্ট্রাল জেলে ফোন করি এবং জেলগেটে দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডারকে ম্যাসেজটি জেলারকে পৌঁছে দিতে বলি, যাতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়।
৩/৪ মিনিট পর বঙ্গভবন থেকে আরেকজন আর্মি অফিসারের টেলিফোন পাই। তিনি জানতে চান আমি ইতিমধ্যেই জেল গার্ডদের সতর্ক করে দিয়েছি কি না। আমি ইতিবাচক জবাব দেওয়ার পর তিনি আমাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্যে জেলগেটে চলে যেতে বলেন।
আমি তখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ডিআইজি প্রিজনকে ফোন করি। খবরটা জানিয়ে আমি তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জেলগেটে চলে যেতে বলি। দেরি না করে আমিও জেলগেটে চলে যাই এবং ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া জেলারকে আবার গার্ডদের সতর্ক করে দিতে বলি। এরই মধ্যে ডিআইজিও জেলগেটে পৌঁছেন। বঙ্গভবন থেকে পাওয়া খবরটা আমি আবার তাঁকে জানাই।
