জেলহাজতে শফিকের পরিচয় হয়েছে বরিশালের আলিম ডাকাতের সঙ্গে। আলিম ডাকাত আটক হয়েছে—এক পরিবারে তিনজনকে হত্যার জন্যে। যে কোনো কারণেই হোক, আলিম ডাকাত শফিককে স্নেহের চোখে দেখছে। হাজতে তার জন্যে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করেছে। একজন হাজতিকে নিযুক্ত করেছে শফিকের গা-হাত-পা মালিশ করার জন্যে।
শফিক বলেছিল, গা-হাত-পা মালিশের কোনো প্রয়োজন নেই। আলিম ডাকাত বলল, প্রয়োজন অবশ্যই আছে। পুলিশের মারের সময় যেন ব্যথা-বেদনা কম হয় এইজন্যেই শরীর তৈরি করা। পুলিশ যখন নিয়ে যাবে তখন দু’টা ট্যাবলেট দিব। একফাকে গিলে ফেলবেন। এরপর পুলিশ যদি মারতে মারতে হাড়ি ভেঙে ফেলে, ব্যথা-বেদনা হবে না। আরও টেকনিক আছে, সময়মতো সব শিখায়ে দিব।
আলিম ডাকাতের মাধ্যমে শফিক অবন্তিকে একটা চিঠি পাঠিয়েছে। আলিম বলেছে, চিঠি জায়গামতো পৌঁছে গেছে। শফিক জানে না পৌঁছেছে কি না।
অবন্তিকে লেখা শফিকের চিঠি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সেখানে লেখা–
অবন্তি,
আমি জেলহাজতে আছি। রাধানাথ বাবু খুন হয়েছেন। পুলিশের হাস্যকর ধারণা, খুন আমি করেছি। তোমার দাদাজানকে বলে তোমার পক্ষে কি সম্ভব আমাকে নরক থেকে উদ্ধার করা?
ইতি
শফিক
৩ নভেম্বর। রাত আড়াইটা। হঠাৎ জেলখানার পাগলাঘণ্টি বাজতে লাগল। শফিক পাগলাঘণ্টি শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল। কারারক্ষীদের ছোটাছুটি দেখা যাচ্ছে। তারা কেউ কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না। আলিম ডাকাত শফিকের চিন্তিত মুখ দেখে বলল, নিশ্চিন্তে ঘুমান। এরা পাগলাঘণ্টি বাজানোর প্র্যাকটিস করতেছে।
পাগলাঘণ্টি বাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন আইজি প্রিজন নুরুজ্জামান। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের জেলার আইজি প্রিজনকে খবর দিয়ে এনেছেন। সেনাবাহিনীর রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন অস্ত্র হাতে একদল সৈনিক নিয়ে এসেছে। তারা জেলখানায় ঢুকে কিছু দুষ্ট বন্দিকে শায়েস্তা করতে চায়। কী অদ্ভুত কথা!
আইজি প্রিজন হতভম্ব হয়ে লক্ষ করলেন, রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন এবং তার লোকজনের ভাবভঙ্গি ভয়ংকর। জেল গেট না খুলে দিলে তারা এখানেই খুনখারাবি করবে।
তাঁর নিজের জীবন নিয়েই এখন সংশয়। তিনি প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাককে টেলিফোন করলেন। অবস্থা জানালেন।
প্রেসিডেন্ট মোশতাক নির্বিকার গলায় বললেন, যারা ঢুকতে চাচ্ছে তাদের ঢুকতে দিন।
নুরুজ্জামান বললেন, স্যার, আপনি কী বলছেন?
খন্দকার মোশতাক ধমক দিয়ে বললেন, আমি কী বলেছি আপনি শুনেছেন। আপনি কানে ঠসা না।
স্যার, জেল গেট খুলে দিতে বলছেন?
মোশতাক জবাব না দিয়ে টেলিফোন লাইন কেটে দিলেন।
মুসলেহ উদ্দিনের বন্দুকের মুখে আইজি প্রিজন দলবল নিয়ে এক নম্বর সেলে গেলেন। সেখানে তাজউদ্দীন এবং নজরুল ইসলাম ছিলেন। দুই নম্বর সেলে ছিলেন মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান। এই দু’জনকে এক নম্বর সেলে আনা হলো। রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে চারজনকে হত্যা করে। তাজউদ্দীন ছাড়া বাকি তিনজন তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান। তাজউদ্দীনের হাঁটুতে ও পেটে গুলি লেগেছিল। তিনি পানি পানি’ বলে কাতরাচ্ছিলেন। তাঁকে পানি দেওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না।
মুসলেহ উদ্দিন চলে যাওয়ার পর আরেকটি ঘাতক দল আসে। এই দলের প্রধান নায়েক আলী। তাকে মৃত চার নেতাকে দেখানো হয়। নায়েক আলি মৃত শবের ওপরে বেয়োনেট চার্জ করে।
তিন নম্বর সেলে ছিলেন আওয়ামী লীগের আরেক নেতা। আব্দুস সামাদ আজাদ। ঘাতকেরা তাকে কিছুই বলে না। সবাই শেষ হলেও তিনি কেন টিকে থাকেন কে বলবে! রাজনীতির খেলা বোঝা বিচিত্র। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই খেলা ‘বোঝার আশায় দিয়েছি জলাঞ্জলি।
জেলখানার পাগলাঘণ্টি বাজতেই থাকল। সব বন্দি তখন জেগে উঠেছে। তারা প্রচণ্ড হইচই করছে। দরজায় বাড়ি দিচ্ছে। তারা তখনো কী ঘটেছে জানে না। তবে কাতরানি ধ্বনি এবং পানির কাতর উচ্চারণ শুনছে।
শফিক এই উত্তেজনা সহ্য করতে পারল না। সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। এই রাত থেকেই তার এপিলেপসির শুরু। শফিক তার প্রতিটি এপিলেপটিক সিজারের আগে আগে কালাপাহাড়কে দেখত। কালাপাহাড় নাকি মানুষের মতো গলায় বলত—সাবধান, এখনই ঘটনা ঘটবে। শুয়ে পড়েন। দাঁতের ফাঁকে কিছু একটা রাখেন, না রাখলে জিহ্বা কেটে যাবে।
জেলহত্যা-বিষয়ে আইজি প্রিজনের জবানবন্দি তুলে দেওয়া হলো অধ্যায়ের শেষে। এই জবানবন্দি একুশ বছর পর উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কী কাণ্ড ঘটেছে কেউ তা জানে না। প্রেসিডেন্ট সাহেব জানেন এবং ডিজেএফআই প্রধান মেজর জেনারেল খলিল জানেন। এই দুজনের কেউই মুখ খুলছেন না। প্রেসিডেন্ট আছেন বঙ্গভবনে। রাত চারটায় তিনি ঘুমুতে গেছেন। তখনো তিনি জানেন না বঙ্গভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত তিন শ’ সৈন্যের পদাতিক দল নিয়ে মেজর ইকবাল বঙ্গভবন ছেড়ে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে গেছেন।
নভেম্বর মাসের হালকা শীতে প্রেসিডেন্ট সাহেবের ভালো ঘুম হচ্ছিল। ঘুম ভাঙল বিকট শব্দে। কী হচ্ছে কী হচ্ছে বলে তিনি জেগে উঠলেন। কী হচ্ছে কেউ বলতে পারল না। বঙ্গভবনের ওপর দিয়ে বিকট শব্দে দুটি মিগ বিমান উড়ে গেল। এর মধ্যে একটি আবার ফিরে এসে বঙ্গভবনের ওপর দিয়ে চক্কর খেতে লাগল। মিগ বিমানের সঙ্গে যুক্ত হলো দুটি হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টার দুটির সঙ্গে আছে ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল। প্রেসিডেন্ট মোশতাক আতঙ্কে অস্থির হয়ে গেলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল যে-কোনো মুহূর্তে তিনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন।
