কোনো কারণে যদি খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবন আক্রমণ করেন তাহলে ভরসা ট্যাংকবহর।
ফারুকের আতংকগ্রস্ত হওয়ার আরেকটি কারণ আন্ধা হাফেজ। আন্ধা হাফেজ খবর পাঠিয়েছেন—ফারুকের বাহিনী পনেরই আগস্টে বাড়াবাড়ি করেছে, তার ফল অশুভ হয়েছে। ফারুকের উচিত জীবন বাঁচানোর জন্যে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং কোনোদিন দেশে ফিরে না আসা।
নভেম্বরের দুই তারিখ ভোরে ফারুক ব্যাকুল হয়ে টেলিফোন করলেন কর্নেল ওসমানীকে। তিনি যেন খালেদ মোশাররফের সঙ্গে কথা বলে একটা সমঝোতায় আসেন। এখন মোটামুটি পরিষ্কার, খালেদ মোশাররফ কিছু ঘটাতে যাচ্ছেন। সেনাকর্মকর্তারা সবাই কোনো-না-কোনো সময়ে বঙ্গভবনে এসেছেন। চা-পানি খেয়েছেন। মেজর ফারুক, মেজর রশীদ ও মেজর ডালিমের সঙ্গে গল্পগুজব করেছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম খালেদ মোশাররফ। তিনি কখনো আসেন নি।
কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে খালেদ মোশাররফের সংক্ষিপ্ত টেলিফোন কথোপকথন—
ওসমানী : খালেদ, এইসব কী হচ্ছে!
খালেদ : কিছুই হচ্ছে না স্যার। আপনি ট্যাংকগুলিকে ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দিন।
ওসমানী : আমি বঙ্গভবনে যাচ্ছি, তুমিও আসো। আমরা কথা বলি। মেজর রশীদ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে।
খালেদ মোশাররফ : আমার সঙ্গে কী কথা? খুনি মেজররা যারা দেশ শাসন করছে তাদের সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই।
ওসমানী : বঙ্গভবনে জোর গুজব, জিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। তুমি কি জিয়াকে হত্যা করেছ?
খালেদ মোশাররফ : আমি রক্তপাতে বিশ্বাস করি না। জিয়াকে আটক করা হয়েছে, হত্যা করা হয় নি। তবে বঙ্গভবনে ঢুকে একজনকে আমার হত্যা করার ইচ্ছা আছে। আপনি কি তার নাম শুনতে চান? তিনি প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক। শ্বেত সর্প।
ওসমানী : কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে যাবে না। [এই পর্যায়ে টেলিফোনের লাইন কেটে গেল।]
বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট সাহেব জোহরের নামাজ শেষ করে, চোখ বন্ধ করে জায়নামাজে বসে আছেন। তিনি দরুদে তুনাজ্জিনা পাঠ করছেন। মানবজীবনের যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে মুক্তিলাভের জন্যে এই দোয়ার শক্তি সর্বজনস্বীকৃত।
মোশতাক সাহেবের একাগ্র মনোেযোগ ব্যাহত হলো। মেজর রশীদের গলা— আপনি দেখি বঙ্গভবনকে মসজিদ বানিয়ে ফেলেছেন! সারাক্ষণ নামাজ কালাম পড়লে রাষ্ট্রকার্য পরিচালনা করবেন কীভাবে?
মোশতাকের মুখে চলে এসেছিল বলবেন, রাষ্ট্রকার্য পরিচালনার জন্যে তো আপনারাই আছেন। তিনি শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলালেন। সবসময় সব কথা বলা যায় না।
আপনার নামাজ কি শেষ হয়েছে? আমি জরুরি কাজ নিয়ে এসেছি।
জরুরি কাজটা কী?
আপনাকে দুশ্চিন্তামুক্ত করা।
খন্দকার মোশতাক বললেন, আমার কিসের দুশ্চিন্তা? আমি কাউকে খুন করে ক্ষমতায় আসি নি। আমাকে জোর করে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।
মেজর রশীদ কড়া গলায় বললেন, বুরবাকের মতো কথা বলবেন না। আপনি ক্ষমতায় বসার জন্যে জিভ বের করে বসে ছিলেন।
খন্দকার মোশতাক বললেন, বাহাসের প্রয়োজন নাই। কী বলতে চান বলুন।
সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমানকে যে আটক করা হয়েছে, এটা জানেন?
জানি না। ডিজিএফআই আমাকে কোনো খবর দেয় না। তারা আমাকে ভাসুর জ্ঞান করে। ভাসুরকে সব কথা বলা যায় না।
মেজর রশীদ বিরক্তির সঙ্গে বললেন, রসিকতা করবেন না। সময়টা রসিকতার জন্যে উপযুক্ত না।
খন্দকার মোশতাক বললেন, অবশ্যই অবশ্যই।
মেজর রশীদ বললেন, খালেদ মোশাররফ আমাদের ক্যান্টনমেন্টে নিজ নিজ রেজিমেন্টে ফিরে যেতে বলেছেন। এর অর্থ জানেন?
এর অর্থ হলো সব স্বাভাবিক। ঘরের পাখি ঘরে ফিরিয়া গেল। ঘরে ফিরিয়া ধান খাইতে লাগিল।
আবার রসিকতা?
আলহামদুলিল্লাহ্। রসিকতা কেন করব? আপনি যেমন আমার শালা না, আমিও তেমন আপনার দুলাভাই না, যে, কথায় কথায় রসিকতা করব।
মেজর রশীদ হতাশ গলায় বললেন, রেজিমেন্টে ফিরে যাওয়া মানে সরাসরি কোর্টমার্শালে উপস্থিত হওয়া। খালেদ মোশাররফ হচ্ছে ময়মনসিংহের ছেলে। এদের ঘাড়ের তিনটা রগ থাকে তেড়া। তেড়াগের কারণে সে আমাদের গুলি করে মারবে। নামকাওয়াস্তে কোর্টমার্শাল হবে। বুঝতে পারছেন?
পারছি।
খন্দকার সাহেব মনে মনে বললেন, ঘরের পাখি ঘরে ফিরিয়া ধানের বদলে গুলি খাইয়া মরিল।
মেজর রশীদ বললেন, আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা যেন ফিরে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা করে যাব। আওয়ামী লীগের সব নেতা শেষ করে দিয়ে যাব। বিশেষ করে যারা জেলে আছে তাদের। এদের খুঁজে বেড়াতে হবে না। সবাই
একসঙ্গেই আছে। নেতা নিমূলে আপনার কি সমর্থন আছে?
খন্দকার মোশতাক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আছে, সমর্থন আছে। এই কাজটা করতে পারলে দেশের জন্যে বড় কাজ করা হবে। বাকশালের কবর হয়ে যাবে। দেশ চলতে শুরু করবে সোনার রথে।
মেজর রশীদ বললেন, কাজ শেষ করে বিদেশ চলে যাওয়া যায়। সময়সুযোগমতো আবার ফিরে আসা।
খন্দকার মোশতাক বললেন, অবশ্যই ফিরে আসবেন। আপনারা দেশের সূর্যসন্তান। আপনাদের ছাড়া দেশ চলবে কীভাবে? দেশে কেউ আপনাদের ছায়াও স্পর্শ করতে পারবে না। আমি ইনডেমনিটি বিলে সই করেছি, গ্যাজেটে তা প্রকাশিত হয়েছে।
আপনি কথা বেশি বলেন। কম কথা বলুন। পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে তা খেয়াল করুন।
শফিককে থানাহাজত থেকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। আসামিকে কোর্টে চালান দিলে তাকে আর থানায় ফেরত আনা যায় না। তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তিন দিন ধরে শফিক জেলহাজতে আছে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে এখনো কেউ আসে নি। শফিক খবর পেয়েছে, পুলিশের এই জিজ্ঞাসাবাদ নাকি ভয়ংকর। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মরা মানুষও নাকি উঠে বসে। সমস্ত অপরাধ স্বীকার করে, আবার মৃতমানুষ হিসেবে মেঝেতে পড়ে যায়।
