শফিক বলল, কেমন আছ অবন্তি?
অবন্তি বলল, আমি ভালো আছি। এখন আপনি বলুন তো, আপনার পছন্দের মাছ কী?
আমার পছন্দের মাছ জেনে কী হবে!
অবন্তি বলল, কিছু হোক বা না-হোক আমি জানতে চাচ্ছি।
টেংরা মাছ।
অবন্তি বলল, টেংরা মাছ? এই মাছ কারও পছন্দের হতে পারে তা আমার ধারণায় ছিল না।
শফিক বলল, আমার মা বেগুন দিয়ে টেংরা মাছ রাধেন। তার সঙ্গে কিছু আমচুর দিয়ে দেন। টক টক লাগে। আমার কাছে মনে হয় বেহেশতি খাবার।
আপনার মা কি বেঁচে আছেন?
হ্যাঁ।
আমি তার কাছে থেকে আমচুর দিয়ে টেংরা মাছের রেসিপি নিয়ে নেব। আপাতত আমচুর ছাড়াই আপনাকে টেংরা মাছ খেতে হবে। আজ রাতে আপনার টেংরা মাছ খাওয়ার নিমন্ত্রণ। কই, আমাকে চা দিচ্ছেন না কেন?
সত্যি চা খাবে?
হ্যাঁ খাব।
শফিক অবাক হয়ে ভাবছে, কী আশ্চর্য মেয়ে! সে একবারও জানতে চাইছে শফিক এখানে চা বানাচ্ছে কেন? যেন শফিকের জন্যে চা বানানোর কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিক।
অবন্তি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, বাহ্ সুন্দর চা বানিয়েছেন! আপনি যদি পুরোপুরি চায়ের কারিগর হয়ে যান, তাহলে আমি রোজ এসে এক কাপ করে চা খেয়ে যাব। ঠিক আছে?
হ্যাঁ ঠিক আছে।
দেখুন ভয়ংকর একটা কুকুর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি আমার ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়বে।
শফিক বলল, ঝাঁপ দিবে না।
অবন্তি বলল, আপনি কী করে বুঝলেন যে ঝাঁপ দিবে না? কুকুরের মনের কথা কি আপনি জানেন?
সব কুকুরের মনের কথা জানি না। এটার মনের কথা জানি। এটা আমার কুকুর। এর নাম কালাপাহাড়।
অবন্তি হতভম্ব গলায় বলল, এর নাম কালাপাহাড়!
হ্যাঁ। আমি যেখানে যাই সে আমার পেছনে পেছনে যায়।
কী আশ্চর্য!
শফিক বলল, আশ্চর্য কেন?
অবন্তি বলল, এ রকম একটা ভয়ংকর কুকুর আপনার সঙ্গী, এইজন্যেই বললাম, কী আশ্চর্য।
অবন্তি অনেক রানাবানা করেছিল। সে তার দাদাজানের জন্যে সত্যি সত্যি হোটেল থেকেও খাবার আনিয়েছিল—ডাল গোশত। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তার পার্টিতে কেউ এল না।
খালেদ মোশাররফ এলেন না। তিনি কেন আসছেন না, তা জানালেনও না। এই ধরনের কাজ তিনি আগে কখনো করেন নি।
শামীম শিকদার দেশে নেই। সে নাকি কোন আর্মি অফিসারকে বিয়ে করে দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
শফিককে সন্ধ্যাবেলা পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেছে। রাধানাথ বাবুকে কে বা কারা ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে। তার আদর্শলিপি প্রেসের অনেক কর্মচারীর মতো শফিকও একজন সাসপেক্ট।
রমনা থানার ওসির সঙ্গে শফিকের প্রাথমিক কথোপকথন—
আপনার সঙ্গে আবার দেখা হলো।
জি স্যার।
রাধানাথ বাবু খুন হয়েছেন, এটা জানেন তো?
কিছুক্ষণ আগে জেনেছি।
এখন বলুন, রাধানাথ বাবুর গলায় ছুরিটা কি আপনি বসিয়েছেন, নাকি আপনার কোনো সঙ্গী? জবেহ করে কাউকে হত্যা একা করা যায় না। কয়েকজন লাগে। একজন ছুরি চালায়, বাকিরা ধরে থাকে। বুঝেছেন?
জি স্যার।
ভেরি গুড। এখন মুখ খুলুন।
শফিক মুখ খুলতে পারল না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
দুঃস্বপ্ন দেখে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ
দুঃস্বপ্ন দেখে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের ঘুম ভাঙল। ভয়ে এবং উত্তেজনায় তার হাঁপানির মতো হয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরে বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্ত করার চেষ্টা করলেন। নিজেকে সামলানো যাচ্ছে না। তার হাত পারকিনসন্স রোগীর মতো কাঁপছে। পিপাসায় বুক শুকিয়ে কাঠ।
তাঁর স্বপ্ন খুব ভয়ংকর কিন্তু ছিল না। স্বপ্নটা বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক। আতংকে অস্থির হওয়ার মতো কিছু না।
তিনি দেখেছেন তাঁর আগামসি লেনের বাড়ির ছাদে তিনি বসে আছেন। তাঁর সামনে একগাদা কবুতর। তিনি কবুতরকে চাল খাওয়াচ্ছেন। হঠাৎ চিলেকোঠার দরজায় প্রচণ্ড শব্দ হতে লাগল। শব্দে সব কবুতর উড়ে গেল। তিনি তাকিয়ে দেখেন ছাদের দরজা এবং দেয়াল ভেঙে প্রকাণ্ড এক ট্যাংক ঢুকেছে।
স্বপ্নে ছাদে ট্যাংক আসা খুবই স্বাভাবিক মনে হলো। ট্যাংকের ভেতর কর্নেল ফারুক বসে আছেন। ফারুকের চোখে কালো চশমা, গায়ে কিছু নেই, খালি গা। স্বপ্নে এই বিষয়টাও মোটেই অস্বাভাবিক মনে হলো না। কর্নেল ফারুক বললেন, কবুতরগুলি খুবই যন্ত্রণা করছে। দিন-রাত বাকবাকুম ডাক। আমি কবুতর মারতে এসেছি।
মোশতাক বললেন, উত্তম কাজ করেছেন। সব কবুতর মেরে ফেলা উচিত। কাকগুলি থাকুক। এরা ময়লা খেয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করে। কবুতর কোনো কাজের পাখি না।
ছাদে আবারও ঘড়ঘড় শব্দ। আরেকটা ট্যাংক ঢুকছে। তার পেছনে আরেকটা, তার পেছনে আরেকটা। ট্যাংকগুলি নির্বিচারে কামান দাগতে শুরু করেছে।
খন্দকার মোশতাক যখন ট্যাংকের স্বপ্ন দেখছেন তখন কাকতালীয়ভাবে মেজর ফারুক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে আটটা ট্যাংক এনে বঙ্গভবনের চারদিকে বসাচ্ছিলেন। বঙ্গভবনে আগেই আটটা ট্যাংক ছিল, এখন হলো যোলটা। বঙ্গভবন পুরোপুরি সুরক্ষিত। ষোলটা ট্যাংক ডিঙিয়ে কেউ এখানে ঢুকবে না। সে যত বড় বীরপুরুষই হোক।
ফারুক আতংকে অস্থির হয়ে ছিলেন, কারণ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মমাশাররফের ভাবভঙ্গি মোটেই তার ভালো মনে হচ্ছিল না। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কর্নেল শাফাত জামিল। বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকেও ট্রপস মুভমেন্ট শুরু হয়েছে।
খালেদ মোশাররফের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কর্নেল হুদাও যুক্ত হয়েছেন। কর্নেল হুদার ভাবভঙ্গিও ভালো না। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১০ এবং ১৫ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট আসছে। এরা মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদ মোশাররফের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।
