অবন্তি বলল, কী রকম দেখাচ্ছে?
মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগে ভূত দেখেছিস। মুখ রক্তশূন্য।
আমার চোখে মুখে কোনো আনন্দ দেখতে পাচ্ছ না?
না।
না দেখতে পেলে বুঝতে হবে তোমার অবজারভেশান পাওয়ার অতি দুর্বল। যাই হোক, তুমি তো আমার সব চিঠিই আগে সেন্সর করে আমাকে দাও। মার এইবারের চিঠিটা কি পড়েছ?
না।
এই নাও চিঠি। পড়লে আনন্দ পাবে। বাবার খোঁজ পাওয়া গেছে। বাবা এখন মা’র সঙ্গেই আছে। মা’র বাড়ির সামনে একটা পামগাছের নিচে আস্তানা গেড়েছে। নানান কর্মকাণ্ড করে মা’কে ভোলানোর চেষ্টা করছে। মা অবশ্যি কঠিন চিজ। ভুলছে না। বারান্দার সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছে যাতে বাবাকে দেখতে না হয়।
সরফরাজ খান বললেন, হড়বড় করে এইসব কী বলছিস? চিঠি দে পড়ে দেখি।
অবন্তি বলল, চিঠি এখনই পড়া শুরু করবে না। আগে আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমি আজ রাতে একটা পার্টি দেব। আমার আনন্দ আমি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই।
অন্যেরা মানে কারা?
খালেদ চাচা, আমার স্যার, শামীম শিকদার। তুমি বড় দেখে একটা পাঙ্গাস মাছ কিনবে, বাবার পছন্দের মাছ। কই মাছ আর মটরশুটি কিনবে। খালেদ চাচু মটরশুটি দিয়ে কই মাছ পছন্দ করেন। আজ রাতে হবে মাছ উৎসব।
তুই তো মাছ খাস না।
এখন খাই। খতিবনগরের হাফেজ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কাতল মাছের পেটি খেয়ে মাছ খাওয়া ধরেছি।
সরফরাজ খান বিরক্ত গলায় বললেন, আবার তার কথা কেন? আমি চাই না এই বাড়িতে তার নাম উচ্চারিত হোক।
অবন্তি হাসতে হাসতে বলল, হাফেজ সাহেব ঢাকায় থাকলে তাকেও দাওয়াত দিতাম।
সরফরাজ খান বললেন, তোর বাবার কাণ্ডকারখানা আমি কোনোদিন বুঝি নি। তোর কাণ্ডকারখানাও বুঝি না। আমার একটা সাজেশান শোন, শফিক আর ওই যে শামীম, এদের আসতে বলার কিছু নেই। এরা কোনোভাবেই আমার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত না।
অবন্তি বলল, আমার পার্টিতে কে আসবে, কে আসবে না, তা আমি ঠিক করব। তুমি না।
সরফরাজ খান বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, চোখ মুখ কঠিন করে ফেলতে হবে না।
অবন্তি বলল, চোখ মুখ কঠিন করেছি অন্য কারণে। হঠাৎ মনে পড়ল, শফিক স্যার অনেক দিন এ বাড়িতে আসেন না। তুমি কি তাকে আসতে নিষেধ করেছ?
সরফরাজ খান জবাব দিলেন না।
অবন্তি বলল, তোমার কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের জন্যে আমি তোমাকে অত্যন্ত অপছন্দ করি। আজকের পার্টিতে তোমাকে আমি নিমন্ত্রণ করছি না।
তার মানে?
তার মানে আজ তোমার জন্যে খাবার আসবে হোটেল থেকে। তুমি হাসছ কেন? আমি সিরিয়াস। ভালো কথা, শফিক স্যারের ঠিকানা লিখে দাও। আমি নিজে গিয়ে তাঁকে দাওয়াত দিয়ে আসব।
তোকে যেতে হবে না। মাস্টার আশপাশেই থাকে। মোড়ের এক চায়ের দোকানে থাকে। চা বানিয়ে বিক্রি করে।
অবন্তি বলল, বাহু, ইন্টারেস্টিং তো!
সরফরাজ খান ভুরু কুঁচকালেন। ঘটনাটা কেন ইন্টারেস্টিং বুঝতে পারলেন না।
রমনা থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শফিক তার নিজের ভাড়া বাসায় ফিরে যায় নি। রাধানাথ বাবুর সঙ্গেও দেখা করে নি। শফিক নিশ্চিত, এই মানুষ অতি বিপজ্জনক। আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের শফিকের মতো অভাজনকে সুপারিশ করার পেছনে এই মানুষটার হাত আছে। এঁরা অনেক বড় মানুষ। বড় মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়। বড়র পীরিত বালির বাধ। ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাদ।
সে কাদেরের চায়ের দোকানে এসে উঠেছে। এখন সে এখানেই রাতে ঘুমায়। গোসল সারে ধানমণ্ডি লেকে। বাথরুমের জন্যে এক দারোয়ানের সঙ্গে বন্দোবস্ত করা আছে। তাকে কাদের মোল্লা মাসে কুড়ি টাকা করে দেয়।
চায়ের দোকানের মূল মালিক কাদের মোল্লা দোকানের দায়িত্ব শফিকের কাছে দিয়ে দেশের বাড়িতে বেড়াতে গেছে।
শফিক সুখেই আছে। সারা দিন চা বানায়, রাতে দোকান বন্ধ করে দোকানের ভেতর ঘুমায়। কালাপাহাড় তাকে পাহারা দেয়। কিছুক্ষণ পর পর দোকানের চারপাশে ঘুরপাক খায়। আশেপাশে কেউ না থাকলে শফিক কালাপাহাড়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। কালাপাহাড় ঘেউ ঘেউ করে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। তাদের আলোচনার নমুনা–
কিরে কালাপাহাড়, আছিস কেমন?
ঘেউ।
আমি যে আন্ডারগ্রাউন্ডে আছি বুঝতে পারছিস? কেউ আমার খোঁজ জানে। রাধানাথ বাবু না, অবন্তিও না। অবন্তিকে চিনিস?
ঘেউ ঘেউ।
নে একটা বিস্কুট খা। একটু পর ভাত বসাব, তখন ভাত খাবি। আজ কী রান্না হবে জানতে চাস?
ঘেউ।
আজকে বিরাট আয়োজন। গরম ভাত, বেগুন ভাজা আর মাষকলাইয়ের ডাল। রাতে করব ডিমের সালুন।
শফিক কেরোসিনের চুলায় ভাত বসিয়েছে। দুপুরের দিকে চা-পিপাসুদের ভিড় তেমন থাকে না। শফিক তখন রান্না চড়ায়। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বই পড়ে। আজ পড়ছে বনফুলের একটা উপন্যাস, নাম জঙ্গম। উপন্যাসটা সে রাধানাথ বাবুর লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছে। শফিকের ধারণা এত সুন্দর উপন্যাস সে অনেকদিন পড়ে নি। মাত্র দশ পৃষ্ঠা বাকি আছে। বইটা শেষ করে সে রাধানাথ বাবুকে ফেরত দেবে না। নিজের কাছে রেখে দেবে। বই নিজের কাছে রাখলে দোষ হয় না। এই বইটা অবন্তিকে পড়তে দিতে হবে।
চিনি কম দিয়ে আমাকে এক কাপ চা দিন তো।
শফিক হতভম্ব হয়ে তাকাল। কী আশ্চর্য, অবন্তি হাসিমুখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দুই সেকেন্ড আগেই সে অবন্তির কথা ভাবছিল। কাকতালীয় ঘটনা? নাকি অন্য কিছু?
অবন্তি বলল, আমি কিন্তু টাকা আনি নি। আমাকে বাকিতে চা খাওয়াতে হবে। বলতে বলতে কাস্টমারদের জন্যে রাখা কাঠের বেঞ্চিতে অবন্তি বসল। এখন সে পা নাচাচ্ছে।
