শফিক বলল, স্যার, আমি কি আমার অবস্থা জানিয়ে কাউকে টেলিফোন করতে পারি?
পারেন, তবে থানার টেলিফোন এখন নষ্ট। যান, হাজতে অপেক্ষা করুন। টেলিফোন ঠিক হলে আপনাকে খবর দেওয়া হবে।
সারা দিনেও টেলিফোন ঠিক হলো না। শফিক ঠিক করল, কোনো কারণে যদি সে বেঁচে যায় তাহলে আর ঢাকায় থাকবে না। মা’র কাছে চলে যাবে।
রাত আটটায় হাজতের দরজা খুলে তাকে বের করা হলো। মিলিটারি একটা জিপ থানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এসপি সালাম সাহেবের সঙ্গে একজন অফিসার। এই অফিসারকে শফিক বঙ্গভবনে দেখে নি।
অফিসার এসেছেন সিভিল পোশাকে। সালাম সাহেব তাকে ক্যাপ্টেন সাহেব’ বলে ডাকছেন বলেই শফিক নিশ্চিত হলো ইনি একজন ক্যাপ্টেন। এই সময়ে মেজর এবং ক্যাপ্টেনরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শফিকের ইচ্ছা করছে ক্যাপ্টেন সাহেবের পা চেপে ধরতে। জীবন রক্ষার জন্যে শুধু পা চেপে ধরা না, পা চাটাও যায়।
ক্যাপ্টেন সাহেব কড়া গলায় বললেন, আপনি বোস্টার সাহেবকে চেনেন?
শফিক বলল, জি-না স্যার। উনি কে?
উনি বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত। আপনি তাঁকে চেনেন না, তারপরেও উনি কেন আপনার মুক্তির জন্যে সুপারিশ করলেন?
তাও আমি জানি না। আমি অতি তুচ্ছ একজন। আমার জন্যে সুপারিশ করার কেউ নেই স্যার।
ক্যাপ্টেন বললেন, যান চলে যান। You are released. আপনি চাইলে আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি।
শফিক বলল, স্যার, আপনার অনেক মেহেরবানি। আমি নিজে যেতে পারব।
বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, এইজন্যে বললাম।
শফিক বলল, বৃষ্টিতে ভিজে আমার অভ্যাস আছে স্যার।
অবন্তির কাছে লেখা ইসাবেলার চিঠি
অবন্তির কাছে লেখা ইসাবেলার নভেম্বর মাসের চিঠি–
আমার ছোট্ট পাখি
আমার জেসমিন পুষ্প,
এই মেয়ে, তোমার নভেম্বর মাসের চিঠি আমি লিখছি অক্টোবরের একুশ তারিখে। তোমার দেশের যে অবস্থা চিঠি পেতে পেতে নভেম্বর চলে আসবে।
তোমার জন্যে অতি আনন্দের একটা খবর দিয়ে শুরু করি। তোমার বাবা ফিরে এসেছে। প্রথমে তাকে চিনতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল স্ট্রিটবেগার। ভিক্ষা চাইতে দরজার বেল টিপছে। আমি তাকে বললাম, Go to hell. সে যথারীতি তার পুরনো অভ্যাসমতো রসিকতা করল। সে বলল, Hell-এ যাওয়ার জন্যেই তো তোমার কাছে এসেছি। তোমার চেয়ে কঠিন Hell আর কোথায় পাব?
তোমার বাবার শরীর খুব খারাপ করেছে। নানান অসুখবিসুখ বাঁধিয়েছে। মাথার চুল বেশির ভাগ পড়ে গেছে। চোখ রক্তবর্ণ, কোটরে ঢুকে গেছে। কিডনি মনে হয় ঠিকমতো কাজ করছে না। পায়ে পানি এসেছে। লিভারও মদ খেয়ে পচিয়ে ফেলেছে। তার সারা শরীর হলুদ। গা থেকে টক টক গন্ধও বের হচ্ছে।
আমি তাকে বললাম, আমার কাছে কেন এসেছ? আমার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি তোমার মেয়ের কাছে ফিরে যাও। সে বলল, এই অবস্থায় মেয়ের কাছে ফেরা যাবে না। শরীর সারিয়ে তারপর যাব। তুমি আমার শরীর সারাবার ব্যবস্থা করো।
আমি বললাম, আমি কেন তোমার শরীর সারাবার ব্যবস্থা করব? তুমি কে?
সে বলল, আমি তোমার কেউ না তা ঠিক আছে, কিন্তু আমি তোমার অতি আদরের কন্যার বাবা। এই পরিচয়ই কি যথেষ্ট না?
আমি বললাম, না। আমার বাড়িতে তুমি থাকতে পারবে। তুমি তোমার থাকার জায়গা খুঁজে বের করো। আমি তোমার জন্যে অনেক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গিয়েছি। আর যাব না।
সে বলল, Ok, চলে যাচ্ছি। বলেই পুঁটলি-পাটলি নিয়ে আমার বাড়ির ঠিক সামনে পামগাছের নিচে বসল। আমি দেখেও না-দেখার ভান করলাম। দুপুরে দেখি সে পুঁটলি থেকে ভদকার বোতল বের করে পানি ছাড়া শুধু শুধু ভদকা খাচ্ছে। আমার দিকে বোতল উচিয়ে বলল, চিয়ার্স! আনন্দময় পুরোনো দিনের স্মরণে। ইসাবেলা, দ্য গ্রেট ড্যানসিং কুইন।
এখন তুমি বলো, এই মানুষের ওপর কতক্ষণ রাগ করে থাকা যায়? আমি তার জন্যে গেস্টরুম খুলে দিয়েছি। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। চিকিৎসায় চট করে কোনো সুফল পাওয়া যাবে এ রকম মিথ্যা আশায় বসে থাকবে না। তবে আমি তোমার বাবার চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করব না। যিশুখ্রিষ্টের শপথ।
আমি তোমাকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিজনেস ক্লাসের একটি টিকিট পাঠাব। খোজখবর করছি ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ঢাকায় যায় কি না। তুমি দ্রুত চলে এসো। আমি আড়াল থেকে পিতা-কন্যার মিলনদৃশ্য দেখতে চাচ্ছি।
ইতি
তোমার মা ইসাবেলা
পুনশ্চ-১ : তোমার বাবা তোমাকে চিঠি লেখার জন্যে কাগজকলম নিয়েছে। চিঠি লিখে শেষ করেছে কি না জানি না, শেষ করামাত্র চিঠি তোমাকে পাঠাব।
পুনশ্চ-২ তোমার বাবা এতদিন কোথায় ছিল শুনলে বড় ধরনের চমক খাবে। সে ছিল জেলে। তার দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। কী অপরাধে তা এখনো জানি না। এ বিষয়ে সে মুখ খুলছে না।
পুনশ্চ-৩ তোমার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বিষাক্ত হয়ে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম, এই মানুষটার মতো ঘৃণা আমি আর কাউকে করি না। এখন মনে হচ্ছে, এই ধারণা ভুল। তোমার বাবাকে আগে যতটা ভালোবাসতাম, এখন ততটাই ভালোবাসি। কিংবা কে জানে, হয়তো তারচেয়ে বেশি।
পুনশ্চ-৪: খুব জরুরি একটা কথা লিখতে চাচ্ছিলাম। এখন মনে পড়ছে না। ইদানীং আমার এই সমস্যা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় কথা মনে থাকে। প্রয়োজনীয় কথা মনে থাকে না।
অবন্তি মায়ের চিঠি পরপর তিনবার পড়ল। কিছুক্ষণ চিঠি গালে ধরে রাখল। চিঠি থেকে চা পাতা এবং লেবুর সতেজ গন্ধ আসছে। মা নিশ্চয়ই নতুন ধরনের কোনো পারফিউম চিঠিতে মাখিয়ে দিয়েছে। অবন্তি চিঠি হাতে দাদাজানের ঘরে। ঢুকল। সরফরাজ খান আতকে উঠে বললেন, তোকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? is anything wrong?
