সকাল এগারটা। গত রাতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া ঠান্ডা। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ের মতো হয়েছিল। প্রচুর পাতা পড়েছে। পাতা পরিষ্কার করা হয় নি। পাতার ওপর পা ছড়িয়ে কালাম বসে আছে। সাইকেলের ঘণ্টার ক্রিং ক্রিং শব্দ হলো। সরফরাজ জানালার খড়খড়ি আরও খানিকটা তুললেন। সাইকেল আরোহীকে যদি দেখা যায়।
আরোহীকে দেখা গেল। সরফরাজ ভেবেছিলেন পোস্টঅফিসের পিয়ন। পোস্টঅফিসের পিয়নরা লাল রঙের সাইকেলে করে চিঠি বিলি করে। তা না। মায়া মায়া চেহারার শ্যামলা একটি মেয়ে সাইকেলে চড়ে এসেছে। মেয়েটি ছেলেদের মতো শার্ট-প্যান্ট পরেছে। শার্ট-প্যান্ট দু’টার রঙই কালো। এই মেয়ে কে?
কালাম হাসিমুখে এই মেয়েকে সালাম দিল। সদর দরজা খুলে দিল। মেয়েটি কালামের হাতে সাইকেল ধরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এর একটাই অর্থ, মেয়েটি কালামের পূর্বপরিচিত।
সরফরাজ খানের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। তিনি প্রায় সারা দিন বাড়িতে থাকেন, তারপরেও এ বাড়িতে কিছু লোকজন আসে যাদের বিষয়ে তিনি জানেন না। নিশ্চয়ই এই মেয়ে অবন্তির কাছে এসেছে। অবন্তি তাকে কিছু জানায় নি। অবন্তির অপরাধ ক্ষমা করা যায়। সে অনেক কিছুই গোপন করে। মেয়েদের স্বভাবই হচ্ছে গোপন করা। বয়ঃসন্ধিকালে তারা শরীর গোপন করতে শেখে। গোপন করার এই অভ্যাস তাদের মাথায় ঢুকে যায়। তখন তারা সবই গোপন করে।
কালাম হারামজাদা কেন গোপন করেছে? পাছায় লাথি দিয়ে বদটাকে বিদায় করা দরকার। বদটা এখন ক্রি ক্রিং শব্দে সাইকেলের বেল বাজাচ্ছে। যেন হাতে খেলনা পেয়েছে। সরফরাজ জানালার পাট খানিকটা খুলে ডাকলেন, কালাম!
কালাম ওপরের দিকে তাকাল। সরফরাজ বললেন, ওপরে আসো। বলেই জানালা বন্ধ করলেন। তবে তিনি এখনো খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে কালাম বদটাকে দেখতে পাচ্ছেন। বদটা যে ভয় পেয়েছে তা না। এখনো সাইকেলের ঘণ্টি বাজাচ্ছে। সরফরাজ খান মনে মনে বললেন, তোমার সুখের দিন আজই শেষ। পত্রপাঠে বিদায়।
দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় সরফরাজের ঘর অন্ধকার। কিছুদিন হলো তাকে অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে, কারণ তার চোখ উঠেছে। আলোর দিকে তাকালেই চোখ কড়কড় করে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের সব মানুষের চোখে এই রোগ হয়েছিল। তখন রোগের নামকরণ হয়েছিল জয়বাংলা রোগ’। সরফরাজ খানের তখন এই রোগ হয় নি, এখন হয়েছে। মানসিক টেনশনের সঙ্গে কি এই রোগের কোনো যোগ আছে?
প্রবল মানসিক চাপের কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় সবার এই রোগ হয়ে গেল। তিনি কোনো মানসিক চাপে ছিলেন না বলে তার হয় নি। এখন মানসিক চাপে আছেন বলে চোখে জয়বাংলা রোগ হয়েছে। মানসিক চাপটা অবন্তিকে নিয়ে।
কালাম তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমনিতে সে কুঁজো না। বুক টান করে হাঁটে। শুধু তার সামনেই কুঁজো হয়ে দাঁড়ায়। সরফরাজ বললেন, সাইকেলে করে এসেছে মেয়েটা কে?
শামিমা আপু।
শামিমা আপু বললে তো আমি কিছু বুঝব না। শামিমা আপুটা কে?
অবন্তি আপুর বান্ধবী। ফ্রেন্ড!
সরফরাজ বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি কোনোদিন এই মেয়েকে দেখলাম না। অবন্তির কাছে তার নাম শুনলাম না। সে হয়ে গেল অবন্তির বান্ধবী?
শামিমা আপু পেরায়ই আসেন।
প্রায়ই যদি আসে আমার সঙ্গে দেখা হয় না কেন?
আপনি দুপুরে খানার পরে যখন ঘুম যান, তখন শামিমা আপু আসে।
সরফরাজ কঠিন গলায় বললেন, তুমি ওই মেয়ের কাছে যাও। তাকে আসতে বলো।
কালাম বলল, এখন যাওয়া যাবে না।
এখন যাওয়া যাবে না কেন?
উনারা দুইজন দরজা বন্ধ কইরা কী জানি করেন।
সরফরাজ খানের মাথায় চক্কর দিল। দরজা বন্ধ করে কী জানি করে, এর মানে কী? খুব খারাপ কিছু না তো? কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ!
সরফরাজ খান নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, যাও, বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যখন দরজা খুলবে তখন তাকে নিয়ে আসবে।
জি আচ্ছা।
দরজার সঙ্গে কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। ওরা কী কথা বলে তা আমার জানা দরকার।
জি আচ্ছা স্যার।
সরফরাজ তিক্ত গলায় বললেন, দরজা বন্ধ করে গল্প করার কী আছে তাও তো বুঝলাম না।
কালাম বলল, শামীমা আপু ছিগরেট গাঁজা এইগুলা খায় তো, এইজন্যে দরজা বন্ধ রাখে।
সরফরাজ হতভম্ব গলায় বললেন, কী বলো!
কালাম বলল, কথা সত্য স্যার। আমি দুইবার উনারে ছিগরেট আইনা দিছি। উনি খায় কেটু ছিগারেট। কড়া আছে। পাকবাহিনী এই ছিগারেট খাইত।
সরফরাজ নিজেই একতলায় নেমে এলেন, অস্বস্তি নিয়ে বন্ধ দরজার পাশে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ভেতর থেকে কোনো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না, তবে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার ইচ্ছা করছে লাথি দিয়ে দরজা ভেঙে শামীমা মেয়েটিকে বের করেন। এই কাজটা করলে অবন্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হবে বলে কাজটা করতে পারছেন না।
ছেলেদের মতো পোশাক পরা মেয়েটির নাম শামীমা না। তার নামও ছেলেদের মতো। শামীম। পুরো নাম শামীম শিকদার। সে মাওবাদী সিরাজ সিকদারের ছোটবোন। পেশায় ভাস্কর। কিছুদিন আগে ভাস্কর্যে সে প্রেসিডেন্ট পদক পেয়েছে।
শামীম সিকদারের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নশাস্ত্রের লেকচারার হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা আছে। শামীম শিকদার হুমায়ূন আহমেদের প্রথম গ্রন্থ নন্দিত নরকের প্রচ্ছদ শিল্পী। বইয়ের দুটি মুদ্রণে শামীম শিকদারের প্রচ্ছদ ছাপা হয়। তারপর প্রচ্ছদ করেন কাইয়ুম চৌধুরী। শামীম শিকদারকে প্রায়ই দেখা যেত সাইকেল চালিয়ে (মাঝে মাঝে মোটর সাইকেল) হুমায়ূন আহমেদের বাবর রোডের বাসায় (শহীদ পরিবার হিসেবে সরকার থেকে পাওয়া) উপস্থিত হতো। সে সারাক্ষণ হুমায়ূন আহমেদের মায়ের সঙ্গে থাকত। গলা নিচু করে গুটুর গুটুর গল্প করত।
