মেজর রশীদ বললেন, আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি জবাব দেন নি। প্রশ্নের জবাব জানা বিশেষ প্রয়োজন। প্রশ্নটা আবার করছি। দেশের পরম সংকটে আমরা কি আপনাকে পাব?
খন্দকার মোশতাক বললেন, আমরা মানে কারা?
সেনাবাহিনী।
খন্দকার মোশতাক মূল প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বললেন, গরম কী পড়েছে দেখেছেন? ফ্যানের বাতাসে লু হাওয়া।
রশীদ বললেন, লু হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় দেশপ্রেমিকদের কর্তব্য কী?
খন্দকার মোশতাক বললেন, খানা খান। খানা দিতে বলি।
খানা খাব না। আমি আপনার কাছে খানা খেতে আসি নি। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্যে এসেছি।
মোশতাক বললেন, বাড়িতে আজ মোরগপোলাও হয়েছে। খেয়ে দেখেন, মুখে অনেক দিন স্বাদ লেগে থাকবে। তা ছাড়া আপনি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছেন। খেতে খেতে বলুন। আমি এখন হা-না কিছু বলব না। আমি শুধু শুনে যাব।
মেজর রশীদ বললেন, আপনার সম্পর্কে একটি বিশেষ গল্প প্রচলিত। গল্পটির সত্য-মিথ্যা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।
খন্দকার মোশতাক শীতল গলায় বললেন, কী গল্প?
একবার নাকি আপনি, পরিকল্পনা পরিষদ প্রধান ড. নুরুল ইসলাম এবং বঙ্গবন্ধু নাশতা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ বঙ্গবন্ধু বললেন, গত রাতে আমি অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছি।
আপনি জানতে চাইলেন, কী স্বপ্ন?
বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আল্লাহপাক আমাকে কোরবানির নির্দেশ দিলেন। তারপর ঘুম ভেঙে গেল। এখন আমি কোরবানি দিতে প্রস্তুত। কোরবানি দিতে হয় সবচেয়ে প্রিয়জনকে। এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয়জন হলো খন্দকার মোশতাক। ভাবছি তাকেই কোরবানি দিব।
মেজর রশীদ কথা শেষ করে তাকিয়ে রইলেন। খন্দকার মোশতাক বললেন, শেখ মুজিবের কোনো রসবোধ নেই। ভুল সময়ে ভুল রসিকতা করে তিনি আনন্দ পান। আর আমরা পেঙ্গুইনরা তাঁকে আনন্দ দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত থাকি। এটা আমাদের নিয়তি।
মেজর রশীদ বললেন, গল্পটায় কি সত্যতা আছে?
না।(১)
বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ত্রি বত্রিশ নম্বর বাড়িতে এসেছেন RAW (ভারতের সিক্রেট সার্ভিস)-এর রিসার্চ ও অ্যানালাইসিস উইংয়ের পরিচালক কাও। তিনি এসেছেন পানবিক্রেতার ছদ্মবেশে।(২)
শেখ মুজিবুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, আমি আপনাকে চিনি। অনেকেই আপনাকে চেনে। আপনার ছদ্মবেশ ধরার প্রয়োজন পড়ল কেন?
কাও বললেন, মাঝে মাঝে নিজেকে অন্যরকম ভাবতে ভালো লাগে বলেই ছদ্মবেশ। আপনাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মেজর রশীদ, ফারুক, লে. কর্নেল ওসমানী এই নিয়ে আলোচনায় বসেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায়। এই বিষয়ে আপনাকে তথ্য দিতে এসেছি।
শেখ মুজিব বললেন, আপনারা অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ। পানবিক্রেতার ছদ্মবেশে যে আমার কাছে তথ্য দিতে আসে তার কথায় আমার বিশ্বাস নেই।
আপনার সামনে মহাবিপদ।
মহাবিপদ আমি পার করেছি। পাকিস্তানের কারাগারে যখন ছিলাম তখন বিপদ আমার ঘাড়ে বসে ছিল। এখন বিপদ ঘাড় থেকে নেমেছে।
ঘাড় থেকে নামে নি স্যার।
শেখ মুজিব বললেন, যাদের কথা আপনি বলছেন তারা আমার সন্তানসম। আমি এই আলোচনা আর চালাব না। আমার শরীরটা ভালো না। যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি ঘুমুতে যাব।
স্যার, আপনি ভুল করছেন।
ভুল আমি করছি না। আপনারা করছেন।
আমার কথা আপনি আমলে নিচ্ছেন না—ভালো কথা। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার কথা কি আমলে নেবেন?
শেখ মুজিব উঠে দাঁড়ালেন। পানবিক্রেতার সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যাওয়া তার কাছে অর্থহীন মনে হলো।
——-
সূত্র-১: গল্পটির সত্যতা আছে। বাংলা একাডেমী পত্রিকা উত্তরাধিকার, শ্রাবণ সংখ্যা, ১৪১৭ দ্রষ্টব্য।
সূত্র-২: Inside RAW, the Story of India Secret Service. Asoka Raina. Vikas Publication, New Delhi, India.
RAW agents received information of a meeting between Major Rashid, Major Farooq and Lt Col Usmani at Zia-ur-Rahman’s residence. The decision, among other things, had centred on the coup. During the three-hour meeting one of the participants had doodled on a scrap of paper, which had been carelessly thrown into the waste basket. The scrap had been collected from the rubbish pile by a clerk and passed on to the RAW operative. The information finally reached New Delhi.
Kao, convinced that a coup was in the offing, flew into Dacca, under cover of a pan exporter. After his arrival at Dacca, he was driven to a rendezvous arranged beforehand. Mujib is reported to have found the exercise highly dramatic and just could not understand why kao could not have come to see him officially.
The Kao-Mujib meeting lasted one hour. Kao was unable to convince Mujib that a coup was brewing and that his life was threatened, in spite of being given the names of those suspected to have been involved.
সরফরাজ খান
সরফরাজ খান দোতলায় জানালার পাশে বসে আছেন। জানালার কাঠের খড়খড়ি খানিকটা নামানো। তিনি খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বাড়ির বাইরের উঠান খানিকটা দেখতে পাচ্ছেন। সরফরাজ খানের অনেক বিচিত্র অভ্যাসের মধ্যে একটি হলো জানালার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা। এই তাকিয়ে থাকা অর্থহীন। তাঁর বাড়িতে কেউ ঢোকে না, কেউ বেরও হয় না। বাড়ির দারোয়ান কালাম মাঝে মধ্যে পা ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। বিলাপের সুরে শব্দ করে। মনে হয় গান করে। কালামের গান শোনার আগ্রহে সরফরাজ খান অপেক্ষা করেন—এ রকম মনে করার কোনো কারণ নেই।
