অবন্তির সঙ্গে শামীম সিকদারের পরিচয়ের সূত্র হচ্ছে, অবন্তি আর্ট কলেজ থেকে তাকে ধরে এনেছে। শামীম শিকদারের দায়িত্ব মাটি দিয়ে অবন্তির একটি আবক্ষ মূর্তি তৈরি করা। অবন্তি এই মূর্তি পাঠাবে তার মাকে।
সরফরাজ মোটামুটি বিচারকের আসনে বসে অবন্তির বান্ধবীর অপেক্ষা করছেন। বসেছেন কাঠের চেয়ারে। সোফায় আয়েশ করা বসা না। তার হাতে দৈনিক ইত্তেফাক। গোল করে চোঙার মতো করা। চোঙা কী কাজে আসবে তা বোঝা যাচ্ছে না।
অবন্তি ঘরে ঢুকে হালকা গলায় বলল, আমাকে ডেকেছ?
সরফরাজ বললেন, তোকে তো ডাকি নি। তোর বান্ধবী কোথায়?
চলে গেছে।
চলে গেছে মানে কী? তাকে বলা হয়েছে আমার সঙ্গে দেখা করতে।
অবন্তি বলল, সে তোমার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নি। চোখমুখ শক্ত করে বসে থাকবে না। কী জানতে চাও, আমাকে জিজ্ঞেস করো। আমি বলে দেব।
ওই মেয়ে নাকি গাঁজা খায়?
হুঁ, খায়।
গাঁজা খাওয়া ক্যাটাগরির একটি মেয়ের সঙ্গে তোর পরিচয় কীভাবে?
অবন্তি বলল, তুমি এত উত্তেজিত হয়ো না। এই মেয়ে গাঁজা খাচ্ছে তাতে কী হচ্ছে? আমি তো তার কাছ থেকে গাঁজা খাওয়ার ট্রেনিং নিচ্ছি না।
সরফরাজ খান বললেন, তুই কিসের ট্রেনিং নিচ্ছিস?
অবন্তি হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি কোনো ট্রেনিং নিচ্ছি না। আমি শুধু তার সামনে এক ঘণ্টা নেংটো হয়ে বসে থাকি।
কী বললি?
অবন্তি বলল, কী বলেছি তা তুমি ভালোই শুনেছ। দ্বিতীয়বার বলব না। আমার বান্ধবী আমার আবক্ষ মূর্তি বানাচ্ছে। আমি নিশ্চয়ই লেপ-তোষক গায়ে দিয়ে মূর্তির জন্যে সিটিং দেব না।
তুই ওই মেয়ের সামনে নগ্ন হয়ে বসে থাকিস?
হ্যাঁ।
আমাকে এটা বিশ্বাস করতে বলিস?
বিশ্বাস করতে না চাইলে করবে না।
অবন্তি ঠোঁট গোল করে শিস বাজানোর চেষ্টা করল। এই চেষ্টার পেছনের উদ্দেশ্য একটাই—দাদাজানকে রাগানো। তবে আজ মনে হয় তিনি রাগবেন না। বিস্ময়ে হতভম্ব হওয়া মানুষ রাগতে পারে না।
অবন্তি দাদার দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে কুঁ কুঁ শব্দ করতে লাগল। সরফরাজ অবাক হয়ে বললেন, এমন করছিস কেন?
অবন্তি বলল, ভেঙাচ্ছি।
But why?
তোমার ওপর রাগ লাগছে, এইজন্যে ভেঙাচ্ছি।
হতভম্ব সরফরাজ বললেন, কেন রাগ লাগছে, সেটা কি জানতে পারি?
না, জানতে পারো না। কারণ আমি নিজেই জানি না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি, আমার কিসের ব্যথা যদি জানতেম তাহলে তোমায় জানাতেম।’ কথাগুলি মনে হয় উলট-পালট হয়ে গেল। স্যারের কাছ থেকে জানতে হবে।
তোর স্যার সব জানে?
সব জানে না, তবে যা জানার তা জেনে দিতে পারে।
তাহলে তো বিরাট কৰ্মীপুরুষ।
ঠাট্টা ঠাট্টা গলায় কথা বলছ কেন দাদাজান? পুলিশের এসপি হয়ে তুমি যেমন কর্মীপুরুষ, রাস্তার মোড়ে যে প্রৌঢ়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একমনে ইট ভাঙে সেও কমীমহিলা।
দরজায় কড়া নড়ছে। সরফরাজ নিজেই দরজা খুলতে গেলেন। এই সময় পিয়ন আসে। পিয়নের হাত থেকে চিঠি সংগ্রহ করা তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেন। চিঠি পড়ার পর যার যার চিঠি তিনি তাকে দেন। চিঠি Edit-ও করা হয়। অপছন্দের কিছু লাইন কেটে দেওয়া হয়। সব চিঠি যে প্রাপকের কাছে দেওয়া হয় তাও না। নষ্ট করে ফেলা হয়। খাম খোলার যাবতীয় সরঞ্জাম তার কাছে আছে।
চিঠি এসেছে দুটা। একটা পাঠিয়েছেন অবন্তির মা ইসাবেলা। হঠাৎ করে চিঠি আসার অর্থ কী তিনি বুঝতে পারছেন না। এই বদ মহিলা বছরে দু’টা, খুব বেশি হলে তিনটা, চিঠি পাঠায়। সরফরাজ খান ভুরু কুঁচকে চিঠি সরিয়ে রাখলেন। সময় নিয়ে খুলতে হবে, সময় নিয়ে পড়তে হবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
দ্বিতীয় চিঠি দেখে সরফরাজ খানের ভুরু কুঁচকালো এবং তার ঘাড় ব্যথা করতে লাগল। হঠাৎ প্রেসার বেড়ে গেলে তার ঘাড় ব্যথা করে। চিঠি লিখেছে গদিনশীন পীর হাফেজ জাহাঙ্গীর। অবন্তিকে লেখা চিঠি। বদমাইশ এখনো অবন্তিকে তার স্ত্রী মনে করছে। বদমাইশটাকে জুতাপেটা করা দরকার।
সরফরাজ খান চিঠি নিয়ে তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
চিঠি খুললেন। এই চিঠি খুলতে সাবধানতার কিছু নেই। চিঠি অবন্তির কাছে দেওয়া হবে না। ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে। এতে দোষের কিছু নেই। পরিবার হলো রাষ্ট্রের মতো। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ থাকে। তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে। পরিবারেও গোয়েন্দা বিভাগ থাকা বাঞ্ছনীয়। এই গোয়েন্দা বিভাগ পরিবারের কল্যাণে কাজ করবে।
চিঠি হুবহু তুলে দেওয়া হলো—
আমার প্রাণপ্রিয় পত্নী মায়মুনা
ওরফে অবতি!
সরফরাজ মনে মনে বিড়বিড় করলেন, বদমাইশ! নামটাও জানে না। বলে অবতি। এদিকে প্রাণপ্রিয় পত্নী। তোকে যদি নেংটা করে চক্কর না দেওয়াই আমার নাম সরফরাজ খান না।
পরসমাচার এই যে, আল্লাহপাকের অসীম মেহেরবানিতে আমি ভালো আছি। সোবাহানাল্লাহ। সোবাহানাল্লাহ। সোবাহানাল্লাহ।
তোমার স্বাস্থ্যও নিশ্চয় ভালো আছে। আমি প্রতি বৃহস্পতিবার আছরের ওয়াক্তে তোমার জন্য খাস দিলে দোয়া করিতেছি।
প্রতি মাসের প্রথম শনিবারে জ্বিনসহ যে দোয়া করা হয় তাহাতেও তোমার নাম উল্লেখ করি। গত বুধবার তিন ঘটিকায় তোমার পত্র পাইয়া আমি যারপরনাই আনন্দিত হইয়াছি। বলিলে বিশ্বাস হইবে না, আমার দুই চোখেই পানি আসিয়াছে। গদিনসীন পীর হিসাবে আমি কী করি এবং তোমার শ্বশুরের মৃত্যুর পর হুজরাখানা কেমন চলিতেছে তা জানার আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছ। আলহামদুলিল্লাহ, সোবাহানাল্লাহ।
