বীনু হেসে ফেলল। এবং সহজ হয়ে গেল। আমি বললাম, দেখ বীনু, বখা ছেলে বলতে যা বোঝায় আমার এই ভাই সে রকম। গুণ্ডা হবার ক্ষমতা তার নেই। গুণ্ডা হতে হলে সাহস লাগে, কিছু বুদ্ধিও লাগে। এই দুয়ের কোনটাই তার নেই। তার প্রধান কাজ হল –আজেবাজে কিছু বন্ধু বান্ধবের পেছনে ঘোরা। ওদের খেদমত করা। মাঝে মাঝে মদ-টদ খেয়ে বাসায় ফিরে। এরকম একটা ছেলেকে তুমি কি জেনেশুনে বিয়ে করবে?
না।
না করাই উচিত। আমি কখনোই করতাম না। যেটা আমি করব না সেটা তোমাকে করতে বলতে পারি না। তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি চাই তোমার খুব ভাল বিয়ে হোক।
আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে কেন?
তোমাকে আমার পছন্দ হবার প্রধান কারণ হল –তোমার স্বভাব অনেকটা আমার মার মত। মাও তোমার মত শুধু শুধু হাসতেন। বাবলু যখন প্রথমবার আই এ. ফেল করে মাকে গম্ভীর গলায় বলল –মা, রেজাল্ট হয়েছে। ফেল করেছি। মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন– পা ছুঁয়ে সালাম কর। বাবলু রাগী গলায় বলল, সালাম করব কেন? মা বললেন, পরীক্ষায় পাশ করলে দোয়া নেবার জন্যে মানুষ সালাম করে। তুই ফেল করেছিস, তোর তো ডবল দোয়া দরকার। তুই দুবার সালাম করবি। বলেই মার কি যে হাসি!
বীনু হাসতে শুরু করেছে। আমিও হাসছি। অনেকদিন পর এ বাড়িতে হাসির তুফান উঠল। হাসির শব্দে বিস্মিত হয়ে বাবা রান্নাঘরে চলে এলেন। বাবা বীনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, এ কে?
এ হল বীনু। ওর সঙ্গে বাবলুর বিয়ে হবে। আমি এই মেয়েকে ছাড়ব না। এর জীবন নষ্ট হলে নষ্ট হবে –ওকে থাকতে হবে আমার সঙ্গে।
বাবা তাকিয়ে আছেন। কিছু বুঝতে পারছেন না। আবার যেন সব কিছুই বুঝে ফেলেছেন। তাঁর চোখে বিস্ময় এবং খানিকটা বিষণ্ণতা। বীনু বাবাকে সালাম করতে গেল। বাবা তাকে জড়িয়ে ধরলেন ধরা গলায় বললেন, মা, তুমি আমার ছেলেটাকে ঠিক করে দাও। তুমি পারবে। তোমাকে পারতেই হবে।
.
বীনু সারাক্ষণ আমার পাশে পাশে রইল। ঘরে বাজার ছিল না। আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজার থেকে বাজার করে আনলাম। ও অনেক গল্প করল। সরল ধরনের দুঃখ নিয়ে গল্প। অভাব-অনটনের গল্প।
বুঝলেন আপা, আমাদের সংসারটা আমাকে চালাতে হয়। মা কোন হিসাব নিকাশ করতে পারেন না। হিসাব-নিকাশ কি রাখবেন, তার কোন মেয়ের কি নাম সেটাই তাঁর মনে থাকে না। অনেকগুলি মেয়ে হলে যা হয়। নাম রাখার সময় গণ্ডগোল করেছেন। মিল দিয়ে দিয়ে নাম বীনু, লীনু, ঝিনু, নিনু, টিনু … কে নাকি মাকে বলেছিল মিল দিয়ে নাম রাখলে বেহেশতে একসঙ্গে থাকা যায়। মা আমাদের বেহেশতে এক সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে গিয়ে এমন ঝামেলা করেছেন। তাঁর হয়ত দরকার লীনুকে, তিনি ডাকছেন ঝিনু, ঝিনু–। যে কথা বলছিলাম আপা, মাসের এক তারিখে বেতন এনে বাবা পুরো টাকাটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেন, খুব সাবধানে খরচ করবি। খুব সাবধান। একটা পয়সা যেন এদিক-ওদিক না হয় –কষ্টের পয়সা। আপনারা তো আপা বড়লোক মানুষ, আমাদের সমস্যা বুঝবেন না। মাসের ত্রিশটা দিন ত্রিশটা বৎসরের মত। প্রায়ই লোকজনদের বলতে শুনি, টাকাপয়সা তুচ্ছ। যারা এসব বলে আমার ইচ্ছা করে এদের কিছুদিন এনে আমাদের সংসারে রাখি। মাসখানিক থাকলেই এরা বলতে শুরু করবে– পৃথিবীর সবচে বড় জিনিস হল অর্থ।
তোমার বাবা সম্পর্কে তো তুমি কিছু বলছ না? উনি কেমন?
সাধারণ একজন মানুষ। মন্দও না, ভালও না। সারাক্ষণ মেজাজ খারাপ করে। থাকেন। দিনের মধ্যে দশবার বলেন, মাকে বিয়ে করে তাঁর এই হাল। মা হচ্ছে। মেয়ে-তৈরীর একটা যন্ত্র বিশেষ। মাঝে মাঝে এমন হয় –আমরা বোনরা মিলে ঠিক করি সবাই এক সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাব।
কোথায় পালাবে?
কোথায় পালাব ঠিক করতে পারি না বলেই তো পালানো হয় না। বিয়ে করে অন্য সংসারে চলে যাওয়াও এক ধরনের পালানো। তাই না আপা?
হ্যাঁ তাই।
আমার বিয়ে হলে বাবার খুব সুবিধা হবে। আমার ছোট দুই বোন খুবই রূপবতী। ওদের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে হবে যাবে। ওদের ভাল ভাল বিয়ের প্রস্তাব আসছে। একজন হল ইউনিভার্সিটির টিচার। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা যাচ্ছে। ওদের খুব আগ্রহ। বাবা রাজি হচ্ছেন না।
রাজি হচ্ছেন না কেন?
বাবা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, বড় মেয়ের বিয়ে না দিয়ে আমি ছোট মেয়েদের বিয়ে দেব না। অসম্ভব। এম্নিতেই আমার মেয়ের কষ্টের সীমা নেই। তাকে বাদ দিয়ে ছোট বোনদের বিয়ে দিয়ে কষ্ট বাড়াব –তা হবে না।
তুমি একটু আগে বললে তোমার বাবা ভালও না, মন্দও না। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তিনি নিতান্তই ভাল মানুষ।
তাঁর ভালমানুষি এই একটাই –আমাকে খুব আদর করেন। অতিরিক্ত আদর। এটাও তো ঠিক না। সব মেয়েকেই সমান আদর করা উচিত না?
দুপুরে খাবার পর ওকে নিয়ে এক সঙ্গে বিছানায় গড়াতে গেলাম। অনেকদিন পর দুপুরে কথা বলার একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। আমি বললাম, বীনু, আমি ঝোঁকের মাথায় বাবাকে বলেছি, এই মেয়েটিকে আমি যেতে দেব না। এখানে রেখে দেব। বাবলুর সঙ্গে বিয়ে দেব। তুমি ঝোঁকের কথায় কোন গুরুত্ব দিও না। ভালমত ভাব। ভেবে যদি ঠিক কর তুমি আমার ভাইকে বিয়ে করবে তাহলে আমি একটা কাজ করব।
কি কাজ?
বাবাকে বলব এই বাড়িঘর তোমাকে লিখে দিতে।
