কেন?
সঙ্গত কারণেই এটা করতে হবে। নয়ত বাবলু সব বিক্রি-টিক্রি করে তোমাকে নিয়ে ভিক্ষা করতে বের হবে।
বীনু গম্ভীর গলায় বলল, এই কাজ কখনো করবেন না। এটা করলে মনে হবে আপনি লোভ দেখিয়ে আমাকে রাজি করাচ্ছেন। আমি এম্নিতেই রাজি। আমি জানি এরচে ভাল বিয়ে আমার হবে না।
.
বিকেলে বাবলু চলে এল। আমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আপা, ঐ ছোঁকরি আছে না চলে গেছে?
আছে।
ওকে বের হতে বল, দিয়ে আসি। পান্নাভাবী যে এক একটা ঝামেলা তৈরি করে ভাল লাগে না! অসহ্য বোধ হয়।
বাবলু সন্ধ্যাবেলা বীনুকে পৌঁছে দিয়ে আসতে গেল। ফিরল রাত এগারোটায়। মহা বিরক্ত।
ঐ মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে কি যে ঝামেলায় পড়েছি কহতব্য নয়। গিয়ে দেখি হেভী গ্যাঞ্জাম। মেয়েটার বাবা তার ছোট মেয়েকে হেভী চড় লাগিয়েছে। মেয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়ে মাথাটাথা ফাটিয়ে রক্তারক্তি। বীনু তার বোনের অবস্থা দেখে শুরু করল মরাকান্না। কি আর করি বীনুকে! তার বোনকে নিয়ে গেলাম মেডিকেলে। স্টিচ করালাম, এটিএস দিলাম। বাসায় পৌঁছে দিলাম। তারপর আর আমাকে আসতে দেবে না। ভাত খেয়ে আসতে হবে। চিন্তা কর গ্যাঞ্জাম।
তুই কি করলি? ভাত খেয়ে এলি?
উপায় কি?
কি দিয়ে খেলি?
আজেবাজে খাওয়া– ডাল, ছোটমাছ। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম –ডিম ভেজে দাও।
তখন বীনু কি করল? নিশ্চয়ই হেসে ফেলল?
বাবলু বিস্মিত হয়ে বলল, তুই কি করে বুঝলি?
আন্দাজে বলেছি।
কারেক্ট আন্দাজ করেছিস। বীনুর এমন হাসি! এর মধ্যে হাসার কি আছে? তারপর খেতে বসে আরেক যন্ত্রণা! সব কটা বোন গোল হয়ে আমার সামনে বসা।
বোনগুলি সুন্দর না খুব?
হ্যাঁ সুন্দর। পরীর হাট।
তোকে ডিম ভেজে দিয়েছিল?
হ্যাঁ।
আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললাম –বাবলু, তুই বীনু মেয়েটাকে বিয়ে করবি?
বাবলু হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
.
০৮.
বসার ঘরে চশমা পরা অল্পবয়েসী একটা ছেলে বসে আছে। আমি ঘরে ঢুকে চমকে গেলাম। ছেলেটি.আরো বেশি চমকাল। নার্ভাস গলায় বলল, বাবলু সাহেব আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে সিগারেট কিনতে গেছেন।
ও কি বাবলুর বন্ধু বান্ধবদের কেউ? কথাবার্তায় সে রকম মনে হচ্ছে না। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হালকা সবুজ শার্টের উপর সাদা স্যুয়েটার। রোগা পাতলা একটি ছেলে। বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। এ বাবলুর বন্ধু হতে পারে না। বাবলুর বন্ধুরা এত বিনয়ী নয়। তা ছাড়া তারা ঘরেও ঢুকে না। ভিডিও দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে আড্ডা দেয়।
আমি বললাম, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোস।
তুমি বলাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। বাবলু আমার এক বছরের ছোট। তার চেনামানুষরা তার বয়েসী হবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই। তাছাড়া বাবলু আমার ছোট ভাই এবং তাকে তুই করে বলি বলেই তার পরিচিত সবাইকে তুমি বলব সেটাই-বা কেমন কথা? তবে ছেলেটিকে দেখেই ফস করে মুখ দিয়ে তুমি বের হয়ে। গেছে। এখন আপনি বলা অর্থহীন। নিজের অস্বস্তি ঢাকার জন্যেই কিছু কথা বলতে হয়। কথা খুঁজে পাচ্ছি না।
তুমি কি চা খাবে?
জ্বি না। এক গ্লাস পানি খেতে পারি। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না –কারো হাতে পাঠিয়ে দিলেই হবে।
আমি নিজেই পানি নিয়ে এলাম। সে যেভাবে পানি খেল তাতে মনে হল খুবই তৃষ্ণা পেয়েছে। বাবলু এখনো ফেরেনি। সিগারেট কিনতে তার এতটা সময় লাগার কথা না। সামনেই দোকান, যাবে আর নিয়ে আসবে।
বাবলুর সঙ্গে কি দরকার?
উনি বলছিলেন আপনার এই বাড়ি ভেঙে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং করবেন। আমি একজন আর্কিটেক্ট –গত মাসে আমার রেজাল্ট হয়েছে।
ও আচ্ছা। বাবলু তোমাকে নিয়ে এসেছে?
জ্বি। আমি আপনাদের কাছেই থাকি –মেইন রোডের ওপাশে হলুদ রঙের একটা তিনতলা দালান আছে না? তার ঠিক পেছনের দোতলা বাড়িটা আমাদের।
ও আচ্ছা। বাবলুর সঙ্গে তোমার পরিচয় কি ভাবে?
আমি আর্কিটেক্ট শুনে উনি পরশুদিন গিয়েছিলেন। উনি হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বাড়ির ডিজাইন করবার জন্যে আমার কাছে গিয়েছিলেন। আমি এত খুশি হয়েছিলাম। আমি উনাকে বলেছিলাম আপনার বাড়ির ডিজাইন আমি বিনা টাকায় করে দেব।
বাবলুর জন্যে তো ভালই হল।
নতুন পাশ করা আর্কিটেক্টের উপর তো মানুষের কনফিডেন্স থাকে না– তাদের অনেক কষ্ট করে উপরে উঠতে হয়।
সেটা তো সবার জন্যেই সত্যি। বাবলু বোধহয় সিগারেট আনতে গিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। তুমি না হয় অন্য আরেকদিন এসো। তুমি করে বলছি বলে রাগ করছ না তো? তোমাকে বাচ্চা বাচ্চা দেখাচ্ছিল –তুমি বলে ফেলেছি।
তাতে কোন অসুবিধা নেই। আমি কি আপনাদের বাড়িটা একটু দেখতে পারি? এর মধ্যে বাবলু সাহেব হয়ত চলে আসবেন।
বাড়ি দেখতে কোন অসুবিধা নেই, দেখ।
আপনি কিন্তু এখনো আমার নাম জানতে চাননি –আমার নাম ইস্তিয়াক।
ও আচ্ছা আচ্ছা –এসো, বাড়ি দেখ।
ইস্তিয়াক খুব উৎসাহ নিয়ে ভেতরের উঠোনে এসে দাঁড়াল। হালকা গলায় বলল, পুরানো বাড়ির একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। আপন আপন লাগে। আধুনিক বাড়িগুলিতে নিজেদের অতিথির মত লাগে। আচ্ছা, আপনার কাছে কি গজফিতা আছে?
কেন বল তো?
একটু মাপব।
গজফিতা নেই।
আচ্ছা, গজফিতা আমি নিয়ে আসব। আপনি আমাকে একটা কাগজ আর পেন্সিল দিতে পারবেন? কয়েকটা পয়েন্ট নোট করে নিয়ে যেতাম।
কাগজ আর পেন্সিল অবশ্যই দিতে পারব। মুশকিল হচ্ছে আমি এখন বেরুব। তুমি বরং বাবলুর সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্য একদিন এসো।
