পান্নাভাবী বললেন, সালাম করতে চাচ্ছে, বাধা দিচ্ছ কেন? সালাম করবে না? মুরুব্বীদের সালাম না করলে দোয়া পাবে কোত্থেকে? দোয়া তো গাছ থেকে পড়ে না। মানুষের কাছ থেকেই আসে।
বোঝা যাচ্ছে সালামের ব্যাপারটা পান্নাভাবীই শিখিয়ে দিয়েছেন। মনে হয় তিনি আটঘাট বেঁধেই নেমেছেন।
রাত্রি, বাবলু কি ঘরে আছে?
হ্যাঁ আছে। ঘুমুচ্ছে।
ওকে ডেকে তোল। ওর সঙ্গে কথা আছে।
বাবলুকে ডেকে তুলতে হল না, সে নিজেই উঠে এল। অপরিচিত তরুণী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে –সে ব্যাপারটাকে মোটেই পাত্তা দিল না। রান্নাঘর থেকে লবণ এনে সবার সামনে দাঁত মাজতে বসল। পান্নাভাবী বললেন –দাঁতে লবণ ঘসছিস কি জন্যে? কি হয়েছে?
বাবলু গম্ভীর গলায় বলল, কিছু হয়নি। দাঁত ঠিক রাখতে হবে না? দাঁত ঠিক রাখার একটাই উপায় –লবণ। চিনি হল দাঁতের বিষ। লবণ দাঁতের অমৃত।
কে বলেছে তোকে?
বলতে হবে কেন? এটা হল জেনারেল নলেজ। সামুদ্রিক মাছের দাঁত এত ভাল হয় কেন? লোনা পানিতে থাকে বলেই এই অবস্থা।
বীনু ফিক করে হেসে ফেলেছে। হাসি গোপন করার জন্যে চট করে সে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাতে হাসি লুকানো যাচ্ছে না। হাসির উচ্ছ্বাসে তার শরীর কাঁপছে। তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে আমার পছন্দ হয়ে গেল। হালকা-পাতলা মেয়ে। গায়ের রঙ শ্যামলা নয়, কালোই বলতে হবে। সেই কালোর স্নিগ্ধতা চোখে পড়ার মত। এক ধরনের মানুষ আছে যাদের দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর কোন দুঃখ কষ্ট ওদের স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখে না। এই মেয়ে মনে হয় সেই জাতের।
পান্নাভাবী বাবলুর দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, বাবলু, তুই কি আমার একটা উপকার করতে পারবি?
কি উপকার?
বীনুর দিকে একটু তাকিয়ে দেখ– এ হল আমার দূর-সম্পর্কের বোন। আমার এখানে বেড়াতে এসেছে। সারাদিন থাকবে, বিকেলে চলে যাবে। তুই বিকেলে ওকে একটু বাসায় পৌঁছে দিবি। পারবি না?
না।
না কেন? ও থাকে গোরানে। একা একা যাবে এতদূর?
বাবলু বিরক্ত হয়ে বলল, ও একা একা যাবে না দোকাতিকা যাবে ওটা তার। ব্যাপার। আমার কাজ আছে।
বীনু দেখি আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে হাসছে। হাসির গমকে তার শরীর কাঁপছে। বাহ, খুব চমৎকার মেয়ে তো!
পান্নাভাবী বললেন, কি কাজ?
তুমি তা জেনে কি করবে? শতেক কাজ।
বিকেলে এক ফাঁকে একটু সময় করতে পারবি না?
না
বিপদের সময় সামান্য সাহায্যও করবি না?
নো।
বাচ্চা একটা মেয়ে, একা একা এতদূর যাবে?
বাবলু মাথা ঘুরিয়ে বীনুর দিকে একবার তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল –বাচ্চামেয়ে তুমি কোথায় দেখলে? ঢাকা শহরে বাস করলে একা একা ঘোরাফেরা করতেই হবে। এখান থেকে ওখানে গেলেই যদি পুলিশ স্কর্ট লাগে তাহলে তো সমস্যা। পুরো দেশটাই এখন মেয়েদের হাতে –খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা বিরোধী দলের প্রধান, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান জাহানারা ইমাম … এই অবস্থায় একটা মেয়ে একা একা গোরান যেতে পারবে না?
বীনু বলল, আমি একা একা যেতে পারব।
বাবলু খুশিখুশি গলায় বলল, গুড। ভেরী গুড!
সে মুখ ভর্তি পানি নিয়ে বিকট শব্দে গার্গল করতে লাগল। আমি বীনুকে বললাম, বীনু, তুমি এসো আমার সঙ্গে।
.
আমরা দুজন রান্নাঘরে বসে আছি। বীনুকে চা বানিয়ে দিয়েছি। সে শান্ত ভঙ্গিতে চা খাচ্ছে। মেয়েটি খুব যে শান্ত তা মনে হচ্ছে না। তার চোখে ছটফট ভাব আছে। একটা নীল রঙের সূতির শাড়ি পরেছে। এটিই বোধহয় তাদের পরিবারের সবচে দামী শাড়ি। ঠোঁটে লিপিস্টিক দিয়েছিল, পরে মুছে ফেলেছে –আভাস আছে। যে স্যাণ্ডেল পরে এসেছে সেই স্যাণ্ডেল জোড়া সস্তা এবং পুরানো। আমি বললাম, তারপর বীনু, বল তুমি কেমন আছ?
বীনু থমমত খেয়ে বলল, জ্বি ভাল আছি।
আমার ভাইটাকে তোমার কেমন লাগল?
বীনু হকচকিয়ে গেছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে আছে। এক সময় ক্ষীণ গলায় বলল, ভাল।
ও যে বোকা সেটা কি বুঝতে পেরেছ?
বীনু এক পলক আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে হা-সূচক মাথা নাড়ল।
আমি বললাম, তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিছু কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায়। তোমার বেলাতেও তাই হয়েছে। পান্নাভাবী তোমাকে এ বাড়িতে কেন এনেছেন তা তুমি ভাল করেই জান। আমিও জানি। কাজেই কোন রকম লুকোছাপা না করে এসো আমরা সহজভাবে কথা বলি। পারবে না সহজভাবে কথা বলতে?
পারব।
শোন বীনু, আমি নিজে খুব দুঃখী একটা মেয়ে। কেন দুঃখী তাও তুমি জান। পান্নাভাবী নিশ্চয়ই তোমাকে বলেছেন। বলেননি?
জি বলেছেন।
দুঃখী মেয়েরা সাধারণত ভাল হয়। আমিও ভাল। এই জন্যেই তোমার সঙ্গে সরাসরি সব কথা বলব। ঠিক আছে?
জ্বি, ঠিক আছে।
বাবলু সম্পর্কে পান্নাভাবী তোমাকে কি বলেছেন?
তেমন কিছু বলেননি।
ও পড়াশোনা কি করেছে সেসব কিছু বলেনি?
বলেছেন এম. এ. পড়তে পড়তে পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। টিচারের সঙ্গে কি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। উনি তো স্বাধীনচেতা ধরনের, কাজেই বলে বসলেন –আর পড়বেন না। তবে শিগগিরই না-কি আবার ভর্তি হবেন।
পান্নাভাবী কিছুই ঠিক বলেননি। ও তিনবার আই, এ. ফেল করে হ্যাটট্রিক করেছে। ফুটবলে হ্যাটট্রিক করলে খেলোয়াড়রা যেমন আনন্দিত হয় –পরীক্ষায় হ্যাটট্রিক করেও সে তেমনি আনন্দিত।
