বুড়ো খনখনে গলায় বলল, খবরদার নড়বি না। যেখানে আছস সেখানে দাঁড়ায়ে থােক। এক কদম নড়লে অসুবিধা আছে।
রুনি তার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। ইচ্ছা থাকলেও তার নড়ার ক্ষমতা নেই। ভয়ে ও আতঙ্কে তার শরীরের সমস্ত মাংসপেশি শক্ত হয়ে গেছে। সে চোখ বড় বড় করে দেখল, বুড়ো মানুষটা প্ৰায় বানরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। এই সুযোগে পালিয়ে যাওয়া যায়। পালাতে হলে বুড়ো যে দরজা দিয়ে ঢুকেছে। তাকেও সেই দরজা দিয়ে ঢুকতে হয়, সেটা সম্ভব না। সে দৌড় দিয়ে পুকুরঘাটে যেতে পারে। কিন্তু মা পুকুরের কাছে যেতে নিষেধ করেছেন। সে আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। বুড়ো যেভাবে লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকেছিল, সেভাবেই লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। এবারে তার হাতে দুনরা এক বন্দুক!
খবরদার নড়বি না। তোরে আমি গুল্লি করে দেব। তুই আমার ফুল ছিঁড়ছস।
রুনি জানে বুড়ো তাকে গুলি করবে না। অবশ্যই বন্দুকে গুলি নেই। খুব সম্ভব বন্দুকটা খেলনা বন্দুক। বড়রা অনেক সময় ছোটদের খেলনা বন্দুক দিয়ে ভয় দেখায়। তার বাবা একবার একটা পিস্তল তার দিকে তাক করে গুলি করেছিল। বিকট শব্দ হয়েছিল। শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলের মাথায় ছোট আগুন জ্বলে উঠেছিল। আসলে সেটা ছিল একটা সিগারেট লাইটার। বুড়োর হাতের বন্দুকটাও নিশ্চয়ই সে-রকম কিছু।
আল্লাহ খোদার নাম নে ছেমড়ি। আইজ তোর রোজ কিয়ামত।
রুনি চিৎকার করে তার মাকে ডাকল। কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
সফররাজ মিয়া তাঁর অভ্যাসমতো আকাশের দিকে বন্দুক তাক করে ফাঁকা গুলি করলেন। রুনি অজ্ঞান হয়ে জবা ফুলের উপর পড়ে গেল। সারা বাড়িতে একটা হৈচৈ পড়ে গেল।
রুনির জ্ঞান প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরল। কিন্তু তার গায়ের তাপ হু-হু করে বাড়তে থাকল। ঘরে থার্মোমিটার নেই, জ্বর কত উঠেছে বোঝার উপায় নেই। আসমানী স্তব্ধ হয়ে মেয়ের মাথার কাছে বসে আছে। মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে জ্বর দেখার ইচ্ছাও তার হচ্ছে না। জীবনটাকে অর্থহীন মনে হচ্ছে। আসমানীর ইচ্ছা করছে নির্জনে কোথাও গিয়ে কাদতে। এ বাড়িটা বিরাট বড়, নির্জনে কাদার মতো অনেক জায়গা আছে। রুনিকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। এরা দেখবে। এখন মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে, ডাক্তারের জন্য লোক গেছে। রুনির পাশে বসে থাকার কিছু নেই। আসমানী তারপরও বসে রইল। ডাক্তার এসে ওষুধ দিলেন। জ্বর কমে গেল। রুনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসল। আসমানী স্বাভাবিক হতে পারল না। সে সারারাত জেগে কাটিয়ে দিল। অদ্ভুত অদ্ভুত সব চিন্তা তার মাথায় আসছে।
কুমকুমের মা হঠাৎ যদি তাকে ডেকে বলেন, অনেকদিন তো হয়ে গেল, এবার তুমি অন্য কোথাও যাও। সে তাহলে যাবে কোথায়? মহিলা আগে যে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলতেন এখন তা বলেন না। আসমানী একদিন শুনেছে। তিনি কাজের মেয়েকে বলছেন, নিজের মেয়ের খোঁজ নাই, পরোয় মেয়ে পালতেছি।
আসলেই তো তাই। আসমানী কুমকুমের বান্ধবী। তাদের তো কেউ না। তারা কেন শুধু শুধু তাকে পুষিবেন?
আসমানী আজকাল প্রতিদিনই একবার করে ভাবে রুনিকে সঙ্গে নিয়ে এক একা ঢাকা চলে গেলে কেমন হয়। খুব কি অসম্ভব ব্যাপার? কেউ কি ঢাকা যাচ্ছে
একটা সমস্যা আছে। তার হাত খালি। হ্যান্ডব্যাগে পনেরোটা মাত্র টাকা। তার হাতে চারগাছা সোনার চুড়ি আছে। চুড়ি বিক্রি অবশ্যই করা যায়। রুনির গলায় চেইন আছে। এক ভরি ওজনের চেইন। চেইনটাও বিক্রি করা যায়। সোনার দাম এখন দুশ টাকা ভরি। চুড়ি আর চেইন মিলিয়ে খাদ কাটার পরেও আড়াইশ-তিনশ টাকা পাওয়া উচিত। হাত খালি থাকলে অস্থির লাগে। আসমানীর সারাক্ষণই অস্থির লাগছে।
আসমানীর ধরাবাধা জীবনটা হঠাৎ এমন হয়ে গেল কেন? অন্য একটা পরিবারের জীবনের সঙ্গে তার জীবনটা জট পাকিয়ে গেছে। এরকম কি কথা ছিল? শাহেদ কোথায় আছে সে জানে না। বেঁচে আছে তো? তাও জানে না। তার মা কোথায়? দেশের বাড়িতে? খোঁজ নেবার উপায় কী? সবকিছুই জট পাকিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে। এই জটি কি কখনো খুলবো?
মানুষের জীবন এমন যে একবার জট পাকিয়ে গেলে জট বাড়তেই থাকে। রাত জেগে আসমানী বেশ কয়েকটা চিঠি লিখল। শাহেদকে, তার মাকে, নীলগঞ্জে শাহেদের বড়ভাইকে, চিটাগাং-এর ছোটমামাকে। চিঠিতে নিজের ঠিকানা জানাল। কীভাবে মুন্সিগঞ্জের অজপাড়াগায়ে চলে এসেছে তা লিখল। ডাক বিভাগ কোনো দিন চালু হবে কি-না তা সে জানে না। যদি কখনো চালু হয়, তাহলে যেন আসমানীর আত্মীয়স্বজনরা সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারেন আসমানী কোথায় আছে।
দেশের অবস্থা কি ভালো হবে? যদি হয় সেটা কবে? কত দিন আসমানীকে একটা অপরিচিত জায়গায় একদল অপরিচিত মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে? আসমানী জানে না। শুধু আসমানী কেন, দেশের কেউই বোধহয় জানে না।
বিবিসি থেকে ভয়ঙ্কর সব খবর দিচ্ছে। সারাদেশে নাকি গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। একটা গৃহযুদ্ধ কত দিন চলে? ছয় মাস, এক বছর, সাত বছর? বাংলাদেশের এই গৃহযুদ্ধ কত দিন চলবে? সাত বছর যদি চলে, এই সাত বছর তাকে মুন্সিগঞ্জের দারোগাবাড়িতে পড়ে থাকতে হবে? আর পাগলটা যখন-তখন তার মেয়েকে ভয় দেখাবে? তার অতি আদরের মেয়েকে বান্দি ডাকবে?
শাহেদকে লেখা চিঠির সে দুটা কপি করল। একটা যাবে বাসার ঠিকানায়, একটা অফিসের ঠিকানায়। কোনো না কোনোদিন শাহেদ নিশ্চয়ই অফিসে যাবে। অফিসে যাওয়া মাত্রই সে যেন চিঠিটা পায়। শাহেদের চিঠি সম্বোধনবিহীন। বিয়ের আগেও আসমানী শাহেদকে অনেক চিঠি লিখেছে। তার কোনোটিতেই সম্বোধন ছিল না। কী লিখবে সে? প্রিয়তমেষু, সুপ্রিয়, সুজনেষু, নাকি সাদামাটা শাহেদ। তার কখনো কিছু লিখতে ইচ্ছে করে নি। আসমানীর ধারণা শাহেদের জন্য যে সম্বোধন তার মনে আছে সেই সম্বোধনের কোনো বাংলা শব্দ তার জানা নেই।
