রিকশাওয়ালা ঘাড় ফিরিয়ে শাহেদকে দেখল। জবাব দিল না।
শাহেদ বলল, তোমার দেশ কোথায়?
ফরিদপুর। গ্রামের নাম জয়নগর।
আচ্ছা ঠিক আছে। আমার গ্রামের বাড়ি— ময়মনসিংহের কেন্দুয়ায়। আমি মিলিটারির হাতে আটক ছিলাম। আজ ছাড়া পেয়েছি।
রিকশাওয়ালা আবার তাকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। কিছু বলল না। রিকশাওয়ালার চোখে আগ্রহ, কৌতূহল, বিস্ময় কোনো কিছুই নেই। মরা মানুষের চোখ।
শাহেদ বাসায় পৌছাল দুটাির দিকে। বাসা খালি। গৌরাঙ্গ নেই। সদর দরজাও খোলা। সে দরজায় তালাও লাগিয়ে যায় নি। দুটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সে এক নাগাড়ে ঘুমুল। সন্ধ্যাবেলায় ঘুম থেকে উঠে সে অল্প কিছু সময় বারান্দায় বসে রইল। তারপর ঘরে ঢুপে চিঠি লিখতে বসল।
আসমানী,
তুমি এবং রুনি, তোমরা কোথায় আছে আমি জানি না। কিছুদিন তোমাদের জন্যে খুব দুশ্চিন্তা করেছি। এখন আর করছি না। এই চিঠিটা আমি ভাইজানের কাছে পাঠাচ্ছি। ভাইজানের সঙ্গে যদি তোমার কখনো যোগাযোগ হয় তুমি চিঠি পাবে।
আসমানী, আমার ধারণা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ যুদ্ধ শুরু করবে। আমি প্রথমদিকের যোদ্ধাদের একজন হতে চাই, কাজেই তোমাদের জন্য দুশ্চিন্তা বন্ধ করে আমি আজ থেকে খুঁজতে শুরু করব কীভাবে নিজেকে কাজে লাগাতে পারি।
পরাধীন দেশে নয়। আমি স্বাধীন দেশে তোমাকে আবার দেখব। যদি দেখা না হয়, যদি আমার মৃত্যু হয়, তাতে মনে কষ্ট পেয়ো না। রুনিকে বুঝিয়ে সব কিছু বলবে। এখন বুঝতে না পারলেও একদিন সে বুঝবে।
আমি ভয়ঙ্কর কিছু সময় পার করে এসেছি। সে-সময়ে তোমার উপস্থিতি আমি অনুভব করেছি। আমি জানি আমি যেখানেই থাকি–তুমি থাকবে আমার পাশেই।
অনেক অনেক আদর। তোমাকে ও রুনিকে।
চিঠি শেষ করে তারিখ লিখতে গিয়ে শাহেদ সামান্য চমকাল। তারিখ ১৩ এপ্ৰিল। তাদের বিয়ের দিন। তের তারিখে বিয়ে অশুভ হয় কি-না। এই নিয়ে সে দ্বিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। ইরতাজউদ্দিন সব শুনে ভাইকে ধমক দিয়ে বলছিলেন, আল্লাহপাকের সৃষ্টি প্রতিটা দিনই শুভ।
চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই
চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই বলেছেন, বহিরাক্রমণ থেকে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে গণচীন প্ৰতিশ্রুতিবদ্ধ। স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে চীন সরকার পাকিস্তানকে পূর্ণ সহযোগিতা দেবে।
এই দিনেই খাজা খায়েরউদ্দিন ও জামায়াত নেতা গোলাম আযম জোহরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে শান্তি কমিটির মিছিল বের করেন। পাক সেনাবাহিনীর সাফল্যের জন্যে মোনাজাত পরিচালনা করেন জামায়াতের আমীর গোলাম আযম। তিনি ইসলাম ও পাকিস্তানের দুশমনদের মোকাবিলা করতে জিহাদের ডাক দেন।*
————–
*সূত্র : দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক পূৰ্ব্বদেশ
দারোগাবাড়ি
আসমানীরা যে-বাড়িতে বাস করছে তার নাম দারোগাবাড়ি। গ্রামের ভেতর হুলস্থূল ধরনের বাড়ি। দোতলা পাকা দালান, বাড়ির পেছনে আমবাগান! সানবাঁধানো ঘাটের পুকুরটা বাড়ির দক্ষিণ দিকে। পুকুরের পানি কাকের চোখের মতোই পরিষ্কার। ঘাটের সঙ্গে পাশাপাশি দুটা চেরিফুলের গাছ। গাছভর্তি সাদা রঙের চেরিফুলে। গ্রামে চেরিগাছ থাকার কথা না। বাড়ির সামনে অনেকখানি জায়গায় আছে নানান ধরনের জবা গাছ। (ভাই পাগলা পীর সাহেবের জবা গাছ প্রসঙ্গটা মিলে গেছে।)
মোতালেব সাহেবের বাবা সরফরাজ মিয়া ব্রিটিশ আমলের দারোগা ছিলেন। রিটায়ার করার পর তিনি এই পাকা বাড়ি বানান। ব্রিটিশ আমলের দারোগাদের মধ্যে শেষ বয়সে খানিকটা জমিদারি-ভাব চলে আসে। উনার মধ্যেও চলে এসেছিল। অজপাড়াগাঁয়ে বিশাল দালান এই কারণেই তুলেছিলেন। সরফরাজ মিয়া এখনো জীবিত। বৃদ্ধের বয়স প্রায় নব্বই। অতি রুগ্ন। বাকী হয়ে হাঁটেন। তবে চোখে দেখতে পান, কানে শুনতে পান। মাথা খানিকটা এলোমেলো হয়ে আছে। কথায় কথায় বন্দুক বের করতে বলেন। মাঝে-মাঝে নিজেই তাঁর শোবার ঘর থেকে দুনিলা বন্দুক বের করে নিয়ে আসেন। ক্ষিপ্ত গলায় বলেন–সব হারামজাদাদের জানে মেরে ফেলব। তারপর আকাশের দিকে বন্দুক তুলে একটা ফাঁকা গুলি করেন। গুলির শব্দ কানে যাবার পরপরই তাঁর সংবিৎ ফিরে আসে, তিনি খুব স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। তাকে দেখে মনে হয় তিনি তার অস্বাভাবিক উত্তেজনার প্রকাশে খানিকটা লজ্জিত।
রুনি এই বাড়িতে এসে আতঙ্কে অস্থির হয়ে আছে। বাড়ির প্রধান ব্যক্তি একজন পাগল। যে সারাদিন জবা গাছের যত্ন করে কাটিয়ে দেয়। জবা গাছের সঙ্গে কথা বলে। মাঝে-মাঝে বন্দুক হাতে বের হয়ে আসে। এ জাতীয় ভয়ঙ্কর মানুষের সঙ্গে বাস করা যে-কোনো শিশুর পক্ষেই অসম্ভব। রুনি বাস করছে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মধ্যে। আসমানী হাজার চেষ্টা করেও রুনিকে সেই দুঃস্বপ্ন থেকে বের করতে পারছে না।
সরফরাজ মিয়ার সঙ্গে রুনির প্রথম সাক্ষাৎটাই ছিল ভয়াবহ। শুরুতে বাড়িটা রুনির খুব পছন্দ হয়েছিল। চারদিকে এত ফাঁকা জায়গা। জবা ফুলগুলো এত সুন্দর। মনে হয় গাছে লাল আগুনের ফুল ফুটে আছে। রুনি ছুটে গিয়ে কোঁচড় ভর্তি করে জবা ফুল নিয়ে নিল। তার এত আনন্দ হচ্ছিল! আনন্দে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছা করছিল। ঠিক তখন পিছন থেকে খনখনে গলায় কে যেন বলল, এই মেয়ে, ফুল কেন ছিড়লা? কার হুকুমে ফুল ছিড়লা? এই মেয়ে কোন বান্দির?
রুনি চমকে পেছনে তাকাল। অতি বৃদ্ধ এক লোক। বানরের মতো দেখতে। চোখ চকচক করে জুলছে। কী অদ্ভুত ভঙ্গিতে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! বুড়ো আবার বলল, ফুল কেন ছিড়লা? রুনির কোল থেকে সব ফুল মাটিতে পড়ে গেল।
