জেনারেল জামশেদ জরুরি মিটিং শুরু করলেন। আজকের এজেন্ডা সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা। তিনি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমাদের সৈনিকদের মরাল কী? তার এই প্রশ্নের কেউ উত্তর দিল না। জেনারেল জামশেদ বললেন, সৈনিকদের মরাল সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে বলে আমার ধারণা। এর কারণটা কী? যুদ্ধ শুরুই হয় নি। কিছু মুক্তি এদিক ওদিক ফুটফাট করছে। এতেই এই অবস্থা? কিছু বর্ডার আউটপোস্ট চাপের মধ্যে আছে। কিন্তু এখনো তো কোনো আউটপোস্ট কেউ দখল করে নি। ইন্ডিয়া সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করলে তবেই আমরা খানিকটা চাপে পড়ব।
এয়ার কমোডর এনাম আহমেদ বললেন, খানিকটা চাপে পড়ব? আমরা কি নিজেদের সম্পর্কে অতিরিক্ত আস্থা দেখাচ্ছি না?
একজন প্রকৃত সৈনিক কি নিজেকে শক্রর কাছে তুচ্ছ ভাববো?
জেনারেল, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? আমি প্রকৃত সৈনিক না?
আপনি অকারণে উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? বিমানবাহিনীর প্রধান কাজ উত্তেজিত হওয়া। মূল যুদ্ধ করে স্থল বাহিনী। বাকিরা উত্তেজিত হয়।
আপনি কি এই জরুরি মিটিং ব্যক্তিগত কোন্দলের জন্যে ডেকেছেন?
জেনারেল জামশেদ বললেন, আপনি এই মিটিং অপ্রয়োজনীয় মনে করলে চলে যেতে পারেন।
কিছুক্ষণের জন্যে সবাই চুপ করে গেল। পরিস্থিতি সামাল দিলেন কর্নেল ফজলে হামিদ। তিনি বললেন, আমাদের সামনের সময়টা ভালো না। সামনের দুঃসময়ের কথা ভেবে আমরা কি আমাদের কথাবার্তায় কিছুটা সংযত হতে পারি না?
জেনারেল জামশেদ বললেন, আমি যে সাময়িক উত্তেজনা দেখিয়েছি, তার জন্যে দুঃখিত। সত্যি কথা আপনাদের বলি, আমি হতাশাগ্ৰস্ত। বড় বড় কথা হতাশাগ্রস্তরা বলে। মুক্তিদের আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছি। এদের তুচ্ছ করা কি আর এখন উচিত? এরা শক্তি সঞ্চয় করছে।
এয়ার কমোডর বললেন, এরা এমন কোনো শক্তি সঞ্চয় করে নি যে আপনার মতো একজন শক্ত জেনারেল হতাশাগ্ৰস্ত হবেন।
জেনারেল জামশেদ তার রিভলভিং চেয়ার পুরোপুরি এয়ার কমোডরের দিকে ফিরিয়ে বললেন, কাদের সিদ্দিকী নামের সিভিলিয়নকে আপনি চেনেন? চেনেন না?
নামটা পরিচিত বলে মনে হচ্ছে না।
নামটা পরিচিত হবার কথা। ছয়ত্রিশতম ব্রিগেডের একটা বড় অংশ আমরা তার পেছনে লাগিয়েছি। আপনাকে আপনার বিমানবাহিনী নিয়ে বেশ কয়বার তাদের আক্রমণ করতে হয়েছে। তার টিকির দেখাও আমরা পাচ্ছি না। তারপরেও আপনি যদি বলেন, তার নাম আপনার পরিচিত মনে হচ্ছে না, তাহলে আমার কিছু বলার নেই।
তার ভয়ে এতটা ভীত হবার কোনো কারণ দেখি না।
আপনি দেখছেন না। আমি দেখছি। আমাদের অস্ত্ৰ বোঝাই জাহাজ সে দখল করে নিয়েছে। তাও একটা না। তার হাতে এখন অন্ত্রের অভাব নেই।
আমাদের আজকের এই জরুরি মিটিং কি তাকে নিয়ে?
তার মতো আরো তৈরি হবে।
হোক, তখন দেখা যাবে। ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে এখনই দুঃস্বপ্ন দেখা কাজের কথা না।
বেশ তাহলে কাজের কথা কী আপনি বলুন।
সভা আবারো নীরব হয়ে গেল। একসময় ব্রিগেডিয়ার কাসিম বললেন, চাইনিজ সাহায্যের কথা শুনছি। সেই সাহায্য কলে এসে পৌঁছবে?
জেনারেল জামশেদ ক্লান্ত গলায় বললেন, চাইনীজ সাহায্যের আমাদের প্রয়োজন কী? এয়ার কমোডর এনাম আহমেদের মতো দুৰ্যর্ধ মানুষজন থাকতে আমরা কেন বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি? যাই হোক, আজকের মিটিং অসম্পূর্ণ। জেনারেল নিয়াজীর উপস্থিতিতে আমরা অতিসত্ত্বর আবার বসব। গুড ডে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসান খানের সঙ্গে জেনারেল নিয়াজীর টেলিফোনের মাধ্যমে কিছু কথাবার্তা হলো। অস্ত্র এবং বিশটি মাঝারি ধরনের ট্যাংক নিয়ে একটা চীনা জাহাজ চিটাগাং পোর্টে ভিড়েছে। কথাবার্তা হলো মাল খালাস প্রসঙ্গে। গুল হাসান খান বললেন, আপনি অস্ত্ৰ খালাস করবেন। কিন্তু ট্যাংকগুলো পাঠিয়ে দেবেন। পশ্চিম পাকিস্তানে।
নিয়াজী বললেন, ট্যাংকগুলোই আমার প্রয়োজন।
ট্যাংকগুলো আপনি চিটাগাং থেকে ঢাকা কীভাবে নিয়ে যাবেন? ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ। সড়কপথের সমস্ত ব্রিজ নষ্ট।
ট্যাংকগুলো কীভাবে ঢাকায় নেব তা আমার ব্যাপার।
আপনি কি দয়া করে বলবেন, ট্যাংকগুলি কীভাবে নেবেন?
কীভাবে নেব সেটা আমার ব্যাপার।
আমারও জানার ব্যাপার থাকতে পারে।
অস্ত্র এবং ট্যাংক এসেছে ইস্টার্ন কমান্ডের জন্যে।
মূল প্রসঙ্গে আসুন, ট্যাংকগুলো আপনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কীভাবে নেবেন?
আমি তো আগেও বলেছি, সেটা আমার ব্যাপার।
শুনুন জেনারেল, সব ট্যাংক আপনি করাচি পোটে পাঠাবেন। এটা হচ্ছে একটি সামরিক আদেশ।
গুল হাসান খান টেলিফোন রেখে দিলেন। নিয়াজী সামরিক আদেশ অগ্রাহ্য করলেন। জাহাজের সব কিছুই চিটাগাং পোর্টে খালাস করা হলো।*
টেলিফোনের কথাবার্তায় জেনারেল নিয়াজীর মেজাজ বেশ খারাপ হলো। তবে এই খারাপ মেজাজ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তিনি সামান্য ভদকা পান করলেন। ভদকা শীতের দেশের পানীয় হলেও বাংলাদেশের গরমেও এটা ভালো লাগে। প্রচুর বরফ এবং প্রচুর লেবু দিয়ে বানানো ভদকার গ্লাসে চুমুক দেয়া মাত্রই তার মনে একধরনের ফুরফুরে ভাব হয়। মনে হয় সৈনিক জীবনটা তো খারাপ না। বিশাল এক দায়িত্ব নিয়ে তিনি এসেছেন। দায়িত্ব তিনি ভালোমতোই পালন করছেন। এই যুদ্ধ কিছুদিনের মধ্যেই থেমে যাবে। তখন তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে যাবেন। পাঠ্যবই-এ লেখা হবে পাকিস্তানের অতি দুঃসময়ে টাইগার নিয়াজী হাল ধরেছিলেন।
