নাইমুল লাইব্রেরি ঘরে গেল না। সরাসরি রান্নাঘরে ঢুকে গেল। তার চায়ের পিপাসা হয়েছে। নাইমুল রান্নাঘর থেকে বলল, স্যার, আপনি চা খাবেন?
ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বিরক্ত গলায় বললেন, তুমি রান্নাঘরে কী করছ? তোমাকে বললাম না, মাছের উপর বই খুঁজে বের করতে?
নাইমুল চায়ের পানি বসিয়ে দিয়ে মাছের উপর বই খুঁজতে গেল। স্যারের উপর তার সামান্য রাগ হচ্ছে। ডেডবডি পানিতে ফেলছে বলে মাছ খাওয়া বন্ধ, এই বিষয়টি তার কাছে গুরুত্বহীন। গুরুত্ব পেয়ে গেছে মাছের খাদ্য কী!
নাইমুল!
জি স্যার।
বই পাওয়া গেছে?
খুঁজছি স্যার। সব বই এলোমেলো করে রাখা।
বই তো এলোমেলোই থাকবে। গোছানো থাকবে শাড়ি, জামা-কাপড়। ভালো কথা, তুমি কি বিয়ে করেছ?
জি স্যার।
ঐ রাতে তো আমি ভালো বিপদে পড়েছিলাম। তুমি ভুল ঠিকানা দিয়ে চলে গেলে। আমি রাত দশটা পর্যন্ত বাড়ি খুঁজলাম। তোমার স্ত্রীর নাম কী?
মরিয়ম।
সুন্দর নাম। যিশুর মাতা মরিয়ম। তুমি বৌমাকে নিয়ে অবশ্যই একদিন আসবে। আগে থেকে খবর দিয়ে আসবে যেন সার্ট-পাঞ্জাবি কিছু একটা গায়ে থাকে। খালি গায়ে থাকা হয়েছে। অভ্যাস। মেয়েদের সামনে খালি গায়ে থাকা বিরাট অসভ্যতা।
আমি খবর দিয়েই তাকে আনিব। বই পাওয়া গেছে স্যার।
ভেরি গুড। আমার কাছে বই দাও, আর একটা কাগজ-কলম দাও।
কাগজ-কলম কী জন্যে?
নোট করি। ছাপার অক্ষরের উপর দিয়ে শুধু চোখ বুলিয়ে গেলে তো হবে না। নোট নিতে হবে। কী পড়েছ সেটা ভাবতে হবে।
স্যার, আমি কয়েকদিন আপনার সঙ্গে থাকব।
থাক।
আপনার অসুবিধা হবে না তো?
ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী জবাব দিলেন না। তিনি খাতায় নোট নেয়া শুরু করেছেন।
নাইমুল বলল, গতকাল আপনার বাড়ির কথা একেবারেই মনে আসে নি। গতকাল রাতে থাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী এই কথার উত্তরেও কিছু বললেন না।
চায়ের পানি ফুটছে। নাইমুল চা বানাতে গেল। মৎস্য বিষয়ক জটিলতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঋষিতুল্য এই মানুষটি কোনো কথা বলবেন না–এটা বোঝা যাচ্ছে।
পুণ্যবান মানুষের আশেপাশে থাকলেই পুণ্য হয়। আলাদা করে পুণ্য করতে হয় না। নাইমুল ঠিক করল, কয়েকদিন এই মানুষটার আশেপাশে থেকে সে পুণ্য সঞ্চয় করে নেবে। এই আলাভোলা মানুষ তাঁর জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, পৈতৃক বাড়িঘর–সবই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। তিনি এখন চলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া পেনসনের টাকায়। মাঝে-মাঝে তার মেয়ে কানাডা থেকে ডলার পাঠায়।
স্যার!
বলো।
একটা প্রশ্ন ছিল, আপনি কি এই বাড়িটাও ইউনিৰ্ভাসিটিকে দিয়ে দিয়েছেন?
হুঁ। তবে আমার মৃত্যুর পর।
ইউনিৰ্ভাসিটি যদি এখনই বাড়ি চায়, আপনি কী করবেন?
ধীরেন্দ্ৰনাথ রায় চৌধুরী রেগে গেলেন। ধমকের স্বরে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এটা তো খুবই অন্যায় সিদ্ধান্ত। আমি তো বলে দিয়েছি, মৃত্যু পর্যন্ত আমাকে এই বাড়িতে থাকতে দিতে হবে। লিখিত কোনো ডিড অবশ্যি হয় নাই, মৌখিক কথা। দেখি টেলিফোনটা দাও তো। ভাইস চ্যান্সেলর সাহেবের সঙ্গে কথা বলি। হুট করে আমাকে এত বড় ঝামেলায় ফেলা তো ঠিক না।
নাইমুল বলল, স্যার, আপনি আপনার কাজ করুন। ইউনিৰ্ভাসিটি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নি। চা খান স্যার। চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী চায়ে চুমুক দিয়ে খাতায় নোট নিতে লাগলেন
রুই মাছ
বৈজ্ঞানিক নাম : Labeo rohita
খাদ্য : উদ্ভিদ ভুক। মাটিও খায়।
কাতল
বৈজ্ঞানিক নাম : Catila catla
খাদ্য : ফ্লাইটো প্লাঙ্কটন, জুপ্রাঙ্কটন। শ্যাওলা, জলজ উদ্ভিদ, ছোট চিংড়ি ও পোকামাকড়।
মৃগেল মাছ
বৈজ্ঞানিক নাম : Cirrhinus mrigala
খাদ্য : পচা জলজ উদ্ভিদ, পোকামাকড়, মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ, মাটি।
চিতল
বৈজ্ঞানিক নাম : Notopterus chitala
খাদ্য : আমিষাশী
এপর্যন্ত লিখে ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী ঘোষণা দিলেন–মাছ খাওয়া যাবে না; মাছের ডেডবডি খাবার সম্ভাবনা আছে। দুপুরে হবে ডিমের ঝোল।
মিলিটারিরা গৌরাঙ্গকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে
মিলিটারিরা গৌরাঙ্গকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তার পরনে একটা অতি ময়লা কালো রঙের প্যান্ট। খালি গা। অনেকদিন দাত ব্ৰাশ করা হয় নি বলে দাঁত কালচে হয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে দগদগে ঘায়ের মতো হয়েছে। গৌরাঙ্গের কোমরে দড়ি বাধা। তবে তাকে মোটেই চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না। সে মনের আনন্দে সিগারেট টানছে। এই সিগারেট কিছুক্ষণ আগে এক লেফটেনেন্ট সাহেব দিয়েছেন। তিনি যে শুধু সিগারেট দিয়েছেন তা না। লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়েও দিয়েছেন।
মিলিটারিরা বদ্ধ উন্মাদ এই মানুষটাকে নিয়ে খুবই মজা পাচ্ছে। লেফটেনেন্ট সাহেব এক একবার পাগলটার সঙ্গে কথা বলেন এবং আনন্দে প্ৰায় ভেঙে পড়েন।
এই তুমি হিন্দু?
ইয়েস স্যার।
তুমি যে হিন্দু এটা প্রমাণ করো। প্যান্ট খুলে দেখাও।
গৌরাঙ্গ সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ট খুলে দেখাল। তার মুখভর্তি হাসি।
তোমহারা বিবি কাহা?
মিলিটারি লে গিয়া।
তোমহারা বাচ্চা?
গুল্লি। খতম।
খতম বলার সময় গৌরাঙ্গ চোখ বন্ধ করে জিভ বের করে মরে যাওয়ার ভঙ্গি করল। মিলিটারি দলটার বড় আনন্দময় সময় যাচ্ছে। গৌরাঙ্গ যাই করছে তাই তাদের পছন্দ হচ্ছে।
শেখ মুজিব কে?
Leader our great leader. জয় বাংলা।
তুমি জয় বাংলার লোক?
Yes sir.
জয় বাংলার লোকদের আমরা কী করি জানো?
