মিছরি বাবুর কাছে ঠিকানা নিয়ে একদিন সে নীরমহল দেখে এলো। ত্রিপুরার মহারাজাদের প্রাসাদ। পানিতে প্রাসাদের ছায়া পড়েছে। দূরে নাগকেশর ফুলের বন। কী অপূর্ব দৃশ্য! শাহেদ তৎক্ষণাৎ ঠিক করল, দেশ স্বাধীন হলে অতি অবশ্যই সে আসমানীকে নিয়ে এদিকে আসবে। উঠবে। হোটেল নিরালায়। সেখান থেকে কোনো এক সন্ধ্যায় যাবে নীরমহল দেখতে। সেখান থেকে শালবন, শালবন দেখে নাগকেশরের বন। ঐ গানটা যেন কী?
হেলিয়া দুলিয়া পড়ে নাগকেশরের ফুল।
বালা নাচ তো দেখি।
বালা নাচ তো দেখি।
একদিন সে গেল মুক্তিযোদ্ধারের ক্যাম্প দেখতে। জায়গাটার নাম মেলাঘর। বাংলাদেশের কসবা এবং ভারতের বিলুনিয়ার মাঝামাঝি একটা জায়গা। ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন দুই নম্বর সেক্টর অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ। ঘন জঙ্গলের ভেতর সেই ক্যাম্প। পানির বড়ই অভাব। সব অভাব সহ্য করা যায়, পানির অভাব না। শত শত যুবক ছেলে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের একজনের সঙ্গে শাহেদের পরিচয় হলো। নাম ইফতেখার।* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার ছাত্র। সেকেন্ড ইয়ার অনার্স।
শাহেদ বলল, কেমন আছেন ভাই?
ইফতেখার বলল, ভালো আছি।
আপনার কি ট্রেনিং শুরু হয়েছে?
এখনো হয় নাই। নাম লেখালেখি চলছে।
আপনাদের খাওয়া-দাওয়া কী?
দুইবেলা খাই। রাতের খাওয়াটা ভালো হয়।
রাতের খাওয়াটা ভালো হয় কেন?
ইফতেখার হাসিমুখে বলল, অন্ধকারে খাই তো এই জন্যে ভালো হয়।
শাহেদ বলল, বুঝলাম না।
ভাতে অসংখ্য সাদা সাদা কীরার মতো থাকে। অন্ধকারে কীরা দেখা যায় না বলে খেতে সমস্যা হয় না। হা হা হা।
শাহেদ নিতান্তই অল্পবয়েসী এই ছেলের আনন্দময় হাসি দেখে মুগ্ধ হলো। সে বলল, ভাই, আপনি যদি কিছু মনে না করেন। আপনাকে কি আমি হোটেলে একবেলা খাওয়াতে পারি? একদিনের ছুটি নিয়ে আমার সঙ্গে শহরে আসবেন?
ইফতেখার বলল, না। তবে আপনি আমাকে একটা সিগারেট খাওয়াতে পারেন। আগে সিগারেট খেতাম না। এখন ধরেছি।
শাহেদ খুবই লজ্জার মধ্যে পড়ে গেল। তার সঙ্গে সিগারেট নেই। সে বলল, আমি কাল আপনার জন্যে সিগারেট নিয়ে আসব। কয়েক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসব।
কোনো দরকার নেই।
শাহেদ বলল, দরকার আছে। অবশ্যই দরকার আছে। আমি কাল আসব। এমনিতেই আমার আসতে হবে। আমি আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব। এখানকার রিত্রুটিং অফিসার কে? মুক্তিযোদ্ধা হতে যোগ্যতা কী লাগে? নিশ্চয়ই সাহস লাগে। আমার একেবারেই সাহস নেই।
ইফতেখার বলল, আমারো নাই।
শহরে ফিরতে শাহেদের অনেক রাত হলো। ট্রাকের পেছনে চড়ে উঁচু-নিচু রাস্তায় অনেক দূর আসা; পথে কয়েক দফা বৃষ্টির মধ্যে পড়তে হলো। পাহাড়ি বৃষ্টি। এই আছে এই নাই। তার জ্বর উঠে গেল ট্রাকেই।
রাতে শাহেদ কিছু খেতে পারল না। জ্বর হু-হু করে বাড়তে লাগল। একটা কম্বলে শীত মানে না। হোটেলের বয়কে দিয়ে আরেকটা কম্বল আনানো হলো। মিছরি বাবু একবার এসে দেখে গেলেন। কিছু ট্যাবলেট দিলেন। প্রবল জ্বরের ঘোরে শাহেদ স্বপ্ন দেখল আসমানীকে। যেন আসমানী ঢাকায়, তার বাসার শোবার ঘরে বসে আছে। রুনির জ্বর এসেছে। সে রুনির মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। রুনির সঙ্গে রাগী রাগী গলায় কথা বলছে–তোর বাবার কাণ্ডটা দেখেছিস? আমরা ঢাকায় এসেছি আর সে বসে আছে আগরতলায়। তার কি বুদ্ধিশুদ্ধি পুরোটাই গেছে?
রুনি বলল, বাবাকে বকা দিও না মা।
আসমানী বলল, বিকা দিব না তো কী করব? আমি একা মানুষ। আমি তোকে এখন কার কাছে নিয়ে যাব? কে ডাক্তার ডেকে আনবে?
রুনি বলল, বাবা ডাক্তার ডেকে আনবে। বাবা চলে আসবে।
স্বপ্ন দেখে শাহেদের ঘুম ভেঙে গেল। পরদিন ভোরেই গায়ে একশ দুই ডিগ্রি জ্বর নিয়ে সে রওনা হলো ঢাকার দিকে।
—————-
* দুর্ধর্ষ ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে ইফতেখার ঢাকা শহরে যথাসময়ে প্রবেশ করে। এই ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে ঢাকা শহরের পাকিস্তানি বাহিনীকে। মুক্তি শব্দটাই তাদেরকে তখন আতঙ্কে অস্থির করে তুলত। তারা তখন ঘরে ঘরে অনুসন্ধান চালাত, একটাই তাদের প্রশ্ন–মুক্তি কাহা? কোথায় মুক্তি? শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পুত্র দুঃসাহসী রুমি এই গ্রুপেরই একজন সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তিনি ২৯ আগষ্ট ধরা পড়েন। তারা বাংলার এই বীর সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
বেগম সুফিয়া কামালের দিনলিপি
বিকালে বৌমা আমি হাসিনার* ছেলে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। কী ভীষণ দুর্ব্যবহার যে করল ওখানের মিলিটারি পাহারাদারটা! হাসিনার মা মাত্র দশ মিনিটের জন্যে গতকাল ওদের দেখতে পেয়েছিলেন। আজ হতে কড়া নিয়ম চালু করা হলো, কোনো মানুষই আর ওদের দেখতে যেতে পারবে না। এ যে কী অমানুষিক ব্যবহার! জেলখানার কয়েদিও সাক্ষাতের জন্য সময় পায়। আল্লাহ আর কত যে দেখাবো! আজও ছোটনের চিঠি নেই, কারোর কোনো খবর নেই। আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়েছি, আল্লাহ মেহেরবান।*
————–
*সূত্র : বেগম সুফিয়া কামালের দিনলিপি–মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তির জয়। হাসিনা–শেখ হাসিনা। পরে প্রধানমন্ত্রী। পুত্রের নাম জয়।
জেনারেল ইয়াহিয়ার সাক্ষাৎকার
সানডে টাইমস-এ প্রকাশিত সাংবাদিক রালফ শ-র নেয়া পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার সাক্ষাৎকার।
প্রেসিডেন্ট বলছেন, শেখ মুজিব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ কারাগারে জীবিত ও সুস্থ আছেন। তবে আজকের পর তাঁর জীবনে কী হবে সেই ওয়াদা আমি দিতে পারছি না।
