বৃদ্ধ মহিলার কথা তোমার মনে আছে?
জি আমার মনে আছে। কারণ শাহেদ চাচা আমাকে বলছিল–ছেলে তার মাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে। আর আমি আমার মাকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছি। মজা না?
তারপর কী হলো বলো।
আমরা আগরতলা পৌঁছলাম সন্ধ্যায়। সেখান থেকে শরণার্থী শিবিরে ট্রাকে করে যেতে হয়। ট্রাকে ওঠার সময় শাহেদ চাচা বললেন, মা শোন, অনেকগুলো শিবির আছে। আমরা তোমার মাকে প্রত্যেকটা শিবিরে খুঁজব। তাকে পাওয়া যাবে–সে সম্ভাবনা খুবই কম। পাওয়া না গেলে তুমি মন খারাপ করবে না। আমি তো তোমার সঙ্গে আছি! আমি যেভাবেই হোক তোমাকে তোমার মার কাছে পৌঁছে দেব। ঠিক আছে মা? আমি বললাম, ঠিক আছে।
ট্রাকে আমার জ্বর এসে গেল। চাচা চাদর দিয়ে আমাকে ঢেকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার মাকে জড়িয়ে ধরে আছি। মজার ব্যাপার কী জানেন? প্ৰথম শরণার্থী শিবিরেই আমার মা এবং দাদকে পাওয়া গেল বলো কী? জি। তবে আমাদের দেখা হওয়ার কোনো স্মৃতি আমার মাথায় নেই। শুধু মনে আছে আমার মা, দাদু আর শাহেদ চাচা তিনজনেই খুব কাদছিলেন। শাহেদ চাচার কান্না দেখে আমার খুবই মজা লাগছিল। আমি তাকিয়েছিলাম শাহেদ চাচার দিকে।
কংকন কাঁদছে! প্ৰথমে নিঃশব্দে কাদছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুহাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল। অ্যাপার্টমেন্টের বেল বাজছে। হয়তো কংকনের স্বামী তার সন্তানকে ছবি দেখিয়ে ঘরে ফিরেছে। কংকন দরজা খোলার জন্যে এগিয়ে যাচ্ছে না। সে প্ৰাণপণ চেষ্টা করছে নিজের কান্না থামাতে।
রোরুদ্যমান তরুণীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আমার মনে হলো, কংকন কাঁদছে না। কাঁদছে আমাদের বাংলাদেশ। আমাদের জননী।
দুর্ধর্ষ ক্র্যাক প্লাটুন
আগরতলার যে হোটেলে শাহেদ উঠেছে তার নাম নিরালা। স্কুলঘরের মতো লম্বা একতলা দালান। টিনের ছাদ। জানোলা দিয়ে টিলা এবং দূরের শালবন দেখা যায়। হোটেলের রুম খুপড়ির মতো হলেও প্রচুর আলো-বাতাস খেলে। হোটেলের রান্না ভালো। সবজি এবং অড়হড়ের ডালের মিশ্রণে যে খাদ্যটি তৈরি হয় তা অতি স্বাদু। হোটেলের মালিকের নাম মিশ্র। তিনি প্রথম পরিচয়েই শাহেদকে বলেছেন, বাংলাদেশের সব মানুষ আমারে ডাকে মিছরি বাবু। আপনিও তাই ডাকবেন। আমি আসলে বাংলাদেশেরই মানুষ। কুমিল্লার নবীনগরে আমার মায়ের বাড়ি।
শাহেদ বলল, কেমন আছেন ভাই?
মিছরি বাবু আনন্দিত গলায় বললেন, ভালো আছি, তবে আপনাদের দুঃখকষ্ট দেখে মনটা অস্থির।
শাহেদ বলল, আপনার হোটেলটা ভালো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
মিছরি বাবু বললেন, জলের কিছু সমস্যা আছে। মানুষ বেশি হয়ে গেছে। সাপ্লাই-এর জল পাওয়া যায় না। নিজগুণে ক্ষমা করবেন। প্ৰতিদিন স্নান করা সম্ভব না। ফতু বলে একটা ছেলে আছে, তারে একটা টাকা দিলে দুই বালতি জল এনে দিবে।
শাহেদ এই হোটেলে আছে চারদিন ধরে। প্রতিদিনই সে এক টাকা খরচ করে দুই বালতি পানি আনাচ্ছে। ঘুমুতে যাবার আগে দুই বালতি পানি খরচ করে দীর্ঘ গোসল করে। রাতে খুব ভালো ঘুম হয়। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙার পর তার মনে হয়, এত শান্তির ঘুম সে দীর্ঘদিন ঘুমায় নি। রাতে ঘুম ভাঙিয়ে মিলিটারি ধরে নিয়ে যাবে–এ ধরনের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। বিহারিরা ঘুমন্ত অবস্থাতেই জবাই করে যাবে সেই আশঙ্কা নেই। প্রায়ই তার মনে হয়, সে পৃথিবীতে বাস করছে না। সে বেহেশতি আরামে আছে।
কংকনকে সে তার মায়ের হাতে তুলে দিতে পেরেছে–এই ঘটনোটা তার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। এই অসম্ভব কীভাবে সম্ভব হয়েছে? তাহলে কি সত্যি এমন কেউ আছেন যিনি আমাদের দিকে লক্ষ রাখছেন? তিনি তার বিচিত্র কৌশলে হারানো শিশুদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন বাবা-মার কোলে? পঁচিশে মার্চের পর এই বিশ্বাস প্রায় ভেঙে পড়তে বসেছিল। এখন আবার ফিরে আসছে।
কংকনের ঘটনার পর শাহেদের ভেতর কেমন এক আলস্য এসে গেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, তার দায়িত্ব শেষ হয়েছে। এখন সে বিশ্রাম করতে পারে। আগরতলা নামের এই দেশ যার নাম শুনেছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়, সেই আগরতলা এখন টুরিস্টের মতো দেখা যেতে পারে। নিশ্চয়ই অনেক কিছু দেখার আছে। শাহেদের এইটাই প্রথম বিদেশ ভ্ৰমণ। বিদেশ ভ্ৰমণ সে কীভাবে করবে? তার পাসপোর্টও নেই। এখন পাসপোর্ট ছাড়াই চলে এসেছে বিদেশে।
আসমানীদের খোঁজ সে প্রথম দুই দিনেই নিয়েছে। সবকটা শরণার্থী শিবির দেখেছে। লষ্ট পারসন বুরোতে খোঁজ নিয়েছে। এখানকার প্রতিটি হোটেলের অতিথি তালিকা দেখেছে। আসমানীরা আগরতলায় নেই। তারপরেও কিছুই বলা যায় না, হয়তো দেখা যাবে কোনো একদিন সে রাস্তায় ভাড়ে করে চা খাচ্ছে–হঠাৎ বাচ্চা একটা মেয়ে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। ধরার সময় এমন ধাক্কা লেগেছে যে তার হাত থেকে চায়ের খুড়ি পড়ে ভেঙে গেল। সে বিরক্ত হয়ে ধমক দিতে যাবে তখন মেয়েটা বলবে–বাবা বাবা আমি। কংকনের ক্ষেত্রে যদি এ রকম ঘটতে পারে, তার মেয়ের ক্ষেত্রে কেন ঘটবে না?
শাহেদ এক সন্ধ্যায় সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখে এলো। উত্তম-সুচিত্রার ছবি সাগরিকা। খুবই ভালো লাগল। ছবি দেখে। ছবিঘর থেকে বের হয়ে মনে হলো, সব ঠিক আছে। আমি ভালো আছি। আসমানীরাও ভালো আছে। এই ছবিটাই আমি কোনো একদিন আসমানীকে নিয়ে দেখব। অবশ্যই দেখব।
কংকনরা যে শরণার্থী শিবিরে ছিল শাহেদ সেখানে আর যায় নি। যদিও তার উচিত প্ৰতিদিন একবার গিয়ে খোঁজ নেয়া। কেন জানি শাহেদের এটা করতে ইচ্ছা করে না। একদিন শিবিরের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে এলো। কেন এ রকম হচ্ছে কে জানে? কংকনকে দেখলেই নিজের মেয়ের কথা মনে পড়বে।–এই ভেবেই কি এ রকম হচ্ছে? হতে পারে।
