ইতি
শাহেদ
ডালের কোটা সে আন্ডারলাইন করে দিয়েছে। ডালের কোটায় ডালের নিচে টাকা রাখা আছে। আসমানী হয়তো খালিহাতে উপস্থিত হবে। তার টাকার দরকার হবে।
শাহেদের নিজের টাকা এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে চলছে গৌরাঙ্গের টাকায়। গৌরাঙ্গের কোনো খোঁজ নেই। গৌরাঙ্গের খোঁজ বের করার জন্যে সে ভয়ে ভয়ে একদিন পুরনো ঢাকায় গিয়েছিল। গৌরাঙ্গের বাড়ি তালাবন্ধ। শাহেদ দরজার নিচ দিয়ে একটা চিঠি দিয়ে এসেছে। সেই চিঠি পড়লে গৌরাঙ্গ অবশ্যই তার সঙ্গে দেখা করত। বোঝাই যাচ্ছে গৌরাঙ্গ চিঠি পায় নি।
শাহেদের কুমিল্লায় যাবার ব্যাপারে তার অফিসের বি হ্যাপী স্যার অনেক সাহায্য করেছেন। এই অফিসে আইডেনটিটি কার্ডের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তিনি আইডেনটিটি কার্ড ছাপিয়ে, ছবি লাগিয়ে সব কর্মচারীকে দিয়েছেন। শাহেদের জন্যে আলাদা যে কাজটা করেছেন তা হলো–এক কর্নেল সাহেবের দেয়া পাশের ব্যবস্থা করেছেন। সেই পাশে লেখা–শাহেদুদিন নামের এই লোক খাঁটি পাকিস্তানি। তাকে যেন কোনো হ্যারাসমেন্ট না করা হয়। বি হ্যাপী স্যারের কিছু কথা শাহেদের কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। এই অবাঙালি মানুষ শাহেদকে তার খাসকামরায় নিয়ে দরজা বন্ধ করে নিচু গলায় বলেছেন, আমি ঠিক করেছি। মুক্তিযোদ্ধা হবো। আমার বয়স যুদ্ধে যাবার মতো না। তারপরেও চেষ্টা করছি। যোগাযোগ বের করতে পারছি না। তবে পারব।
শাহেদ বলেছে, আপনি যুদ্ধ করবেন কেন?
বি হ্যাপী স্যার বলেছেন, কেন করব না বলো? আমি এই দেশে পথের ফকির হয়ে ঢুকেছিলাম। এই দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে আমি অবস্থার পরিবর্তন করেছি। আজ আমার বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, ব্যাংকে টাকা আছে। যে দেশ আমাকে এত কিছু দিয়েছে, সেই দেশকে আমি কিছু দেব না?
আপনার ফ্যামিলি? তারা কি আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানেন?
জানে। তারা পাকিস্তান চলে গেছে। তাদের চিন্তা ভিন্ন। প্রত্যেকেই প্ৰত্যেকের মতো চিন্তা করে।
শাহেদ বলল, স্যার, আপনার কি মনে হয় দেশ স্বাধীন হবে?
হবে। পাকিস্তানিদের দিন শেষ হয়ে আসছে। তারা মেয়েদের উপর অত্যাচার করছে। নারীদের উপর অত্যাচার আল্লাহ পছন্দ করেন না। যাই হোক, তুমি যাও। স্ত্রী-কন্যার খোঁজ বের করো। যে চিঠিটা তোমাকে জোগাড় করে দিয়েছি, সেই চিঠি তাবিজের মতো যত্ন করে রাখবে। বিপদে কাজে দিবে। বি হ্যাপি ম্যান। বি হ্যাপি।
ঢাকা থেকে বের হবার মুখে বেশ কিছু চেকপোস্ট পার হতে হয়। রাজাকারদের চেক পোস্ট, পশ্চিমা পুলিশের চেক পোস্ট। সবশেষে সেনাবাহিনীর চেক পোস্ট। সব জায়গায় ডান্ডি কার্ড দেখাতে হয়। ডান্ডি কার্ড দেখার পর চলে ব্যাগ সুটকেস, তল্লাশী। একজন এসে ঘাড় টিপে দেখে ঘাড় নরম না শক্ত। ঘাড় শক্ত হলে পলাতক বাঙালি পুলিশ বা বিডিআর। রাইফেল কাঁধে ট্রেনিং-এর ফলে ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে।
সবচে অপমানসূচক পরীক্ষাটা হলো খৎনা পরীক্ষা। প্যান্ট খুলে দেখাতে হয়। সত্যি খৎনা আছে কি-না! পশ্চিম পাকিস্তানি পুলিশরা এই পরীক্ষাটার সময় বেশ আনন্দ পায়। নানান ধরনের রসিকতা করে। হেসে একে অন্যের গায়ে সঁড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়।
শাহেদকে এই পরীক্ষাও দিতে হলো। প্যান্ট-আন্ডারওয়ার খুলতে হলো। যে পরীক্ষা নিচ্ছে, তার হাতে অর্ধেক লাল অর্ধেক নীল রঙের মোটা একটা পেন্সিল। সে পেন্সিল দিয়ে খোঁচার মতো দিল; মনে হচ্ছে এই খোঁচা দেয়াতেই তার আনন্দ।
নাম বলো।
শাহেদ।
কিধার যাতা?
কুমিল্লা চৌদ্দগ্ৰাম।
ইধার যাতা কেউ?
মেরা পিতাজি বিমার। হাম মিলনা চাতে হে।
শাহেদ যে অসুস্থ পিতাকে দেখার জন্যেই যাচ্ছে, এটা দেখানোর জন্যে সে সঙ্গে একটা ঠোংগায় আঙ্গুর, আপেলও নিয়েছে। শাহেদ ফলের ঠোংগা দেখাল। তার ভাগ্য ভালো কর্নেল সাহেবের পাশ ছাড়াই সে বাসে উঠার সুযোগ পেল। কয়েকজন ছাড়া পায় নি, আটকা পড়ে আছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তারা হয়তো ছাড়া পাবে, হয়তো পাবে না। অনিশ্চয়তা। The day and nights of uncertainity.
মেঘনা ফেরিতে উঠার সময় আবারো চেকিং। এবার চেক করতে এসেছে মিলিটারিরা। বোরকা পরে যে সব মহিলা এসেছেন, তাদেরও নেকাব খুলে মুখ দেখাতে হচ্ছে। তারা যে আসলেই জেনানা, মিলিটারি সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চায়। যে মিলিটারির দায়িত্ব পড়েছে মহিলাদের চেক করা, সে ভদ্র। সবাইকেই বলছে, ডরো মৎ। তোম মেরা বহিন হ্যায়।
শাহেদের জীবনের অতি বিস্ময়কর ঘটনার একটি ফেরিতে ঘটল। সে এক ঠোংগা ঝালমুড়ি কিনেছে। সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি, ক্ষিধেয় নাড়িতুড়ি জ্বলে যাচ্ছে। ঝালমুড়ি খেয়ে ক্ষিধেটা কোনোমতে চাপা দেয়া। সে যখন মুড়ি মুখে দিতে যাচ্ছে, তখনই রুনির বয়েসি ভিখিরী ধরনের এক মেয়ে ঝাঁপ দিয়ে তার গায়ে পড়ল। তার ঝাপ্টায় হাতের মুড়ির ঠোংগা পড়ে গেল।
শাহেদ মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তুই কে বলে চিৎকার করতে গিয়ে থমকে গেল। এই মেয়ে তার অতি পরিচিত। এর নাম কংকন। মেয়েটার নিজের নাম কংকন বলতে পারে না। সে বলে ককন।
তুমি? তুমি কোথেকে? তোমার মা কোথায়? তোমার দাদু কোথায়?
মেয়েটি কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিচ্ছে না। শাহেদের পায়ে ক্ৰমাগত মুখ ঘষছে।
কংকন আমার কথা শোন, এইখানে তুমি কার সঙ্গে এসেছ?
মেয়েটা এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না। শাহেদকে ঘিরে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেল।
